Sujan Chakroborty
জয়ন্ত মণ্ডল

গত মঙ্গলবার নিউটাউনের মিলনমেলা প্রাঙ্গণে ‘আহারে বাংলা’ উৎসবের বাইরে বিক্ষোভ দেখিয়ে ‘মার’ খাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন সিপিএমের বিধায়ক ডা. সুজন চক্রবর্তী। তিনি রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রীও বটে। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের বামফ্রন্টের শাসনকাল পুরোমাত্রায় ‘উপভোগ’ করার পর বর্তমানে বিরোধী আসনে বসা সিপিএম এখন স্বাভাবিক ভাবেই ‘বিপ্লবে’ ফিরে এসেছে। কিন্তু বিপ্লবী সুজনবাবুদের দেখে অনেকেরই কম-বেশি পড়া অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য হ্যাপি প্রিন্স’ গল্পটার কথা মনে পড়ে যায়।

সুখী রাজপুত্র যখন বহাল তবিয়তে বেঁচে ছিলেন তখন রাজপ্রাসাদের বাইরে ঘটে চলা কোনো ঘটনাই তাঁকে বিচলিত করেনি। সঙ্গীদের সঙ্গে তিনি মেতে থাকতেন আনন্দ-স্ফূর্তিতেই। কিন্তু মৃত্যুর পর ধাতবনির্মিত হৃদয় তাঁকে কান্নায় ডুবিয়ে দেয়। নিজের জড় শরীরের একের পর এক অংশ গরিব-দু‌ঃখীদের বিলিয়ে দিয়ে সেই সিসার তৈরি হৃদয়ও এক দিন বিস্ফারিত হয়। তবে হ্যাঁ, সুজনবাবুরা মোটেই অবিকল হ্যাপি প্রিন্স নন, সে কথা কোনো অতিবাম-নিন্দুকও দাবি করতে পারবেন না। তাঁরাও যখন ক্ষমতায় ছিলেন গরিবের জন্য অংসখ্য হিতকর কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁদের আমলে ‘আহারে বাংলা’র মতো কোনো উৎসবের আয়োজন না হলেও অনাহারে শবর মৃত্যুর নজির অস্বীকার করার নয়। সেই ঘটনার পর ৬-৭ বছর তাঁরাও ক্ষমতায় ছিলেন। এমন কী করেছিলেন ওই না খেতে পাওয়া মানুষের জন্য?

একগুচ্ছ সরকারি প্রকল্পের মোড়কে উত্তর দেবেন তাঁরা। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা হয়েছিল তার হদিশ দিতে পারবেন কি? পারলে হয়তো ১৪ বছর পর শবরদের মরতে হয় না আর সুজনবাবুদেরও ‘মার’ খেতে হয় না।

তাকানো যাক পিছন ফিরে। যে ক’জন ২০০৪ সালেও একই ভাবে জঙ্গল মহলে অনাহারে মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই  শবর। পুরোনো সংবাদ মাধ্যমের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, এই সময় আট জন এবং ২০০৫ সালে এক জনের মৃত্যুর পর এই একই অভিযোগ তোলা হয়। ২০০৪ সালে মারা যান সমায় শবর (৫৩), মঙ্গলী শবর (৩০), নাথু শবর (৫৫-৬০) ও শম্ভু শবর (৫০)। ২০০৪ সালের পর, কোকিলা শবরও (প্রায় ৫০) একই কারণে (‘অনাহারে’) মারা যান বলে তাঁর পুত্রবধূর দাবি, তবে সংবাদ মাধ্যমে তা নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়নি। ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ (২৩ আগস্ট ২০০৬) অবশ্য ২০০৪-এর ৮ জুন ও ২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সংস্করণে আর এক জনের— পার্বতী শবর (৩০)-এর ‘অনাহার মৃত্যু’র খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

তখনও কিন্তু মিডিয়া বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ‘অনাহার’-এর প্রসঙ্গ তুললেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং পিঁপড়ের ডিম খাওয়ার বাস্তব চিত্রকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতে ছাড়তেন না। এখনও একই ভাবে সেই অনাহারতত্ত্ব সামনে তুলে ধরছেন সুজনবাবুরা। কিন্তু সেটাও ঠিক খাপে খাপ হচ্ছে না। আর যা-ই হোক, রেশনে ২ টাকা কেজির চাল-গমকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। তবে সচেনতনতার অভাববোধে সরকারি উদ্যোগের খামতি যে স্পষ্ট, সেটাও স্বীকার্য। সে‌টা কী রকম, পড়ুন নীচের লিঙ্কগুলি ক্লিক করে-

১. চিকিৎসার অভাব নাকি জীবনযাত্রা, লোধা-শবরদের অকালমৃত্যুতে উঠছে প্রশ্ন
২. লালগড়ে শবর-মৃত্যু: লোধা উন্নয়ন সেলকে কার্যকরী করা হোক, উঠছে দাবি
৩. লালগড়ে ৭ শবরের অকাল মৃত্যু নিয়ে চাপান-উতোর অব্যাহত

সব মিলিয়ে সিপিএম যদি ২০০৪ আর ২০১৮-র ঘটনাকে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপতে যায়, সেটা তো কোনো দিশা দেখাতে অসফলই হওয়ার কথা। ‘আহারে বাংলা’ উৎসবে বিক্ষোভ দেখাতে যাওয়া সুজনবাবুরা দাবি করেছেন, শবররা যখন অনাহারে, সরকার মেতেছে আহারে উৎসবে। মুখে তাঁরা যতই এ কথা জোরের সঙ্গে বলুন, আদতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁরা সমস্যাদীর্ণ শবরদের জন্য নয়, সিপিএমকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে ‘মার’ খেলেন। কারণ, তা না হলে গুটিকয় কর্মীকে নিয়ে ওই বিক্ষোভের আয়োজন না করে শবরমৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহৎ জনমত গড়ে তুলে ওই উৎসবকে বয়কটের নজির গড়তে পারতেন।

কাজটা বড়োই কঠিন! কর্মী দিয়ে বিক্ষোভ হয়, জনমত গড়ার জন্য যে জনগণের প্রয়োজন!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here