buddhadeb bhattacharjee and goutam dev
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং গৌতম দেব। প্রতীকী ছবি
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

সামনে লোকসভা ভোট। তার আগেই বামফ্রন্টের ব্রিগেডে ‘জনসমুদ্র’ দেখে ফেলেছে বাংলা। কিন্তু বাম-ব্রিগেডের জন-ঢেউ ভোটকক্ষে পৌঁছাতে না পারার নজির রয়েছে সাম্প্রতিক অতীতেও। তার উপর ভাবিয়ে তুলছে সিপিএমের দুই জীবিত ‘কিং’বদন্তি দেব- বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং গৌতম দেবের প্রায় ‘অকেজো’ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও।

২০১১-য় রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলের হাল যাঁর হাতেই থাকুক, অনেকের কাছে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত ‘মার্কস’ হিসেবে পরিচিত বুদ্ধদেব এবং গৌতমবাবুই ছিলেন মূল আকর্ষণের কেন্দ্রে। এ কথা ঠিক, মার্কসবাদকে টেনে-হিঁচড়ে বাংলার মাটি-বাতাসে মিশিয়ে দিতে অগুন্তি সর্বহারার কারিগরের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু বাংলা থেকে ক্ষমতা যাওয়ার পর দলের তরফে ঠিক যাঁদের সামনের সারিতে তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা হয়েছিল, এই দুই দেবের ছায়ার কাছে তাঁরা হার স্বীকার করেছেন। এখন সূর্য-সুজন বা নিদেনপক্ষে শতরূপদের নিয়ে কোনো রকমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চললেও সেই দু-জনের শূন্যস্থান তো পিছু তাড়া করেই চলেছে। বাকিরা কতকটা ‘হ্যাপি প্রিন্স’ হলেও রিয়াল ক্রাউড পুলার তাঁরাই। যে কারণে মঞ্চে না উঠলেও এক অসুস্থ দেবকে যখন গাড়িতে করে ব্রিগেডে নিয়ে আসতে হচ্ছে, তেমন আর এক অসুস্থ দেবকে ব্রিগেডের দিন কয়েক বাদে ফেসবুক লাইভে বসাতে হচ্ছে। যা দেখে যথেষ্ট উজ্জীবিত এবং বিস্ফারিত শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত সিপিএম সমর্থকরা। কিন্তু ভোটে জেতা যদি শেষ কথা হিসাবে না-ধরাও হয়, তা হলেও সমাজের প্রত্যন্ত সীমার মানুষকে কি আর আগের আয়তনে ফেরাতে পারবে সিপিএম?

৭৭-এ ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই এই শিক্ষিত-মধ্যবিত্তদের একটা অংশ কমিউনিস্ট রাজনীতি আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে হাতিয়ার করে জনমনকে ঝোলায় পুরে ফেলার কাজটা চালিয়ে গিয়েছেন। শিক্ষিত-মধ্যবিত্তের এই অংশের মানুষের মনে একটা সূত্র বরাবরই কাজ করে – কষ্ট করলে কেষ্ট মিলবে, সেটা দেরিতে হলেও। সে কেষ্ট মিলেওছিল। কিন্তু ‘কেষ্ট’ বগলে পুরে কমিউনিস্ট বিষ্টুদের একাংশের লাগামছাড়া ‘দুষ্টুমি’ তো আর দীর্ঘদিন সহনীয় নয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ওই অংশের বিষ্টুদের লাগামছাড়া দুর্নীতি সরকারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেঁধিয়ে গিয়েছিল। সেখানে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করার কোনো স্কোপ রইল না। রাজনীতি যখন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী অংশের কাছে মনুষ্যত্বহীন হয় এবং শুধু ক্ষমতা আগলে রাখার লিপ্সা মন-মননে চড়ে বসে, তখন রাজনীতির এথিকস সটান উবে যায়।

… নিজস্ব একটা সিস্টেম তৈরি করে সাধারণ মানুষের বুক-মাথার উপর দিয়ে রোলার চালানোর সুবন্দোবস্ত করে গিয়েছে শাসকরূপী সিপিএম। তাদের উত্তরসূরি শাসক দল কাঁচা হাতে সেগুলোকেই কবজা করতে চেয়েছে মাত্র।

বিরোধীদের কাছে সিপিএম মানেই মরিচঝাঁপি, বিজন সেতু, নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুরের সাদাকালো অথবা রঙিন ছবি। কিন্তু এ রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের সু-কাজের তালিকাও দীর্ঘায়িত। যা ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয়েছিল ভূমিহীনকে জমির পাট্টা দেওয়ার মাধ্যমে। কৃষিক্ষেত্রের নবজাগরণে। কিন্তু পরে সেই কাজের মূল্যায়ন আটকে পড়েছে ভূমিহীনকে পাট্টা দিয়ে মিছিল-মিটিংয়ে নিয়ে যাওয়া আর দলের পঞ্চায়েত সদস্যকে সেই জমিতে চাষের কাজে ব্যবহৃত সারের লাইসেন্স দেওয়ার জটিল ধাঁধাতেই।

সরকারি চাকরি হোক বা শিক্ষক নিয়োগ, চাপা লেনদেন দেদারে পরিণত হলে সে তো প্রকাশ্যে আসবেই। যে মানুষ সাম্যবাদের ‘সা’ বোঝে না, তাঁকে তোল্লা দিয়ে ব্রাঞ্চ কমিটির নেতা আর বিনিময়ে তাঁকে অবৈধ প্রমোটিংয়ের বৈধ ছাড়পত্র দেওয়ার ঘটনা স্মৃতি হাতড়ালেই সামনে চলে আসতে পারে। আবার ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এমনও বলতে শোনা গিয়েছিল, এ বার বোঝা গেল- সর্বহারার মুখোশ পরে কত কত ‘সর্বহরা’ কমিউনিস্ট পার্টিতে করেকম্মে খাচ্ছিল। তারা অবশ্য এখনও খাচ্ছে। জার্সি বদল হয়েছে মাত্র।

বাদ পড়েনি স্কুল-কলেজেও। সংগঠনের নেটওয়ার্ক বাড়াতে পড়ুয়াদের রাজনৈতিক শ্রমিক বানানোর কারিগর তো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কমিউনিস্টরাই। এখনকার মতো ডোলের রাজনীতি না করলেও অদৃশ্য আদর্শের মোহের নাগপাশে স্কুল-কলেজ কী ভাবে হয়ে উঠল রাজনৈতিক শ্রমিক তৈরির কারখানা! পড়ুয়া জীবনের অন্তে হাতে কাজ জুটুক না জুটুক- ভ্রুক্ষেপ নেই সে দিকে। মোট কথা নিজস্ব একটা সিস্টেম তৈরি করে সাধারণ মানুষের বুক-মাথার উপর দিয়ে রোলার চালানোর সুবন্দোবস্ত করে গিয়েছে শাসকরূপী সিপিএম। তাদের উত্তরসূরি শাসক দল কাঁচা হাতে সেগুলোকেই কবজা করতে চেয়েছে মাত্র।

কয়েকটা দশক পরে বামপন্থার প্রচারিত ‘বাদ’-এর আকর্ষণ আবছা হলেও উতরে গিয়েছে। এখনও গিলছে। সাধারণ মানুষের আজীবনের স্বপ্ন – ‘দুর্দশা ঘুচবে’।

দেববাবুরা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, শুধুমাত্র গবিবি-মুক্তির মতবাদ পড়িয়ে এত কাল শাঁসে-জলে থাকা যায়? ‘ভোট মেশিনারি’ শব্দবন্ধ তো তাঁদের দয়াতেই মিলেছিল। অতিবড়ো বাম-বিরোধীও বলতে পারবেন না, গোড়ার দিকে এই হাতিয়ারের সাহায্য নিতে হতো। কারণ, গোড়ার দিকে যা হয়েছে, তার পুরোটাই ছিল স্বত‌ঃস্ফূর্ত, আবেগচালিত। কিন্তু বাদবাকি উপন্যাসের মতোই। পাতায় পাতায় বিস্তার। চরিত্র উদ্ঘাটন, অন্তিমে হয় মিলনান্ত নয় বিয়োগান্ত। বড়ো অংশের মানুষ গ্রোগ্রাসে গিলেছে।

কয়েকটা দশক পরে বামপন্থার প্রচারিত ‘বাদ’-এর আকর্ষণ আবছা হলেও উতরে গিয়েছে। এখনও গিলছে। সাধারণ মানুষের আজীবনের স্বপ্ন – ‘দুর্দশা ঘুচবে’। সেটা হতে পারে মার্কসবাদে-লেনিনবাদে অথবা তাদের বাদ দিয়েই অন্য কোনো ‘বাদ’-এ। এখন প্রাচীন না হলেও সে রকমই কোনো ‘বাদ’-এ বিশ্বাসী মানুষ। কিন্তু সিপিএমের ‘বাদ’গুলো বাদ পড়েছে সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষের কাছে। ফেরানোর মতো জুৎসই মুখের অভাব। ঘুরে-ফিরে আসে সেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত মার্কসদের কথাই। আপাতত তাঁদের পদধ্বনি শোনার অপেক্ষায় রয়েছে ভবিষ্যৎ!

পাশাপাশি গতানুগতিক ভাবেই চলছে আনুষঙ্গিক প্রশ্নমালার উত্তর খোঁজার কাজ। এত বড়ো একটা ‘বাদ’-কে কেন সর্বহারা অধ্যুষিত বাংলার বৃহত্তর অংশ ঝেড়ে ফেলল, এত বড়ো একটা বাদ আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত, উপযোগিতা দীর্ঘায়িত করার টোটকা কী, ইত্যাদি। বর্তমান সরকারের ভুলভ্রান্তি খোঁজার কাজ তো চলছেই, ঠান্ডা মাথায় মার্কসবাদী এবং তাঁদের প্রতি বিশ্বাসীদের ভবিষ্যৎ খোঁজাটাও সমীচীন বলেই মনে করে সময়। জগতের জন্যই তত্ত্বকথা। যার জগৎ ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে, তার মুখে তত্ত্বকথার কপচানি সাধারণ মানুষের গা-পিত্তিতে জ্বলন ধরায় বই-কি! এই তত্ত্ব দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে থাক বা না-থাক!


[ আরও পড়ুন: জেলবন্দি কাঞ্চনের মৃত্যু জাগিয়ে দিল অনেক প্রশ্ন ]

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here