ছবি: উদঘোষ.ইন থেকে
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

কী কারণে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর পুরোনো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা চলেছে গত প্রায় ২১ মাস সময় ধরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত যার পোশাকি নাম নোটবন্দি, আদৌ কতটা ‘অচ্ছে দিশা’ দেখাল, সে সব নিয়েই দু-চার কথার অবতারণা।

গত সপ্তাহে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)-এর প্রকাশ করা রিপোর্টে জানাজানি হয়ে গিয়েছে, মোট ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটের মাত্র ১০,৭২০ কোটি টাকা ‘চোরাগলি’ বেয়ে ব্যাঙ্কের ক্যাশ কাউন্টারে ঢুকতে পারেনি। শতাংশের হিসাবে এই পরিমাণ, মোট বাতিল হিসাবে ঘোষিত নোটের মাত্র ০.৭ (দশমিক সাত) শতাংশ।

অর্থাৎ, ওই নোটের ৯৯.৩ শতাংশ ফের সেঁধিয়ে গিয়েছে দেশের ইকনোমিক্যাল সিস্টেমে। সাধারণ এবং ‘অসাধারণ’ দুই গোত্রের মানুষই তাঁদের হেফাজতে থাকা ওই সমস্ত নোট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে রং বদল করে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের হয়তো কষ্ট হয়েছে একটু বেশিই। কষ্টার্জিত খানকতক পুরোনো নোট বদলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাঙ্কের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। যে লাইন ব্যাঙ্কের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বড়ো রাস্তা পর্যন্ত। অন্য দিকে ‘অসাধারণ’ মানুষের কষ্ট ততটা হয়নি, কিন্তু দুশ্চিন্তার পরিমাণ ছিল তাঁদের অনেক বেশি। সেই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়ার মোক্ষম পথ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উপহার দিয়েছেন। আশা করা যায়, আগামী ২০১৯ লোকসভা ভোটে সেই উপহারের প্রতি-উপহার তাঁরা এখন থেকেই তুলে রাখছেন মোদীজির জন্য।

এক সপ্তাহ হয়ে গেল, আশা করা হয়েছিল, নোট বাতিল নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির দেওয়া ‘মহম্মদ বিন তুঘলক’ তকমা হঠাতে মোদী তাঁর ‘মন কি বাতের’ মতোই ‘ধন কি বাতের’ আয়োজন করবেন। কিন্তু না, এখনও নোটবন্দি নিয়ে মোটের উপর তিনি টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি।

demonetization
কষ্টার্জিত খানকতক পুরনো নোট বদলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাঙ্কের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। যে লাইন ব্যাঙ্কের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বড়ো রাস্তা পর্যন্ত।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জোরালো যুক্তির খোঁজে মগ্ন রয়েছেন তিনি। কারণ, সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আন্দাজ করেছিল, নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত সফল হলে বাজার থেকে গায়েব হয়ে যেতে পারে ৩ ট্রিলিয়ন (৩ লক্ষ কোটি) ৫০০ এবং ১০০০ টাকার পুরোনো নোট। কারণ, আয়কর দফতর, অর্থ মন্ত্রক বা জালনোটে নজরদারি চালানো বিভাগ ইত্যাদি মিলিয়ে এমনটাই একটা পরিসংখ্যান পাওয়া গিয়েছিল। বলে রাখা ভালো, ৩১ মার্চ, ২০১৬ পর্যন্ত বাজারে ছিল ১৫.৪ ট্রিলিয়ন (১৫ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি) ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট। এই টাকা থেকেই প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন পুরোনো নোট নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছিলেন মোদী। তিনি স্পষ্টত তিনটি বিষয়েই জোর দিয়েছিলেন। যেগুলির প্রথমেই ছিল, কালো (আয়করবিহীন) টাকা, দ্বিতীয়ত, জাল নোট এবং তিন নম্বরে ছিল আর্থিক দুর্নীতি রোধ।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট পেশের পর তিনটির কোনটিতে সফল মোদী, তেমন প্রশ্নের উত্তর কেউ খুঁজছেন না। কারণ, খোঁজার তো কোনো কারণই নেই। কিন্তু মোদী খুঁজছেন। খুঁজে পেলে হয়তো কয়েক দিন পর তিনি জানাবেন। কিন্তু আরবিআই জেনে গিয়েছে, ওই নোটবন্দি কী বিপদ ডেকে নিয়ে এসেছে রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির জন্য।


আরও পড়ুন: নোটবন্দি নিয়ে জোর ধাক্কা খেল নরেন্দ্র মোদী সরকার, চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট রিজার্ভ ব্যাঙ্কের

নোটবন্দির পর পুরনো বদলে নতুন নোট তোলার হিড়িকে ব্যাঙ্কের সংগহীত অর্থের পরিমাণ হু হু করে কমেছে। আর এখন তো ব্যাঙ্ককর্তারা রীতিমতো হাহুতাশ করছেন প্রকাশ্যেই। তাঁরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে নোট-ফোবিয়া তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাঙ্কের সেভিংস নয়, সঞ্চয় বা বিনিয়োগের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছেন তাঁরা। গত এক বছরে মিউচুয়াল ফান্ড (এমএফ) অথবা সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানে (এসআইপি) বিনিয়োগের পরিমাণ রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। ব্যাঙ্কের সেভিংস হোক বা ফিক্সড ডিপোজিট কত আর সুদ দেবে, মধ্যবিত্ত দৌড়াচ্ছেন এমএফ অথবা এসআইপিতে।

আবার বৃহৎ অঙ্কের একটা টাকা চলে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার শেয়ারে বাজারে। একটি সূত্রের দাবি, চলতি বছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সুযোগ বুঝে ভারতের শেয়ার বাজার থেকে ২৮০ বিলিয়ন (২৮ হাজার কোটি) ডলার তুলে নিলেও সেখানে দেশীয় বিনিয়োগ হয়ছে ১০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলার। ও দিকে শেয়ার বাজারের সূচকগুলি নিত্যনতুন রেকর্ড গড়ে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে অনিশ্চিত বিনিয়োগের প্রতি লালায়িত করে তুলেছে।

বোঝা মুশকিল, বলাও কঠিন, তবুও জানার ইচ্ছে তো থাকেই – মোদীজি কি এটাও চেয়েছিলেন?

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন