sayantani-adhikariসায়ন্তনী অধিকারী :

সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশিকায় জানিয়েছে যে, সিনেমা হলে চলচ্চিত্র শুরুর আগে বাধ্যতামূলক ভাবে জাতীয় সঙ্গীত চালাতে হবে এবং উপস্থিত দর্শককে উঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে এই রায়ের মধ্যে সমস্যা কোথায়? প্রেক্ষাগৃহ, যা কিনা বানিজ্যিক স্থান, সেখানে বাধ্যতামূলক জাতীয় সঙ্গীত বাজানো আইনগত ভাবে সমস্যাজনক তো বটেই, কিন্তু আরও গুরুতর সমস্যা হল এই রায়টির অসাংবিধানিক চরিত্র। তা ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল যে, এই আদেশ আসলে ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ কিনা। এই রায় বেরোনোর পরেই বিতর্ক শুরু হয় এই মর্মে যে, এই ভাবে আমরা উগ্র জাতীয়তাবাদ, যা কিনা বহুমতের বিরোধী, এবং, বিতর্কের প্রয়োজনীয়তাকে খারিজ করে দিতে চায়, তাকেই উস্কে দিচ্ছি কিনা। প্রশ্ন ওঠে যে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ এই সুযোগে আরও তৎপর হয়ে উঠে অন্য মতের পরিসরকে আক্রমণ করবে কিনা। এবং অচিরেই দেখা যায় যে, এই আশঙ্কা সত্যি হয়ে উঠেছে। হিন্দুত্ববাদী দলগুলি যে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটাচ্ছে দেশ জুড়ে, যেখানে দেশপ্রেমের নামে প্রকৃতপক্ষে অন্য দেশ/জাতি/ধর্মবিদ্বেষ বৃদ্ধি করা হচ্ছে, সেই জাতীয়তাবাদের নামেই চেন্নাইতে জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন উঠে না দাঁড়ানোয় আট জন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। দক্ষিণ ভারতের অন্যত্র থেকে একই কারণে ২০ জনকে গ্রেফতারও করা হয়।

তাৎপর্য পূর্ণ বিষয়টি হল, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং এই উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন, অথচ তাঁরই রচিত সংগীতকে এই মুহূর্তে এই দেশে জাতীয়তাবাদের নামে উগ্র হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে লাগানো হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার অপব্যবহার করে। একটি ওয়েবসাইটের একটি লেখায় তাই সন্দীপ রায় নামক এক লেখক ব্যঙ্গ করে বলেছেন, যে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে সমকালীন ভারতে তাঁকে দেশদ্রোহী বলে গ্রেফতার করা হত। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব লেখা পড়লে এই বক্তব্যকে সমর্থন করতেই হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘ন্যাশানালিজম ইন ইন্ডিয়া’ নামক প্রবন্ধটির কথা ধরা যাক। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ খুব পরিষ্কার ভাবে ভারতের বিভিন্নতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যে এই পরিমণ্ডলে পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো মতেই  লাভজনক হবে না। তিনি লিখেছেন, পৃথিবীতে একটাই ইতিহাস আছে, মানবজাতির ইতিহাস। এবং, তাই সমস্ত জাতীয়তাবাদের ইতিহাস হল একটি বৃহৎ সমগ্রের ক্ষুদ্র খণ্ড মাত্র। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদের উপরে তিনি মানবতা এবং মানবজাতির ঐক্যকেই স্থান দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে এ দেশে এই ‘আন্তর্জাতিকতা’ স্থান ক্রমশই সঙ্কুচিত হচ্ছে।  রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধে বলেছেন :

“ভারতবর্ষের চিরদিনই একমাত্র চেষ্টা দেখিতেছি প্রভেদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করিয়া দেওয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয়রূপে অন্তরতররূপে উপলব্ধি করা — বাহিরে যে-সকল পার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাহাকে নষ্ট না করিয়া তাহার ভিতরকার নিগূঢ় যোগকে অধিকার করা।”

কিন্তু এখনকার পরিস্থিতিতে তাঁর এই উপলব্ধি ব্যর্থ হচ্ছে বলেই মনে হয়, যখন ঐক্য স্থাপনের নামে একটি বিশেষ শ্রেণি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর চিন্তাধারা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিশেষত যাঁরা বিভিন্ন ভাবে সংখ্যালঘু তাঁদের উপর। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে, রাষ্ট্র নিয়ে গর্বের মূলে রয়েছে অন্যের প্রতি বিরোধিতা। এই ধরনের রাষ্ট্রগৌরবেরই বাড়াবাড়ি দেখা যাচ্ছে আজকের ভারতে। ওই একই প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন :

“ভারতবর্ষ বিসদৃশকেও সম্বন্ধবন্ধনে বাঁধিবার চেষ্টা করিয়াছে। যেখানে যথার্থ পার্থক্য আছে সেখানে সেই পার্থক্যকে যথাযোগ্য স্থানে বিন্যস্ত করিয়া, সংযত করিয়া, তবে তাহাকে ঐক্যদান করা সম্ভব। সকলেই এক হইল বলিয়া আইন করিলেই এক হয় না। যাহারা এক হইবার নহে তাহাদের মধ্যে সম্বন্ধস্থাপনের উপায়–তাহাদিগকে পৃথক অধিকারের মধ্যে বিভক্ত করিয়া দেওয়া। পৃথককে বলপূর্বক এক করিলে তাহারা একদিন বলপূর্বক বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়, সেই বিচ্ছেদের সময় প্রলয় ঘটে।”

বলা বাহুল্য, এই ধরনের লেখা সমকালীন ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার বিচারে লেখা হলে, রবীন্দ্রনাথের উপর দেশদ্রোহের অভিযোগ ওঠা খুব অসম্ভব ছিল না। কিন্তু, উগ্র জাতীয়তাবোধের মোহ ছেড়ে বেরিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে যে, দূরদর্শী কবির আশঙ্কাই এই মুহূর্তে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবল ভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। যা পৃথক বা ভিন্ন, তাকে বল প্রয়োগ করে একীভূত করার যে প্রচেষ্টা প্রবল ভাবে ব্যক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি, শ্রেণি বা সরকারের কাজের মাধ্যমে, তার ফলাফল যে শুভকর হবে না তা বলাই বাহুল্য। তাই শুধু জাতীয় সঙ্গীত নয়, বল প্রয়োগের দ্বারা এক ধরনের নেতিবাচক ‘দেশপ্রেম’মূলক আইন চাপিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়।  

 

ঋণ স্বীকার :

https://nypost.com/2016/12/13/12-people-arrested-in-india-for-not-standing-during-national-anthem/

https://qz.com/850182/in-todays-india-even-rabindranath-tagore-the-writer-of-its-national-anthem-would-be-labeled-a-seditious-anti-national/

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- Nationalism in India.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- ভারতবর্ষের ইতিহাস

(লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here