sayantaniসায়ন্তনী অধিকারী

বছরের সেই সময়টি উপস্থিত, যখন ভোর চারটেয় উঠে ঘুম চোখে রেডিও খুলে “আশ্বিনের শারদ প্রাতে…” শুনে দিন শুরু করেন অগণিত বাঙালি। মহালয়ার দিনে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান ধ্বনিত হয় চতুর্দিকে, শুরু হয় দেবীপক্ষ, দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের সময়। রেডিওর চণ্ডীপাঠ থেকে মহিষাসুর বধের গল্প আমাদের কাছে বহুল পরিচিত। অত্যাচারী কিন্তু ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত অসুর, যার অত্যাচারে দেবতা ও মানুষেরা ছিলেন বিপর্যস্ত, সেই প্রবল পরিক্রমশালী অসুর কে যুদ্ধে পরাজিত করে হত্যা করেন দেবতাদের শক্তিতে বলীয়ান দেবী আদ্যাশক্তি। তাঁর এই জয়কেই হিন্দু বাঙালি উদযাপন করে দুর্গা পুজায়। উচ্চবর্ণ হিন্দুর ধার্মিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই কাহিনিতে উচ্চারিত হয়।

দুর্গা পুজা-কে আমরা অনেক সময়েই বাঙালির বৃহত্তম উৎসব হিসাবে চিহ্নিত করি, যদিও ইতিহাস অনুসারে, এই পুজা বাংলায় প্রথম শুরু হয় ইংরিজির ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে, যখন অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত দিনাজপুরের এক জমিদার এই পুজোর আয়োজন করেন। একটি বৃহৎ সময়ে, এই পুজো জমিদার শ্রেণির পুজো হিসাবেই চিহ্নিত ছিল, এমনকি প্রাচীন কলকাতা শহরেও এই পুজো করতেন অর্থশালী উচ্চ বংশীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলি, এবং ধূমধাম করে পুজোর একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাহেবদের আপ্যায়িত করা। কালে কালে বারোয়ারি পুজার চল হয়, যেখানে বারো বা তার বেশি জন মিলে চাঁদা তুলে পুজোর আয়োজন করা হতে থাকে। এই ভাবে একটি বিশেষ শ্রেণিতে উৎপত্তি লাভ করে দুর্গা পুজো পপুলার কালচারের অংশ হয়ে ওঠে ও কালে কালে সেই সংস্কৃতির নির্ধারক হিসাবে চিহ্নিত হয়। অর্থাৎ বাঙালি সংস্কৃতির সাথে দুর্গা পুজো প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠে, যদিও, এই পুজো মূলত উচ্চবর্ণ হিন্দুর সংস্কৃতি।

এরই ঠিক বিপরীতে অবস্থান করছে আরো একটি পুজো যা এই সময়েই আয়েজিত হয়। কিন্তু এই পুজোয় দেবী দুর্গার বদলে ‘দানব’ মহিষাসুরের অর্চনা করা হয়। এই পুজো মুলত ভারতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ‘অসুর’দের মধ্যে প্রচলিত, যারা নিজেদেরকে মহিষাসুরের বংশধর হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই পুজোর সঙ্গে জড়িত আখ্যানটিও কিছুটা আলাদা। এখানে দেবী দুর্গা, ছল ও চাতুরির দ্বারা অসুরদের সম্রাট মহিষাসুরকে হত্যা করেন। বলা বাহুল্য, এই আখ্যানটি পপুলার হিন্দু মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিতে স্থান পায়না। অন্যদিকে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অসুরদের কাছে এই আখ্যান তাঁদের অস্মিতার প্রতীক। তাঁদের মতে এই পৌরাণিক আখ্যান আসলে আর্যজাতির দ্বারা অনার্যদের আক্রমণের প্রমাণ। দেবী দুর্গা এখানে আর্যদের মুখপাত্র, যিনি চাতুরীর দ্বারা অসুররাজকে পদানত করেন ও হত্যা করেন। এই পুজও হুদুড় দুর্গা পুজো নামেও পরিচিত।

এই ইতিহাস কতটা যুক্তিগ্রাহ্য তাই নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্নের বদলে ব্রাহ্মণ্যবাদের আগ্রাসন কাম্য নয়, বলাই বাহুল্য। তাই ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, এই আখ্যান নিয়ে আলোচনা ও এই আখ্যান সংক্রান্ত লেখা ছাপানোর অপরাধে দিল্লি পুলিশের দ্বারা “ফরওয়ার্ড প্রেসের” ছাপাখানা ভাঙচুর ও আলোচনা সভায় বিঘ্ন ঘটানোকে সাংস্কৃতিক বহুস্বর দমনের অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই বলা যায় না। বলাই বাহুল্য এর পিছনে আছে দক্ষিনপন্থি হিন্দুত্ববাদী দলগুলির উৎসাহ, মহিষাসুর শহিদ দিবস পালনকে যারা দাবি দুর্গার তথা হিন্দুধর্মের অপমান বলে মনে করেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে ভারতের মত দেশে সংস্কৃতির বহুধারাই চিরকালীন ঐতিহ্য। তাই দুর্গা পুজার পাশাপাশি পুরুলিয়া প্রভৃতি স্থানে অসুর জনগোষ্ঠী নবমীর দিনটিকে মহিষাসুর শহিদ দিবস হিসাবে পালন করা খুব আশ্চর্য নয়। বরঞ্চ এই দেশে এই পারস্পরিক সহাবস্থানের জায়গা অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদ এই পরিসরটি প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ বা অন্য ধর্মগোষ্ঠীকে দিতে অপরাগ। তাঁরা ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতির বহুস্বরকে দমন করে হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব  প্রমাণে উৎসাহী। কিন্তু ‘সংস্কৃতি’ রক্ষার এই অতি উৎসাহে তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতির মূলমন্ত্র বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে একটি  একমাত্রিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে বদ্ধ পরিকর। হিন্দুত্ববাদের এই আগ্রাসনের সামনে, অসুরগণ খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিতও হচ্ছেন, এবং কিছু কিছু স্থানে তাঁরা মহিষাসুরের উপাসনা বন্ধ করতে বাধ্য  হচ্ছেন। আবার কিছু কিছু স্থানে প্রান্তিক জনজাতির মানুষেরা একত্রিত হয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করছেন অসুর পুজা। আশা করা যায়, হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের মুখেও তাঁরা নিজেদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবেন, পুজো মণ্ডপে দুর্গা পুজোর পাশাপাশি অসুরদের বস্তিতে পালিত হবে মহিষাসুর শহিদ দিবস বা হুদুড় দুর্গা পুজো।

ঋণস্বীকারঃ শুভম রথ- From Columbus to Durga: Suppressing History- Saddahaq  এ প্রকাশিত

Aishik ChandaAryan Durga, Indigenous Mahisasura And Gagging Of A Perspective, countercurrents.org এ প্রকাশিত

Not just Durga, Mahishasur also worshipped in India- India, March 1, 2016

ঋজু বসু- বুকে বিঁধে ত্রিশূল, রক্ত ঝরছে- আনন্দবাজার পত্রিকা, October 6, 2016

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের গবেষক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here