sayantaniসায়ন্তনী অধিকারী

উনবিংশ শতকের শেষ ভাগে শুরু হওয়া গো-রক্ষিণী আন্দোলন সম্পর্কে সান্ড্রিয়া ফ্রেইট্যাগের বক্তব্য, এটি দু’টি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্যায় যা ১৮৮০-এর দশকে আত্মপ্রকাশ করে, তা ফ্রেইট্যাগের মতে শহুরে ধাঁচের ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে, এই পর্যায়ে, ধার্মিক চিহ্ন হিসাবে গরুর ব্যবহার এই আন্দোলনের নীতিগত রূপরেখা গড়ে তুলেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে ১৮৯৩ নাগাদ এই আন্দোলন যখন হিংসাত্মক শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে তখন তা অনেকটাই গ্রামকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং ধর্মীয় চিহ্নের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও পরবর্তীকালে এই আন্দোলনকে ব্রিটিশ সরকার দৃঢ় হাতে দমন করতে সক্ষম হয়, তবুও এই পর্বেই গো-রক্ষা আন্দোলনের সেই ঐতিহ্য তৈরি হয় যা গত কয়েক মাসে প্রকট হয়েছে।

এইখানে, স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে ‘গোমাতা’র সত্তা নির্মাণ ও তার ব্যবহার নিয়ে কয়েকটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। চারু গুপ্তা তাঁর রচনায় দেখিয়েছেন যে ধার্মিক ভাবধারার পাশাপাশি গাভীরক্ষার দাবির পিছনে অর্থনৈতিক প্রশ্নটিকেও তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে উনবিংশ শতকের শেষ ভাগ ও বিংশ শতকের প্রথম অংশে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যে গোহত্যা বন্ধের দাবিতে যে পিটিশনগুলি করা হয়েছিল, তাঁর মধ্যে বারবার গাভীর অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা এসেছে, এমনকি একটি পিটিশনে রাশিতত্ত্বের সাহায্যে দেখানো হয় যে একটি গাভী এক দিনে ৪৩৬,১০৮ জন লোকের খাদ্যের সংস্থান  করতে পারে। (বলা বাহুল্য, গোমাংস এই হিসাবের অন্তর্গত নয়।) এ ছাড়াও ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতমাতার পাশাপাশি ‘গোমাতা’র ভাবমূর্তি নির্মাণ হয় এই সময়ে। প্রাক স্বাধীনতা যুগে, গাভীকে সর্বজনীন মাতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, অবশ্যই এই সর্বজনীনতা প্রকৃত অর্থে হিন্দু উচ্চবর্ণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই ভাবমূর্তি ছিল এক নির্যাতিত মাতৃপ্রতিম অবলা জীবের, যাকে বিধর্মীর হাত থেকে বাঁচানো প্রকৃত হিন্দুর কর্তব্যের অন্তর্গত। ১৮৯০ থেকে ১৯২০-এর দশক বা তারও পর অবধি এই ভাবাদর্শকে গো-রক্ষিণী সভার নানা আন্দোলনের মাধ্যমে লালন করা হয়, অন্তত উত্তর ভারতে। পূর্ব ভারত বা বাংলা এই গো-রক্ষা আন্দোলনের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করত এমন নয়। ১৮৯০-এর দশকেই লাহোর থেকে বাংলায় এই আদর্শ প্রচারের চেষ্টা হয়েছে। এমনকি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখনীতেই গো-রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে, তবে উত্তর ভারতের মতো এই অংশে গো-রক্ষা আন্দোলন দানা বাঁধতে পারেনি।

গো-রক্ষার বিষয়টি আবার এক বার প্রবল ভাবে সামনে আসে স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে, ১৯৪৯-৫০ নাগাদ। সংবিধানী সভার অধিবেশনে গোহত্যা নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে নেহরু ইত্যাদির সঙ্গে সভার রক্ষণশীল অংশের দীর্ঘমেয়াদী বিতর্ক হয়। শেষ পর্যন্ত এই বিষয়টি সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে ১৯৫২ ও ৫৪ সালে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে, যদিও তা খুব প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর আরএসএস-এর মুখ্য চিন্তাবিদ ‘গুরুজি’ গোলওয়ালকর আরও এক বার গো-রক্ষার রাজনীতির উপর ভিত্তি করে আরএসএস, জনসঙ্ঘ প্রভৃতি হিন্দু রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকে ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোতে প্রাসঙ্গিক তথা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করেন। এরই ফলস্বরূপ ১৯৬৪-তে দাবি ওঠে যে গোহত্যার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার দায়িত্ব রাজ্যগুলির উপর থেকে প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নিতে হবে। উল্লেখযোগ্য যে এর পূর্বেই ভারত সরকার এই বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি কমিটি তৈরি করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি এ কে সরকার। সেই কমিটিতে গোলওয়ালকরের পাশাপাশি ছিলেন ভারতে দুগ্ধ-বিপ্লবখ্যাত ভারগিজ কুরিয়েন। কুরিয়েন পরবর্তীকালে দাবি করেন, যে গোলওয়ালকর স্বয়ং একান্তে তাঁর কাছে স্বীকার করেছিলেন যে গো-রক্ষা বিষয়টির ধার্মিক মূল্য তাঁর কাছে তত বেশি না যত বেশি এই বিষয়টির রাজনৈতিক মূল্য। যদিও তিনি ওই কমিটির অধিবেশনে, গোহত্যার ধার্মিক দিকটিকেও অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি তুলে ধরেন।

গো-রক্ষিণী সভার সদস্য ও গোলওয়ালকর প্রভৃতি হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদের ক্ষেত্রে গো-রক্ষা বিষয়টির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত হয়েছিল মুসলিমবিদ্বেষ। গো-রক্ষিণী আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা গেছে, যে মুসলিমবিদ্বেষের পাশাপাশি এই আন্দোলনের একটি ভাগে দলিত (মূলত চর্মকার এবং কিছু নিম্ন শ্রেণির ভবঘুরে জাতির) প্রতি প্রবল হিংসাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বর্তমানের গোহত্যা-বিরোধীদের কাছেও গোহত্যা-বিরোধিতা মুসলিম ও কিয়দংশে দলিত বিরোধিতার নামান্তর। অর্থাৎ গো-রক্ষিণী সভা প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড়শো বছর পরেও গরু সংক্রান্ত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূলগত পরিবর্তন হয়নি। ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে’!

(লেখিকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক)

ঋণ স্বীকার –

চারু গুপ্তা – দি আইকন অফ মাদার ইন লেট কলোনিয়াল নর্থ ইন্ডিয়া : ‘ভারত মাতা’, ‘মাতৃ ভাষা’ অ্যান্ড ‘গৌ মাতা’

সান্ড্রিয়া বি ফ্রেইট্যাগ – স্যাক্রেড সিম্বল অ্যাজ মবিলাইজিং আইডিওলজি দ্য নর্থ ইন্ডিয়ান সার্চ ফর আ ‘হিন্দু’ কমিউনিটি

ক্রিস্টোফ জাফ্রেলট – দ্য হিন্দু ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান পলিটিক্স নাইনটিন টোয়েন্টিফাইভ টু দ্য নাইনটিন নাইনটিজ

রামচন্দ্র গুহ, হিন্দুস্তান টাইমস – নাইনটিন্থ সেনচুরি পলিটিক্স ফর আ টোয়েন্টিফার্স্ট সোসাইটি

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here