papya_mitraপাপিয়া মিত্র :

এক কাপ চা মুখে তুলতেই মনে পড়ে যায়…। সত্যি এক কাপ চা মুখে তুলতে কত কী না মনে পড়ে। এক কাপ ধূমায়িত চায়ের তৃপ্তি কত কালজয়ী সম্পর্ক নিগূঢ় করে। দীর্ঘ পথশ্রান্তের কাছে এই মহার্ঘ্য তরলটি কোন সুদূরের বিশল্যকরণী হয়ে যে দেখা দেয় তা যিনি পান করেন তিনিই জানেন। পাত্রের তল থাকলেও তলানিটুকু আর পড়ে থাকে না।

কালকা মেল সাড়ে দশ ঘণ্টা লেট। এলাহাবাদ স্টেশনে বসে গল্প ছাড়া কোনো উপায় নেই। চার বন্ধুর পালা করে চা, দেড় ঘণ্টা অন্তর। ভাঁড়ের চায়ের মমতা পাইনি ঠিকই, কিন্তু ওই যে গল্প। গল্পের গরু কখনও গাছে উঠছে কখনও বা নামছে। প্রতীক্ষালয়ের টিভিতে ট্রেন লেটের ঘনঘটা দেখে স্টেশন থেকে বেরিয়ে খানিক পায়চারি করতে করতেই চোখে পড়ল রক্তবরণ অগ্নিকুণ্ড। এই অগ্নিকুণ্ড ঘিরে মাটির দেওয়াল। মহাশক্তির আধার। তার ওপরে পেল্লাই ডেকচিতে অমৃতমন্থন। এর উত্তাপে সৃষ্টি হয়ে চলেছে পার্বত্য এক উদ্ভিদপত্ররসের সঙ্গে আদা-এলাচের আদর মাখানো গন্ধসহ ঘন দুগ্ধজাত এক ঐতিহাসিক উষ্ণ পানীয়, যার নাম চা।

মনে পড়ে যায়, এক কাপ চা মুখে তুলতেই ন’কাকার চোখ রাঙানো। ঠাকুমার কাপের তলানিটুকু খাওয়ার জন্য চার নাতিনাতনি লাইন দিয়ে থাকতাম। শীতের এই আদরটুকু যেন একটু বেশিই পাওনা হত। বৌমার কাছে ঠাকুমার চায়ের চাহিদা ছিল। আর এই বেশি চায়ের জন্য ন’কাকার একটা হালকা শাসন চলত ঠাকুমার প্রতি। আমাদের ওপর চলত ‘মেজদার’ দুরূহ খবরদারি। বাবু এক কাপ চা বেশি আছে বলে ‘গল্প হলেও সত্যি’র’ ধনঞ্জয় যখন ন’কাকার মুখে তা ধরত তখন মেজাজি চোখ বুজে যেত একটু উষ্ণতার জন্য। উষ্ণতা ন’কাকার কপালে না জুটলেও, ভাইপোভাইঝিরা যে যার মতো সংসারী। এই ধনঞ্জয় ফি বছরের মরশুমে হাসিতে-খুশিতে মুখে ধরত তপ্তসুধা। ‘আহা খাক না’ ঠাকুমাকে আলগোছে বলে কেটলি নিয়ে চলে যেত মেজকার ঘরে। এই ধনঞ্জয় আমাদের চায়ের নেশা ধরিয়েছিল। ছোটোবড়ো তেত্রিশ জনের চায়ের দায়িত্বে থাকা ধনঞ্জয় এসে পড়ল লেখার তাগিদে।

চোরাপথে তোমাকে চাই। বিয়ে হয়ে আসা বন্দিজীবনে কার্তিক কাকার চায়ের দোকান ছিল অলসবেলার সঙ্গী। কথা-না-বলা এক সখী। মনে হয় কার্তিককাকা ভাত খেয়ে উঠেই চলে আসত সকালের বন্ধ দোকান আবার খুলতে। এসে সেই তিন মাথা মন্দিরে ঘুঁটে-কয়লা সাজিয়ে পেটের ভেতর গুঁজে দিত কাগজমুখো আগুন। গুলিয়ে ওঠা ধোঁয়ায় আমার চোরাপথ খানিক বিস্মৃত হত। শ্বশুরবাড়ির প্রাপ্য ঘরের জানলাটি ছিল দু’টি বাড়ির মাঝখানে। এক পাল্লা বন্ধ করে ফাঁক দিয়ে আমার বিলাসিতার দোকান ক্রমে জনমুখর হয়ে উঠত। তেলতেলে বেঞ্চিটা পেতে দিতেই শীতের দুপুরে কাকু-জ্যেঠুরা বসে পড়তেন। উনুনের পাশে ডাঁই করা ছাইয়ের গাদায় নেড়ি দু’টোর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার। তাদের দু’চারটে লেড়ো বিস্কুট দিয়ে কার্তিককাকা দ্রুত কালো ডেকচিতে জল ফোটাতে বসিয়ে দিয়ে পতপত করে হাতপাখা নাড়তে শুরু করত। প্রথম স্লটের চা খাওয়ার খদ্দেররা মুখে চায়ের ভাঁড় তোলার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন মন-খারাপ-করা সূর্যের আলো নিভু নিভু হয়ে আসত। শ্বশুরমশাই হাঁক দিতেন চায়ের। শীতেরবেলায় চায়ের বেলা এসে পড়ে তাড়াতাড়ি। আমার চোরাপথের পাল্লা বন্ধ করতে হত।

এক কাপ চায়ে মদনকে চাই। কর্মজীবনে যুক্ত হওয়ার পরে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’এর ‘মদন’ কেমন করে আমাদের সকলের মনের মানুষ হয়ে উঠল। বন্ধুবিতর্কে, ভেঙে যাওয়া প্রেমে, বসের কাছে ঝাড় খাওয়া, বান্ধবীর বিয়ের আনন্দে গদগদ ভাব বজায় রাখতে, রাজনীতির ঝড়ে মদন হাজির। শীতের কাঁপুনি হোক, বর্ষার স্যাঁতস্যাঁতে বা গ্রীষ্মের টাকফাটা গরমে চিনিহীন-চা, লেবু-চা, আদা-চা, মশলা-চা, সবুজ-চা সব নিয়ে এক পায়ে খাড়া আমাদের মদন। আধুনিক অফিসের স্লিপারি মেঝেতে মদন খানিক হেঁটে আর খানিক স্লিপ খেয়ে হাজির হয়ে যেত। ফিসফিস করে কানে কয়ে যেত মেজাজটা তো আসল রাজা… খেয়ে নিন।

কম্বলের আদরে ভাঁড়ের সুড়ুত টানে লোটাসমেত গঙ্গাসাগর যাত্রীরা ঘরমুখো। ভাঁড়ের খোকাভুলোনো চায়ে মন ভরে না বলে পুঁটলি থেকে বেরিয়ে পড়ে বারো মাসের সোহাগের গ্লাসখানি। ডেকচি বা সসপ্যানের অমৃতমন্থন গ্লাসের গলা ক্রমশ পূর্ণ করে। বৌ-পড়শি নিয়ে আরামের চুমুক মনে করিয়ে দেয় জীবনের নানা কথা। ছেলের হাত ধরে কবে গঙ্গাসাগর এসেছিল মনে নেই মাথুরমাইয়ার। চা আনতে গিয়ে আর ফিরল না ছেলে। অনেক চোখের জল পড়েছে। এখন নানা গ্রামের লোক জড়ো করে মাথুরমাইয়া নেতৃত্ব দেন গঙ্গাসাগর যাত্রার।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে কালকা মেল ছাড়ল। শীতে হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম। বার্থে শুয়ে ঘুম-না-আসা এক মানুষের কত স্মৃতিই ভিড় করছে। চমক ভাঙল ‘রামপেয়ারির চায়ের’ ডাকে। ধড়মড়িয়ে উঠি, যাক বাবা এতক্ষণে ভাঁড়ের চা এল। কাগজের কাপে চা খেয়ে ঠোঁট দু’টি হারিয়েছে কুলীনত্ব। জানলার বাইরে সবুজের হাতছানি। ভাঁড়ের চায়ের চুমুক যেন রবি ঠাকুরের ছোটো গল্পের মতো, শেষ হইয়াও শেষ হইল না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here