অচিন পাখিরা

দুর্গোৎসবের ছুটি কাটাতে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে অনেকেই বেছে নেন জঙ্গল আর জঙ্গল মানেই তো শালমহুলের বন আর আদিবাসী আর ভ্রমণপিপাসুরা যখন গাছগাছালি ঘেরা ছোটো ছোটো বাংলো, হলিডে হোমে সকালবেলায় আকাশে শরতের মেঘের আনাগোনা উপভোগ করেন, তখনই তাদের আবির্ভাব ঘটে  হ্যাঁ, ওদের কথাই বলছি ওরা মানে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাওঁ প্রভৃতি আদিবাসী যুবকেরা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বীরাঙ্গনা নারীর মতো শাড়ি পরে সেরেঞ বা ভূযাং হাতে দলবদ্ধ ভাবে নাচতে নাচতে চলে যায় তখন কি একবারও ভেবে দেখেন এই নাচটার নাম কী ?  যদি বা জানলেন নাচটার নাম দাঁশাই নাচ, কিন্তু জেনেছেন কি কেনই বা ছেলেরা মেয়েদের শাড়ি পরে নাচে

কিংবা মনে পড়ছে কি ছুটি কাটাতে গিয়ে কোনো হলিডে হোমের সামনে কুর্মি কোবিলার জাতি গোষ্ঠী বা কোড়া কোবিলার বাউরি, সহিস মুদি প্রভৃতি ভূমিপুত্র যুবকেরা একই রকম ভাবে নারী-বস্ত্র পরে দলবদ্ধ ভাবে কাঠি নাচ করতে করতে আপনার কাছে ভিক্ষের পাত্র নিয়ে আসছে শুধুই কি ভিক্ষে, না এর মধ্যে অন্য কোনো ব্যাপার আছে ?

ভিক্ষে তো নয়ই, বাঙালি শহুরে বাবুদের ছুটি কাটানোর মজা দিতে এইসব ভূমিপুত্র কোনোজংলিইভেন্ট’- এর আয়োজনও করে না। বরং বাবুদের হরষের দিনে বিষাদের অভিসম্পাত নিয়ে হাজির হয় এরা হলিডে হোমের  দুয়ারে। এসব কি ভেবেছেন  কোনো দিন ?

যদি না ভেবে থাকেন তবে এবার থেকে ভাববেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠছে বিহারের নীতীশলালুপ্রসাদ বা উত্তরপ্রদেশের কাঁসিরামমায়াবতীদের পিছড়ে বর্গের ব্যাপার বলে আর নাকসিঁটকে উড়িয়ে দিলে চলবে না। এই বাংলায় বাঙালি উচ্চবর্ণের দুর্গাপুজোর পাশাপাশি ২৭৫টি জায়গায় এই সব দলিতবহুজনআদিবাসী মানুষ মহিষাসুর-স্মরণ দিবস পালন করেছে আরও করার উদ্যোগ নিচ্ছে

সেইরকম একটা উদ্যোগ অর্থাৎ হুদুর দুর্গা তথা মহিষাসুর-স্মরণ দিবস পালন করা হল অক্টোবর পশ্চিম মেদিনীপুরে শালবনি থানার কেঁন্দাশোল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সংলগ্ন মাঠে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে প্রায় সমান্তরাল উৎসব করলেন এম কে খেরয়াল রাস্কৌ মহল দলিত আদিবাসীদের যৌথ মঞ্চ 

এই অনুষ্ঠান ঘিরে সকাল থেকেই এই অঞ্চলে উৎসাহ আর উদ্দীপনায় এলাকার মানুষ মেতে ওঠেন আদিবাসী দলিতদের রাজা মহিষাসুরের আবক্ষ মূর্তির উন্মোচন করা হয় 

তারপর চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেমন মহিলাদের পাতা সেলাই, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের বিস্কুট দৌড়, স্লোসাইকেল, সূঁচে সুতো পরানো আর ফুটবল ম্যাচ আর সারা রাত ধরে চলে দাঁশাই, সাড়পা কাঠি নাচের অনুষ্ঠান, সঙ্গে পুরুলিয়া থেকে আসা  কাজনি হাঁসদা, ভক্তিরানি বানোয়ার, উপেন বসরিয়ার গান দলিত আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী থেকে আসা প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন তাঁদের প্রতি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অবিচার আর বঞ্চনার ইতিহাস আর প্রায় সব বক্তাই এই অবিচার আর বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়েমহিষাসুরমর্দিনী’- প্রচলিত বা বলা যেতে পারে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নির্মাণকে খণ্ডন করে বিনির্মাণএর পথে হাঁটলেন আর সেই বিনির্মাণের হদিস পেতে গেলে আমাদেরও হাঁটতে হবে কয়েক শতক যুগ, যা মিথ হয়ে গেলেওবিশ্বাস’–এর বশীভূত হয়ে ইতিহাসের পাতায় উঁকি মারতে শুরু করেছে ।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই খেরয়াল আদিবাসী গোষ্ঠী আশ্বিনের এই দিনগুলিতে ভূযাং নাচ, কাঠি নাচের মাধ্যমেদুঃখ দাঁশাই দাড়ানপালন করে আসছেএখানে মনে রাখতে হবে এর অনেক পরে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ খাঁ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন

ওরা বিশ্বাস করে, আদিবাসীদের আদিপুরুষ হুদুর দুর্গা ঘোরাসুর অর্থাৎ মহান রাজা মহিষাসুরকে নীতিহীনভাবে ছলা-কলায় বিদেশি আর্য দুর্গা হত্যা করে  আর তারপরেই আর্যবর্তে আর্যসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় সেই বিজয়ক্ষণে সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, কুর্মি, মাহালী, কোড়া প্রভৃতি খেরয়াল গোষ্ঠীর আদিবাসীরা তাদের বশ্যতা স্বীকার না করে নিজেদের মান বাঁচানোর উদ্দেশ্যে নারীর ছদ্মবেশে দাঁশাই নাচ, কাঠি নাচের মাধ্যমে অন্তরের দুঃখ নিয়ে আনন্দের অভিনয় করতে করতে সিন্ধুপাড় ছেড়ে অসম, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বঙ্গদেশ দক্ষিণ ভারতের বনেজঙ্গলে আশ্রয় নেয় মহান রাজা দেশ হারানোর ব্যথা নিয়ে সেই হুদুর দুর্গার (মহিষাসুর) অন্যায় নিধনের দিন থেকে আদিবাসীরা তাদের পিতৃপুরুষের স্মরণে অতি করুণ সুরেহায়রে হায়রে’ বলতে বলতে আজও এই দাঁশাই নাচ কাঠি নাচ পালন করে চলেছে বিধিমতো এই পাঁচদিন দেবী দুর্গার মুখ দর্শনের নিষেধ আছে। তাই পশিচমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশায় অসুর সম্প্রদায় জনগোষ্ঠী দুর্গোৎসবের সময় চরম দুঃখে বাড়ি থেকে বেরোয় না, যদিও গ্রামবাংলায় দুর্গামণ্ডপের সামনে কখনও কখনও আদিবাসীদের দল বেঁধে দাঁশাই নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা যায়। একথা স্বীকার করে উদ্যোক্তারা জানালেন এটা সেই দলগোষ্ঠীগুলির অজ্ঞতা এবং তা বিধিমতে সম্পূর্ণ ভুল

asur3

ওরা মনে করে বাঙালির এই দুর্গোৎসব আসলে আর্য সাম্রাজ্যবাদীদের আর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বিজয় উৎসব আদিযুগে ভারতীয় রাজাকে পরাজিত করে ভারতের বুকে আর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় আর মহান রাজা রাবণকে নিধন করে রামচন্দ্র দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত আর্য সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিল তাই উচ্চবর্ণরা মহিষাসুর-নিধন উপলক্ষে দুর্গোৎসবের পাশাপাশি রাবণ-নিধনের উৎসব করে থাকে আবার এই দুর্গা মহিষাসুরের  নামের নতুন ব্যাখ্যাও দলিত নেতারা দিচ্ছেন যা তাঁরা সঠিক বলেই মনে করেন সেই আদি কালে দক্ষ সেনা হিসাবে আর্য দুর্গ পরিচালনা করেছিলেন বলেই নাকি দুর্গাদেবীর নাম হয়েছিল আর অন্যদিকে অনার্য আদিবাসী খেরয়ালদের মুখ্য দুর্গ পরিচালক হিসাবে মহারাজা ঘোরাসুরকেও হুদুর দুর্গা বলা হয়ে থাকে যেমন শ্রেষ্ঠ নারীকে মহিয়সী বলা হয় তেমনি পুংলিঙ্গে শ্রেষ্ঠ পুরুষ হিসাবে মহারাজা ঘোরাসুরকে মহিষাসুর উপাধি দেওয়া হয়েছিল

এরা মনে করে, দুর্গোৎসবে ১৫ শতাংশ ব্রাহ্মণ্যবাদী দেখিয়ে থাকেন এই উৎসব শুভ শক্তির জয় আর অশুভ শক্তির পরাজয় কিন্তু তাদের মতে, এটা আসলে অশুভ শক্তির জয় শুভ শক্তির পরাজয় তাই ওদের কথা, ‘‘আজ আর্যদের উত্তরসুরি উচ্চধর্মীয় সমাজ নানা রকম অন্যায়, অত্যাচার সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত অন্যদিকে হাজার বঞ্চনা, দারিদ্রতার মধ্যেও ভারতের আদিবাসী খেরয়াল-সহ শতকরা ৮৫ ভাগ দলিত মানুষ তাদের প্রাচীন সামাজিক বিধি মেনে শান্তিময় জীবন ভোগ করে চলেছে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে স্বদেশিরা সর্বদাই অশুভ শক্তি সেই সূত্রে বাবরের কাছে ইব্রাহিম লোদি ছিল অশুভ এবং ব্রিটিশদের কাছে গান্ধীজি, নেতাজি, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন প্রভৃতি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অশুভ হলেও ভারতবাসীদের কাছে তাঁরা মহান পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি তেমনি সাম্রাজ্যবাদী আর্যদের কাছে ঘোরাসুর অশুভ হলেও সমগ্র ভারতের ভূমিপুত্র শতকরা ৮৫ ভাগ দলিত জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি পরম শুভ, পরম শ্রদ্ধেয়, পরম পূজনীয় তিনি শুভ ছিলেন বলেই তাঁরই প্রবর্তিত সমাজনীতির গুণে ভারতের আদিবাসী দলিত জনগোষ্ঠী সামাজিক বঞ্চনার মধ্যেও শান্তিতে রয়েছে’’

কিন্তু শান্তির প্রশ্নটা ইতিমধ্যেই প্রশ্নবাচক হয়ে দেখা দিয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা এর বিরুদ্ধে নেমে পড়ছে  ২৪ পরগণায় ব্রীড়ায় আর পুরুলিয়ায় ঘোষিত অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে প্রশাসনের ভূমিকা নেতিবাচক ফলে সন্মুখসমরে সুর আর অসুর শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বে দীর্ঘদিন লালিতপালিত বঙ্গবাসী এই নয়া জাতপাতের লড়াইকে কী চোখে দেখবে, তা সময়ই বলবে।

ছবিতাপস মুখোপাধ্যায়

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here