sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী

এর আগের পর্বে লিখেছিলাম সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সমাজের মেয়েরা এই আর্থিক পরিবর্তনের কুফল কী ভাবে ভোগ করছেন। মহিলাদের মধ্যে শ্রেণিনির্বিশেষে প্রায় দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় তাঁদের উপর এই সমস্যার প্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই বেশি। এমনকি এমনও ঘটনা ঘটেছে যে কন্যাপক্ষ পণের টাকা নতুন নোটে না দিতে পারায় সদ্যবিবাহিতা আত্মহত্যা করেছেন।

এ তো গেল এক শ্রেণির মহিলার কথা। কিন্তু এমন মহিলারা, সমাজে যাঁদের অবস্থান প্রান্তিক, তাঁদের সমস্যা স্বভাবতই আরও জটিল। উপজাতি গোষ্ঠীগুলিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সে ভাবে পৌঁছোয়নি। ফলে, তাঁরা নারী, পুরুষ নির্বিশেষ সমস্যায় পড়েছেন। একই সঙ্গে সমস্যায় পড়ছেন ভ্রাম্যমাণ নারী-শ্রমিক গোষ্ঠী যাঁদের নির্দিষ্ট ঠিকানা না থাকায় তাঁরা ব্যাঙ্ক বা পরিচয়পত্রের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না। মোদীর ঘোষণার পর তাঁদের সঞ্চিত অর্থ কিছু মূল্যহীন কাগজে পরিণত হয়েছে। অসংগঠিত শিল্পের সঙ্গে জড়িত মহিলাদের অবস্থাও একই। এমনিতেই সংগঠিত না হওয়ার দরুন এরা বিভিন্ন ভাবে শোষণের সম্মুখীন হন। এর পর টাকা বদলের ক্ষেত্রে তাঁদের বিভিন্ন অসুবিধা যেমন ব্যাঙ্কের দূরত্ব, মালিকের কাছ থেকে ছুটি পাওয়া ইত্যাদি থাকে। এই ঘোষণার ফলে এঁদের দৈনিক জীবন প্রবল ভাবে ব্যাহত হয়েছে, জানাচ্ছেন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ন্যাশনাল জয়েন্ট সেক্রেটারি কিরণ মোঘে।

এ ছাড়া আছেন নারীপাচার চক্রের শিকার মহিলারা, যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। সাধারণত, এই মহিলারা কোনো সরকারি বা এনজিও চালিত হোমে বা অনুরূপ স্থানে থাকেন। তাঁদের একার চলাচল ক্ষমতা কম। কারণ, নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সমস্যার বিষয় যে হেতু এর সঙ্গে তাঁদের নিজেদের সুরক্ষার প্রশ্নটি জড়িত। এমনকি এঁদের মধ্যে অনেকেরই ব্যাঙ্ক এ অ্যাকাউন্টই নেই। এই সমস্যাটি জানিয়ে গোয়ার এনজিও ‘আর্জ’ (আন্যায়ন রহিত জিন্দেগী) প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছে, যাতে তিনি এই বিষয়টির নিরিখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

একই সমস্যায় ভুগছেন নিষিদ্ধপল্লির মহিলারাও। মুম্বইয়ের রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট কামাথিপুরায় যৌনকর্মীদের আয় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। পৃথিবীর সব থেকে পুরোনো এই পেশায় টাকা ছাড়া প্লাস্টিক মানির ব্যবহার হয় না। খুচরো টাকা-নেওয়া যৌনকর্মীদের অনেকেই ডিমানিটাইজেশনের ফলে সমস্যার সম্মুখীন হয়ে কম পারিশ্রমিক নিতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে এঁদের অনেকের ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট না থাকায় তাঁরা প্রভূত বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায় যে, প্রধানমন্ত্রী কি তবে মহিলাদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না? একটি ভাষণে তিনি মহিলাদের আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে ব্যাঙ্কে রাখা তাঁদের সমস্ত টাকা সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু যে হেতু ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে ভারতের মহিলা শ্রেণির প্রধান অংশ, তাই তার এই আশ্বাস খুব একটা লাভজনক বলে মনে হয় না। বলা হয় যে ফ্যাসিজমের ক্ষেত্রে মহিলাদের সমস্যার কথা গুরুত্ব পায় না, কারণ স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেয়েদের প্রশ্ন সব শেষেই আসে। এই মুহূর্তে ডিমানিটাইজেশন নিয়ে ভাবতে বসে তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়, আমরা কি তবে একটি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বাস করছি?

ঋণস্বীকারঃ

https://www.hindustantimes.com/india-news/govt-s-demonetisation-move-a-disaster-for-rural-women-say-activists/story-h65rTCQpNMLHSYFuyXk3hP.html

https://www.indiatvnews.com/news/india-demonetisation-women-rescued-from-human-traffickers-hit-hard-ngo-writes-to-pm-357444

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here