rubina-chowdhuryটরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।

যে মুহূর্তে বর্ণবাদ বিষয়ে আবার লিখতে বসলাম, ঠিক সেই সময়ে কোনো না কোনো অঞ্চলে হয়তো ঘটে চলেছে কোনো কালো বর্ণের বিরূদ্ধে অবিচার। বিশেষত পুলিশি, দক্ষিণ এশিয়ার মতো কানাডা-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপে অহরহ ঘটে চলেছে দুর্বলের উপর পুলিশের অহেতুক নির্যাতন। গৃহহীন এবং কালো বর্ণের মানুষ যেন তাদের চক্ষুশূল। পুলিশি নির্যাতন-সংস্কৃতির অঙ্গ এটা। মাদক, যৌন হয়রানি অথবা খুনের মতো ঘটনায় আগেই তল্লাশি চালায় কালো অধ্যুষিত এলাকায়। এলাকা, রাস্তার নম্বরের উপর মানুষের চরিত্র যাচাই করে পুলিশ প্রশাসন। প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া কঠিন, সমালোচনা করলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতার কারণে কখনোই এই জনগণের সেবকদের কাছে যাওয়া যায় না। এমন ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যেন তাদের সব জুলুমের কারণ এবং উদ্দেশ্য শুধুমাত্র প্রশাসন ছাড়া জনগণের জানার অধিকার নেই।2

এমনি করে কাজ করতে করতে এবং শিখতে শিখতে সময় এল এই প্রশাসনটির কালো এবং দরিদ্রদের উপর বর্বরতার নিদর্শন চোখে দেখার। সেদিন আমিও এদের কুনজরে পড়েছিলাম। দিনটি ছিল ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর। আমি ‘ওন্টারিও কোয়ালিশন এগেনস্ট পভার্টি’র একটি প্রতিবাদ মিছিলে গেলাম, এখন আমি এই সংগঠনের সদস্য। প্রতিবাদের আয়োজনটির নাম দিয়েছিল ‘সেভ স্পেস নাও’। কয়েকটি গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল একসাথে। উদ্দেশ্য এবং হেতু বাজেট কমানো এবং ছাট দেওয়া। দরিদ্র মানুষ তো পথে বাস করার কথা, অর্থব্যয়ের প্রয়োজন কী! বন্ধ করে দেওয়া আশ্রয়স্থলগুলো নগর-বাজেটের অর্থের ব্যয়ে চালানো হত। অধিকাংশই সারা বছর নারী-পুরুষে পূর্ণ থাকে। অবশ্যই নারী এবং পুরুষের আশ্রয়স্থল ভিন্ন। ই-মেল পেলাম প্রতিবাদসভায় যোগদান করার জন্য কর্মস্থল থেকে। পৌঁছে দেখলাম অনেক পরিচিত মুখ। ওদের কাজের উদ্দেশ্য অনলাইনে আগেই একটু পড়ে নিয়েছিলাম। নভেম্বর মাসের প্রচন্ড শীতেও ফ্রি কফি হাতে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। এর মধ্যেই একজন উঠে মাইকে প্রচার করতে শুরু করল যে খোদ টরন্টো শহরে এক গৃহহীন বয়স্ক মহিলাকে পুলিশ লাঠিচার্জ করে মেরে ফেলেছে সভা চলাকালীন সময়ে। প্রতিবাদের ঝড় উঠল, পূর্বেই জানা গিয়েছিল ওদের এক সদস্য বক্তৃতা থেকে, যে ২৩ নভেম্বরের রাতে যুক্তরাষ্ট্রে একজন গৃহহীন বয়স্ক কালো লোক পুলিশি অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেছে। যে বিষয়টি নিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা বক্তব্য রাখছিল। লোকটির অপরাধ ছিল এই, শীতের দিনে গৃহহীনদের জন্যে নিষিদ্ধ রাস্তার বেঞ্চে ঘুমোচ্ছিল, মূলত কালো বর্ণ, দারিদ্র এবং বয়স ছিল তার অপরাধ। মহিলাটিও রাস্তায় ঘুমোচ্ছিল। রাস্তাটুকুও ওরা কেড়ে নেয় ক্ষমতাবলে। এই বিষয়ে একটু বলে রাখি, এদেশে যে কোনো সভা এবং মিছিলে পুলিশের বিশেষ ফোর্স মোতায়েন করা হয়। আমাদের দেশের মতো নয়, বিশাল একটি বাহিনী সাইকেল, গাড়ি সব নিয়ে হাজির থাকে। পুলিশি বা অন্য কোনো প্রশাসনের বিরূদ্ধে যা কিছু মন্তব্য করা হোক না কেন, কোনো উচ্চবাচ্য তারা করে না। সেদিন এক অল্প বয়সের প্রতিবাদী দুটি মৃত্যুসংবাদে নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এক পুলিশ অফিসারের গায়ে কফির কাগজের কাপ ছুড়ে ফেলল। চোখের নিমেষে দৃশ্যপট বদলে গেল। মৌমাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ ছেলেটিকে আক্রমণ করল। ওকে বাঁচাতে গিয়েছিল কিছু মহিলা সদস্য। পনেরো জন মহিলাকে ছুড়ে ছুড়ে পুলিশের ভ্যানের মধ্যে ফেলল। এই বর্বর দৃশ্য আমার জীবনে প্রথম দেখা। অনেকেই চলে গেল, আমি থাকলাম, যেতে চাইনি। 1

আমি ওদের সদস্যদের মাঝেই ঢুকে গেলাম, পিঁপড়ের মতো সাংবাদিক দল যে কী করে এত তাড়াতাড়ি চলে গেল সেখানে বুঝতে পারলাম না। এমনিতেই সভায় কয়েকজন সাংবাদিক তো ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বেশিজনকে দেখিনি প্রথমে। অন্যদের সাথে যখন আমিও প্রতিবাদ করছিলাম, আমাকে বলল আরেক পা এগিয়ে গিয়ে কোনো প্রতিবাদী ভাষা ব্যবহার করলে নাকি ওরা আমাকেও গ্রেফতার করবে। যা বলব ওদের দেওয়া সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে বলতে হবে। তখন এক সাংবাদিক আমাকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে প্রশ্ন করছিল পাশে এসে, এরপর পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে আর কিছু বলেনি, এটুকু বুঝেছিল আমি ওদের সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। বিকেল পর্যন্ত ছিলাম ওখানে। কিন্তু এরপর ঘরে এসে পরিবারের কাছে যখন বললাম, তখন আমার মেয়ে আমাকে বলল, এমন কিছু হলে তো আমাকে এদেশ থেকে বের করে দিতে পারে। এটি আমাদের জীবনের আরেকটি পরিহাস। এদেশের নাকি আমরা নাগরিক, এদেশের পাসপোর্ট বহন করি। কিন্তু সামান্য কিছু হলেও একটি ঝুঁকি থাকে বহিস্কারাদেশের। তখন প্রমাণিত হয়, এই দেশটা কতটা আমাদের। অভিবাসন প্রথা নব্য ধারার দাসত্ব। সাদা ইউরোপীয়রা এককালে দাস নিয়ে এসেছে আফ্রিকা থেকে। দখল করেছে অন্যের ভূমি, যাকে আমরা ঔপনিবেশকতা বলি। দক্ষিণ এশীয়রা জানে এই ইতিহাস। সেখানে ছিল দুশো বছর। ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু তছনছ করে ছেড়েছে। অথচ উত্তর আমেরিকার এই ভূমি দখল করে রেখেছে প্রায় পাঁচশো বছর ধরে। নামেমাত্র তাদের ‘ফার্স্ট নেশন’ নাম দিয়ে নিজেরাই দেশের অধিকর্তা। কালোদের মতো অত্যাচারে জর্জরিত এখান আদিবাসী জনগোষ্ঠি। অভিবাসন এসবের একটি নতুন দিক, যোগ্য মানুষগুলো নিজেই এই ফাঁদে পা ফেলে। ঠিক যেমন আট ঘন্টা কাজ বরাদ্দ করে দেওয়ার জন্য পথে নেমে সেই অধিকার অর্জন করল ঠিকই, কিন্তু এরপর শ্রমিকরা নিজের গরজেই অতিরিক্ত উপার্জনের আশায় ওভারটাইম করে আজকাল, এই ঘটনাটিও তেমনটা। দরিদ্র দেশগুলো যেন অভিবাসনের জন্যে কৃতী ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করে। তাই এই সুযোগে নিজেদের ধন্য মনে করে সেইসব কৃতী সন্তান গোষ্ঠিদল। অধুনা দাসত্বনীতির বেড়িতে কৃতিত্বের রক্তক্ষরণে সহাস্যে পট্টি বাঁধছে।

(চলবে)      

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here