জয়ন্ত মণ্ডল

মাত্র ২৪ ঘণ্টা বাকি ছিল উত্তরপ্রদেশের কইরানা লোকসভা উপনির্বাচনের। কিন্তু রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসনে থাকলেও বিজেপির পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে মোদী-ম্যাজিকের ভীষণ দরকার হয়ে পড়ে। তার কয়েক মাস আগেই মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নিজের কেন্দ্র গোরক্ষপুরে অখিলেশ-মায়াবতীর কাছে নাকানিচোবানি খেয়েছে বিজেপি। তাই কইরানায় জিততে প্রশাসনিক মোড়কে মোদী-ম্যাজিকের আশ্রয় নিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ফল মেলেনি সে বারও, হল না এ বারও!

কইরানার ভোটের আগের দিন মোদীর রোড শো

কইরানা উপনির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগেই নির্বাচনী বিধিনিষেধ জারি করেছিল কমিশন। কিন্তু সে সবের তোয়াক্কা না করেই ইস্টার্ন পেরিফেরাল এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনের পর ৬ কিমির একটি রোড শোয়ে অংশ নেন মোদী। পর দিনই ভোট কয়েক কিমি দূরের কইরানায়। খোলা জিপে মোদীর সেই রোড শো ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য ছিল যথেষ্ট। কংগ্রেস সমেত বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল বটে, তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা জানার আগ্রহ দেখাননি ভোটাররা। কারণ তাঁরা চেয়েছিলেন আখের ন্যায্য মূল্য। ওই এলাকার কৃষকের মূল পেশা ওই আখ চাষ।

কইরানায় জয়ী বিরোধী জোটের আরএলডি প্রার্থী তবসুম হাসান

চার বছর মোদী কৃষকের জন্য বহুবিধ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আখচাষিদের হাল ফেরেনি, যে কারণে তাঁরা উপনির্বাচনেও আর বিজেপিকে ফেরাননি। ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিরোধীরা ওই আসন ছিনিয়ে নেন বিজেপির হাত থেকে। কতকটা একই ছবি ফুটে উঠল এ বারের ছত্তীসগঢ় বিধানসভা নির্বাচনেও।

তবে আম জনতার ক্ষোভের কারণ এই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নন। আমজনতার মনে ক্ষোভ উসকে দিচ্ছেন ২০১৪-র লোকসভা ভোটের আগে হাল ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অন্য দিকে বিধানসভা ভিত্তিক ইস্যু হওয়ায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের প্রতিও ছিল অগাধ ক্ষোভ। সেটা হতে পারেন রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজে বা ছত্তীসগঢ়ের রমন সিং। ফলে এই মোদীর উপর জনতার ক্ষোভের বদলে যেন সহানুভূতিই ছিল বেশি৷ তিনি ছত্তীসগঢ়ে একাধিক বার প্রচারে গিয়ে দলকে টেনে তুলতে চেয়েছেন কিন্তু পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন৷ মোদীর আবেদন হয়তো ভোটারদের মনে দাগ কেটেছে, কিন্তু পুরোনো মোদী আর মুখ্যমন্ত্রীর উপর সেই ক্ষোভকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে পারেনি।

চার বছর মোদী কৃষকের জন্য বহুবিধ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আখ চাষিদের হাল ফেরেনি। যে কারণে তাঁরা উপনির্বাচনেও আর বিজেপিকে ফেরাননি।

ছত্তীসগঢ়ে এ বারের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে দু’টি পর্যায়ে। প্রথমটি ১২ নভেম্বর। মাওবাদী অধ্যুষিত ১৮টি বিধানসভা এলাকায় প্রথম পর্যায়ে ভোটগ্রহণ হয়। মজার কথা, ওই একই দিনে ছত্তীসগঢ়ে বাকি বিধানসভা এলাকার ভোটের প্রচারে বিলাসপুরে গিয়েছিলেন মোদী। সেই কিরানার মতোই। একই রাজ্যে যখন ১৮টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে, তখন বাকি ৭২টি আসনের ভোট প্রচারে সেই রাজ্যেই প্রচার করছেন প্রধানমন্ত্রী। শুধু তা-ই নয়, বিলাসপুরে ভাষণ শেষ করেই তিনি চলে যান পার্শ্ববর্তী রাজ্য উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে। সেখানে তিনি দু’টি হাইওয়ে প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। অর্থাৎ পুরোনো মোদীকে এই মোদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বিজেপি।

বস্তারে ভোট চলছে আর বিলাসপুরে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে কৌতুক করছেন মোদী

বিলাসপুরের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সে দিন একটা কথা তাঁকে বারবার বলতে শোনা যায়, আপনারা যত বেশি সম্ভব ভোট দিন। ওই দেখুন মাওবাদীদের ভোট বয়কটের ডাককে উপেক্ষা করে কত মানুষ ভোট দিচ্ছেন। সেখানকার থেকে ভোট দেওয়ার হার এখানে বাড়াতে হবে…ইত্যাদি।

কোনো কথাই শোনেননি আম জনতা। গত ২০১৩ সালে ছত্তীসগঢ়ে বৈধ ভোটের হার ছিল ৭৭.৪০ শতাংশ। এ বার ২০১৮-য় তা পড়ে গিয়েছে ৭৬.৩৫ শতাংশে। অর্থাৎ, মোদীর আবেদনে সাড়া দিয়ে ভোটাররা রেকর্ড সংখ্যক ভোট দিতে বেরোননি। আর যাঁরা দিয়েছেন তাঁদের বৃহৎ অংশটাও মোদীর দলের পানে মুখ ফিরে চাননি।

ছত্তীসগঢ় তো দেখাল, মোদীর কথায় কিস্যু যায়-আসে না। যে মোদী রাজ্যের এক প্রান্তে ভোটের দিন অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস সর্বভারতীয় সভাপতিকে নিয়ে কৌতুক করেন, তাঁকে দলীয় কর্মী-সমর্থকরা হাততালি উপহার দিলেও, ভোটাররা যে তাঁর দলকে ভোট দিতে যাবেন না, সে কথাই হাড়েহাড়ে বুঝিয়ে দিল ছত্তীসগঢ়!

ভোটের ফলে স্পষ্ট ভাবেই ধরা পড়ছে, নিজের দলের জন্য অচ্ছে দিন এনে দিতে সফল হলেও পুরোনো মোদী ব্যর্থ আম জনতার প্রত্যাশা পূরণে। মানুষ বুঝতে পারছেন, দলের চাপে ভোটের দিনেও তিনি সভা, রোড শো করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই আপাতত তাঁর জন্য তোলা থাকছে সহানভূতিই!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here