rubina-chowdhuryটরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।

কালজ্ঞানে বাংলা সাহিত্যিকরা কালো নারীর চোখের গভীরতায় ডুবেছে আর পাশ্চাত্যের আধুনিক যুগে সাদা নারীরা কালো পুরুষের সুঠাম শরীরে মজেছে, যা টের পেয়েছি ছোট শহরে থাকাকালীন সময়েও। সুন্দরী সাদা নারীদেরকে দেখেছি অভিজাত অর্থবান কালো পুরুষের দামি গাড়িতে, তখন কয়েকজন পড়শিও মিলেছিল এমন। বলতে তো বাকি থাকে না যে এদের সবাই ছিল উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সম্মানজনক  অবস্থানের। কয়েকজন বাঙালির আড্ডায় একদিন প্রশ্ন করে বসলাম, “আচ্ছা, এসব মেয়ে যে মনে মনে বর্ণবাদী তা তো আমাদের দিকের নজরেই টের পাই, তাহলে কালো বর্ণের পুরষের সাথে সম্পর্ক করে কেন, ভালো টাকাপয়সা থাকাতে”?

আমার প্রশ্নে সবাই একটু হাসল আর আমি সত্যিই বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে থাকলাম। বয়স্ক এক বাঙালি বললেন বাঙালি নারীর ঘরোয়া চোখে না দেখে প্রকৃত নারীর দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে। সেই থেকে প্রশ্নটা মনে রেখে দিয়েছিলাম, আর বলিনি কখনও। আমার ভাই আর ঘরের লোক ছিল সেই আড্ডায়। তারা বলেছিল আমাদের মতো দক্ষিণ এশীয়দের শুধু অর্থ, চাকরি, ঘরোয়াভাব দেখে বিয়ে করে, কালোদের ক্ষেত্রে শুধু তা-ই দেখে না। আমি পড়েছিলাম বিপাকে, তাহলে কি সংস্কৃতি আর ভাষা? তাই হবে, তবে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, জীবনে দু’টো মানুষ একসাথে বসবাসের জন্য। কিন্তু কখনও সখনও তার বাইরেও কিছু লুকিয়ে থাকে জীবনে। প্রতিটি মানুষ ভিন্ন, তাদের জীবনযাপনও সমান বা সমান্তরাল নয়।

সব প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিক না হলেও কোনো না কোনোদিন মেলে। তখনও বয়স কম, অস্থিরতা কাটেনি। আমিও আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম একদিন। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বসবাস আমাদের। একদিন ভোরে বাচ্চার জন্য দুধ গরম করতে উঠেছি, রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখলাম খুব সুদর্শন এক কালোবর্ণের পুরুষ আমার সামনের ঘরে এসে বেল বাজাল। কাছে থেকেই দেখলাম, সুঠাম, সৌম্য, যেন তেজি কালো ঘোড়া। এর আগে সিনেমায় উইল স্মিথ, ডেনজেল ওয়াশিংটন-এর মতো নায়কদের দেখেছি এমন গড়নের। সামনের বাড়ির মেয়েটি একাই থাকত, সুন্দরী, ডিভোর্সি, পিএইচডি ছাত্রী। একটা ছোটো মেয়ে ছিল তার, মেয়েটিকে দেখলেই বুঝতাম সে মিশ্র বর্ণের।উত্তর মিলল, কেন আকর্ষিত হয় মেয়েরা, যদিও কখনও কাউকে এই জানাটি জানাইনি। এটাও বুঝলাম, শনিবার সকালে বাবা নিজের কাছে নিয়ে যেতে এসেছে মেয়েকে, রবিবার বিকেলে আবার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। যে তেজের আকর্ষণে সংসার পাতে, সেই তেজ একসময় কাল হয়ে দাঁড়ায়, সামাল দিতে সমপরিমাণ তেজের প্রয়োজন হয়, ঘাটতি হলেই ভাঙন। তবে সবক্ষেত্রে তো এক নয়, অনেক সংসার সুখেই কাটে, তাছাড়া ভাঙাগড়া কোথায় না নেই? একই ধর্মের, বর্ণের, জাতির মধ্যের সম্পর্কও ভাঙে, এমনকি এক পরিবারের হলেও। কিন্তু যখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভিন্ন হয়, আঙুল তোলা হয় সেই দিকে। দু’টো মানুষের পারস্পরিক সমঝোতা বা ভুলত্রুটি তখন তুচ্ছ ধরা হয়।

যাক, এর পর থেকে চোখ আর বন্ধ নয়, খুলেই দেখেছি, আফ্রিকান আমেরিকান পুরুষরা ছয় ফুট লম্বা হওয়া কোনো ব্যাপার নয়, ওটা পনেরো থেকে আঠারো বছর বয়সেই হয়ে যায়। বস্তুত, ছয় ফুটের উপরে লম্বা কালো মেয়ে আমার কর্মক্ষেত্রেই আছে, তার সাথে কম্পিউটারে একযোগে কোনো কাজ করতে হলে আমাকে চেয়ার উঁচু করতে হয়। তাই বলে এমন নয় যে কালো বর্ণের সকলেই সিলিং-ছোঁয়া লম্বা এবং প্রত্যেকেই সুদর্শন। আবার এমনটাও নয় যে সকলেই মোটা অর্থ উপার্জন করে। অনেকে সহপাঠী, সহকর্মীকেও সঙ্গি হিসাবে বেছে নেয়। যারা রাস্তায় বসবাস করে, তারা সেখানেই সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেটাই প্রকৃতির নিয়ম। কোনো জাতির নির্বিশেষে সৌন্দর্য বা ভালো লাগা সীমাবদ্ধ নয়। ভালো লাগা, ভালোবাসার সাথে চাক্ষুষ ভালো লাগার বিষয়টি থাকতে হবে, তা তো নয়। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে দড়ি দিয়ে বেঁধেছি নিয়মের খাম্বা, ক্রমেই যা কিনা চিন্তাকে সীমাবদ্ধতাই শুধু দেয়নি, সংকীর্ণ করে তুলেছে চিন্তা এবং মনোজগতকে, তাই মানবিকতায় কোণঠাসা কমবেশি সকলেরই মনন। যখনই জাতি, ধর্ম, বর্ণের বিষয়টি আসে, আমরা হতবাক হই ভিন্নতায়। অহেতুক প্রশ্নে জর্জরিত করি মনকে, কারণ কিন্তু নিজেরাও জানি না। মানবকুলেরই দু’জনের মিলন নিয়ে চোখ আর মনকে প্রশ্নবোধক চিহ্নে ঝুলতে শিখি। দু’জন মানুষের ভালো লাগাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় তাই ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত, লিঙ্গ বিশেষে। সমাজের যে অনুশাসন মানবতার কল্যাণের উদ্দেশ্যে, তা কটাক্ষের পর্যায়ে কাঁটা হয়ে খোঁচাচ্ছে অবিরত, ঘায়ের তীব্র জ্বালায় ভুগছে মানবকুল, অনুশাসনে সবাই হাঁপিয়ে উঠেছে। অনুশাসনের নিম্নচাপে অতীষ্ঠ আত্মাগুলো এখনও প্লাবনেই শুধু ভাসছে। এমন দিন আসবে যখন সাইক্লোনে তোলপাড় করবে সব নিয়ম, সুনামিতে সয়লাব হবে বিধিনিষেধ। জানি না, এর পরেও কোনো কিছু বাকি থাকবে কিনা কর্মভোগের প্রায়শ্চিত্তের।

(চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here