নীলাঞ্জন দত্ত

আওয়াজটা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। ৫ মে, সুপ্রিম কোর্ট জ্যোতি সিং-এর (না, ‘নির্ভয়া’ লিখব না – তাঁকে নামহীন করে দেওয়ার ক্ষমতা ধর্ষক আর খুনিদের থাকতেই পারে না) মামলায় দোষীদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার রায় দেওয়ার পর থেকেই সারা দেশে ‘ফাঁসি চাই’ চিৎকারটা খুব বেশি করে শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ন্যায়বিচারের জয় হল, আরও যেখানে যেখানে ধর্ষণের বিচার চলছে, সেখানেও যেন এই সাজাই দেওয়া হয়। টেলিভিশনে কামদুনির আন্দোলনকারীদের ডেকে এনে সঞ্চালকরাই বলে দিচ্ছেন, “আপনাদের মামলায় যে তিন জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, তাদেরও তো আপনারা মৃত্যুদণ্ডই চান, তাই না?”

এর মধ্যে ভিন্ন স্বর শোনা গেল বিলকিস বানোর গলায়। তিনি ২০০২ সালের গুজরাত গণহত্যার সময় উপর্যুপরি ধর্ষিতা হয়েছিলেন। এত বছর ধরে তিনি অসম সাহসে আদালতে তাঁর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাতে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ধর্ষণের সমস্ত প্রমাণ লোপ করার চেষ্টা করেছিল শুধু পুলিশরাই নয়, ডাক্তাররাও! এরা ছাড়াই পেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কয়েক দিন আগে বম্বে হাইকোর্ট পাঁচ জন পুলিশ আর দু’জন ডাক্তারের খালাসের নির্দেশ নাকচ করে দিয়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড দেয়নি। “আপনার ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড চান?” – এই প্রশ্নের উত্তরে বিলকিস ৮ মে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সোজা বলে দিলেন, “আমি বিচার চাই, বদলা চাই না।”

সংগ্রামরতা এই নির্যাতিতা নারীর কথার মধ্যে দিয়ে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, যা কিন্ত মিডিয়ায় ঝড় তোলে না, আমাদের মনে তো নয়ই। মৃত্যদণ্ডের বিষয়টা কি আসলে বিচার, না বদলা? গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত আসামীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেই ‘এত দিনে ন্যায়বিচার হল’ বলে জয়ধ্বনি দেওয়ার মধ্যে আসলে কীসের পরিতৃপ্তি প্রকাশ পায় – দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সুবিচার পাওয়ার, না বিচারের নাম করে প্রতিহিংসা মেটানোর? আর মিডিয়া বা নেতারা যখন এই জয়োল্লাসকে আরও তাতিয়ে তোলার চেষ্টা করে, তখন তারা কোন ভূমিকা পালন করে? সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে সাহায্য করা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু ‘দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ’-এর আদিম প্রবৃত্তিকে উসকানি দিয়ে কি সেই দ্বায়িত্ব পালন করা যায়? এ ভাবে এক অসভ্যতার জবাব দিতে গিয়ে কি সমাজকে আরও অসভ্যতার দিকেই ঠেলে দেওয়া হয় না?

ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে ফাঁসি দেওয়া হল, তখন বলা হয়েছিল, এর পর ধর্ষকরা অপরাধ করতে ভয় পাবে। তাই যদি হত, তা হলে তার পর দিল্লি থেকে কামদুনি পর্যন্ত এত ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনাই ঘটত না।

আমাদের দেশের বিচারকরাও এ নিয়ে অনেক বার ভেবেছেন। মৃত্যুদণ্ডের ওপর লাগাম পরানোর বহু চেষ্টা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৩৫৪(৩) ধারা যোগ করা হয়, যা বিচারককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পেছনে ‘বিশেষ কারণ’ দেখাতে দায়বদ্ধ করে। ১৯৮০ সালে বচন সিং বনাম পাঞ্জাব সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলে, ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ ক্ষেত্র ছাড়া এই সাজা দেওয়া যাবে না। এখনও পর্যন্ত আদালতগুলি এই নীতিই মেনে চলছে। কিন্তু ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ অপরাধ কাকে বলা হবে, তা আজও পরিষ্কার হল না। তাই এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়েই চলেছে।

১৯৯২ সালে মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্রের নেতৃত্বে এক সশস্ত্র জনতা বিহারের গয়া জেলার বারা গ্রামে ৩৫ জন ভূস্বামীকে হত্যা করে। সেই মামলায় ছ’জনের ফাঁসির হুকুম হয়, যার মধ্যে চার জনের মৃত্যুদণ্ড সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখে। অথচ বিহারেই বাথানিটোলা, লছমনপুর-বাথে-সহ বহু জায়গায় ভূস্বামীদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যায় কারও এমন সাজা হয়নি। তা হলে কীসের ভিত্তিতে এই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়?

বচন সিং-এর মামলায় উচ্চতম আদালত বলেছিল, “মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত যখন সমাজের সামগ্রিক বিবেক এমন আঘাত পেয়েছে যে তারা আশা করবে যাদের হাতে বিচারের ক্ষমতা রয়েছে তাঁরা মৃত্যুদণ্ডই দেবেন, এমনিতে মৃত্যুদণ্ড থাকা উচিত কি না তা নিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত মতামত যা-ই হোক না কেন।”

কিন্তু সমাজ তো বহু ভাগে বিভক্ত। তার সামগ্রিক বিবেক বলে কিছু আছে নাকি? সব ক্ষেত্রে সবাই আশা করবে যে আসামির ফাঁসিই হোক? বারা আর বাথানিটোলার নিহতদের সাজার ক্ষেত্রে সকলে একমত হবেন?

মৃত্যুদণ্ডের ফলে অপরাধ কমে, এমন কথা আজকাল তার সমর্থকরাও খুব একটা বলেন না। ২০০৪ সালে যখন কলকাতায় ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়কে ফাঁসি দেওয়া হল, তখন বলা হয়েছিল, এর পর ধর্ষকরা অপরাধ করতে ভয় পাবে। তাই যদি হত, তা হলে তার পর দিল্লি থেকে কামদুনি পর্যন্ত এত ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনাই ঘটত না। আমেরিকায় দেখা গেছে, যে সব প্রদেশে মৃত্যুদণ্ড আছে সেগুলির থেকে যে সব প্রদেশে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়া হয়েছে সেখানে খুনের হার বেশি। ১৯৭৩-এ ব্রিটেন, ১৯৭৬-এ কানাডা, ১৯৮১-তে ফ্রান্স, ১৯৮৫-তে অস্ট্রেলিয়া, ১৯৯৪-তে ইতালি, ১৯৯৫-তে স্পেন ও দক্ষিণ আফ্রিকা মৃত্যুদণ্ড তুলে দিয়েছে। চিন, ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, উত্তর কোরিয়া আর পাকিস্তানের মতো কিছু দেশে এখনও মৃত্যুদণ্ড রয়েছে। কিন্তু সারা পৃথিবীতেই দেখা যায়, মৃত্যুদণ্ড থাকা বা না-থাকার সঙ্গে অপরাধ কম-বেশি হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

আরও পড়ুন: সন্ত্রাস ছাড়া সব অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সুপারিশ করল আইন কমিশন

সুপ্রিম কোর্ট যে দিন জ্যোতি সিং-এর মামলার চূড়ান্ত রায় দেয়, সে দিন রাতেই প্রয়াত হন দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারক লীলা শেঠ। জ্যোতির ধর্ষণ ও হত্যার পর সারা দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠলে কেন্দ্রীয় সরকার নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ মোকাবিলার পথ খুঁজতে বিচারপতি জে এস ভার্মার নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করেছিল, তার সদস্য হিসাবে লীলা শেঠ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই কমিটি মত দিয়েছিল, ধর্ষণের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের কোনো প্রয়োজন নেই। সরকার তা মানেনি। যেমন মানেনি স্বামীর দ্বারা স্ত্রীকে ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপকেও অপরাধ বলে গণ্য করার সুপারিশ, পুলিশ বিভাগের সংস্কারের প্রস্তাব, সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন বা আফস্পার সুযোগ নিয়ে সেনা ও আধা-সেনাদের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, ইত্যাদি।

এমনকি, তাঁর ‘টকিং অব জাস্টিস: পিপলস রাইটস ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’ বইতে লীলা শেঠ আক্ষেপ করেছেন, ভার্মা কমিটির পক্ষ থেকে তাঁরা দেশের মানুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তনের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষা সম্পর্কিত যে সুপারিশগুলি করেছিলেন তা-ও কার্যকর করা হয়নি। এ সব না করে কেবল বলা হচ্ছে, ধর্ষক ও খুনিদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই যে হেতু তারা আর এক জনের জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করেছে, তাই তাদের মৃত্যুদণ্ডই দিতে হবে। অন্য রকম কিছু কথা বলতে গেলেই টিভির ‘বিশিষ্টজন’ ও সঞ্চালকরা ঝাঁপিয়ে পড়েন: “অপরাধীর মানবাধিকারের কথা ভাবছেন, যে ক্ষতিগ্রস্ত হল তার কি কোনও মানবাধিকার নেই?”

মানবাধিকারের কথা আপাতত থাক। বিলকিসের যুক্তি খুব স্পষ্ট: “আমি আবার বলছি, যে বিভীষিকার মধ্যে দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে তাতে [দোষীদের] সর্বোচ্চ সাজাই হওয়া উচিত, কিন্তু আমি চাই না যে আমার জন্য আর কেউ মরুক।”

তাঁর মতো করে ভাবার মানুষ এখনও অনেক আছে। যদিও মিডিয়ায় তাঁদের খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ২৭ এপ্রিল, তাঁর বাবার হত্যাকারী কেনেথ উইলিয়ামসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে, আমেরিকার আরকানসাসের গভর্নরকে চিঠি লিখেছিলেন কায়লা গ্রিনউড: “…আমাদের যে যন্ত্রণা, মৃত্যুদণ্ড চেয়ে তা সারিয়ে তোলার কোনো চেষ্টা করব না বলে আমরা ঠিক করেছি। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে আমার বাবা ফিরে আসবে না, আমাদের কাছ থেকে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে তা আর ফিরে পাব না, কিন্তু তা আরও যন্ত্রণার সৃষ্টি করবে।”

এদের কথা শোনা হয় না। হিংসা, প্রতিহিংসার দাপাদাপিতে সভ্যতার শেষ কন্ঠস্বরগুলি হারিয়ে যায়। অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়, অপরাধকে যায় না।

প্রচ্ছদ ছবি : খ্রিস্তফ কিয়েশলস্কির সিনেমা ‘আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’-এর শেষ দৃশ্য থেকে নেওয়া।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here