saibal-biswasশৈবাল বিশ্বাস :

কিছুদিন আগেই ব্রিটেনের রাজনীতিতে তোলপাড় হয়ে গেল। ব্রেক্সিট। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা আর চলবে না কারণ ব্রিটেন আর অভিবাসীদের কোনো অধিকার দিতে চায় না। নির্বাচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প গলা ফাটিয়ে বলে গিয়েছেন, তাঁর প্রধান কাজ হবে মেক্সিকো থেকে আসা উদ্বাস্তুদের তাড়ানো। মেক্সিকো সীমান্ত বরাবর তিনি পাঁচিল তুলবেন। এমনকি অন্য‌ান্য‌ দেশ থেকে আসা অভিবাসীরাও পাততাড়ি গুটোন, শ্য‌ামচাচার দেশে আপনারা অবাঞ্ছিত অতিথি। মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের আন সান সু চির সরকার বলে দিয়েছে, আপনাদের কোনো অধিকার থাকতে পারে না। আপনারা মায়ানমারের কেউ না, বাংলাদেশ থেকে আসা অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশকারী।

এই যখন গোটা বিশ্বের অবস্থা তখন আমরাই বা পিছিয়ে যাই কেন, আমরা ভারতবাসীরা অতিথি দেব ভবো বলে যতই আত্মপ্রসাদ অনুভব করি, মনে মনে কিন্তু বেশ ভালো করেই জানি জাতীয়তাবাদের উগ্র বুলি আঁকড়ে না ধরলে পপুলার বা জনমোহিনী রাজনীতিতে সাফল্য‌ পাওয়া খুবই কঠিন। বিশেষ করে বিজেপি-সহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলি খুব ভালো করেই এ কথা জানে। তাই অত্য‌ন্ত সঙ্গত ভাবেই আমরাও অতিথিদের তাড়াব। না তাড়ালে আমাদের জাতীয়তাবাদকে চ্য‌াম্পিয়ন করব কী ভাবে?

অল্প কিছু দিন আগের কথা। মুম্বইয়ের বিভিন্ন মিডিয়া খবর প্রচার করল রাতের অন্ধকারে শাহরুখ খান নাকি মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার প্রধান রাজ ঠাকরের সঙ্গে দেখা করেছেন। আসলে তাঁর ‘রাইস’ ছবিটি আগামী জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়ার কথা। সেই ছবি আদৌ মহারাষ্ট্রে চলবে কিনা সেটা নির্ভর করছে রাজ ঠাকরের মর্জির ওপর। ছবিতে অভিনয় করেছেন মাহিরা খান নামে এক পাক অভিনেত্রী। তিনি অন্য‌তম প্রধান চরিত্রে আছেন, তাঁর চরিত্র বাদ দিয়ে ছবিটি রিলিজ করা সম্ভব নয়। এ দিকে আবার নবনির্মাণ সেনা জানিয়ে দিয়েছে, পাক অভিনেতা-অভিনেত্রী ছবিতে থাকলে সে ছবি রিলিজ করতে দেওয়া হবে না। শাহরুখ খান নিশ্চিত ভাবেই বুঝিয়েসুজিয়ে রাজি করাতেই গিয়েছিলেন। ছবিটা হয়তো রিলিজ হবে কিন্তু তাঁর প্রধান অভিনেত্রী মাহিরা সে সময় কিছুতেই এ দেশে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। তার কারণ গত ১৮ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের উরিতে পাক জঙ্গি হানার জেরে ১৮ জন সেনা জওয়ান মারা যাওয়ার ঘটনার পর মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা-সহ একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পাক শিল্পী (তা সে অভিনেতাই হন বা গায়ক) ভারত ছাড়ো। তারই জেরে ৭ জন পাক শিল্পী ও গায়ককে অচিরে ভারত ছেড়ে এক রকম রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান পালিয়ে যেতে হয়।

এদের মধ্য‌ে মাহিরার মতোই রয়েছেন ফাওয়াদ খান। তিনি ছিলেন করণ জোহরের ‘আয় দিল হ্য‌ায় মুশকিল’ ছবির অন্য‌তম প্রধান অভিনেতা। রাজ ঠাকরের পায়ে ধরে কোনো রকমে ছবিটি মুক্তির ব্য‌বস্থা করতে পেরেছিলেন করণ। কিন্তু তাঁকে দাসখত লিখে দিতে হয়েছিল আর কখনো পাকিস্তানের কাউকে ছবিতে জায়গা দেবেন না। শুধু তা-ই নয়, ভুলের খেসারত হিসাবে তাঁকে সেনা কল্য‌াণ তহবিলে এক কোটি টাকাও জমা দিতে হয়েছে। রাজ ঠাকরের দলের চিত্রপট সেনার সভাপতি আমে খোপকারের নির্দেশমাফিক তাঁদের ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্য‌ে ভারত ত্য‌াগ করতে বলা হয়। বলা বাহুল্য‌, নির্দেশ মেনে ফাওয়াদ মুম্বই ছেড়ে দেশে ফিরে গিয়েছেন।

দেশে ফিরে যেতে হয়েছে ‘তেরে বিন লাদেন’, ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহন’, আলিয়া ভাট অভিনীত ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ ছবির অন্য‌তম অভিনেতা আলি জাফরকেও। ফিরে গিয়েছেন ‘সনম তেরি কসম’ ছবির অভিনেত্রী মাওরা হোকানে।

নিরন্তর হুমকির মুখে প্রযোজক সংস্থা দি ইন্ডিয়ান মোশন পিকচার্স প্রডিউসার্স অ্য‌াসোসিয়েশনের সভাপতি টি পি আগরওয়াল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো প্রযোজক আর পাকিস্তানি শিল্পীদের নিয়ে ছবি করবেন না। এর পর আর কার ঘাড়ে কটা মাথা যে পাকিস্তানি অতিথি-শিল্পীদের তোয়াজ করে রেখে দেয়।

শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই নন, বিভিন্ন সংগঠনের ফতোয়ার জেরে স্বনামধন্য‌ অতিথি-গায়কদেরও এ দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। প্রখ্য‌াত সুফি গায়ক রাহাত ফতে আলি খানের অনুষ্ঠান ছিল গত নভেম্বর মাসে নয়ডায়। তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এই অনুষ্ঠান হওয়া সম্ভব নয়। তিনি ফিরে যেতে বাধ্য‌ হন। গোটা ভারতে যাঁর অসংখ্য‌ গুণমুগ্ধ ভক্ত রয়েছে সেই আতিফ আসলামের অনুষ্ঠান ছিল গত ১৫ অক্টোবর গুড়গাঁওতে। অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল কনসেপ্ট এন্টারটেনমেন্ট নামে একটি সংস্থা। তাদের ওপর নিরন্তর হুমকি আসতে থাকে। অখিল ভারতীয় হিন্দু ক্রান্তি দল নামে একটি সংগঠনের নেতারা গুড়গাঁওয়ের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার টি এল সত্য‌প্রকাশের সঙ্গে দেখা করে বলে আসেন, এই অনুষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে সত্য‌প্রকাশ কনসেপ্ট এন্টারটেনমেন্টের সঙ্গে কথা বলে অনুষ্ঠান বাতিল করাতে বাধ্য‌ হন।

অতি পরিচিত ধ্রুপদী গায়ক সফকত আমানত আলির একটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল বেঙ্গালুরুতে। এ বার বজরঙ দলই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? অনুষ্ঠানের আয়োজক রেডিও মির্চিকে তারা জানিয়ে দেয় এই অনুষ্ঠান করা যাবে না। বজরঙ দলের কর্ণাটক ইউনিটের সভাপতি সূর্যনারায়ণের সাংবাদিক সম্মেলনের পর উদ্য‌োক্তারা আর এগোতে সাহস পাননি।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং জঙ্গি সংগঠনের কীর্তির দায়ভার ঘাড়ে নিয়ে অতিথিদের এক রকম দুর দুর করেই তাড়িয়ে দেওয়া হল। যাঁরা এ দেশ ছেড়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে চলে গেলেন তাঁরা বুঝলেন, উগ্র জাতীয়তাবাদের কোনো দেশকাল হয় না। ১৯৩৬-এর জার্মানি আর ২০১৬-র ভারত এ ক্ষেত্রে একই মুদ্রার এ-পিঠ ও-পিঠ।

পাকিস্তানও ছেড়ে কথা বলবে কেন? শিল্পীরা ভারত ছাড়ার পরেই পাকিস্তান ইলেকট্রনিক মিডিয়া রেগুলেটরি অথরিটি গত ১ অক্টোবর জানিয়ে দিয়েছে, কোনো এমএসও এ বার থেকে আর ভারতীয় টিভি চ্য‌ানেল সম্প্রচার করতে পারবে না। বলিউডের ছবির ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন সে দেশের প্রদর্শকরা। করাচির বিখ্য‌াত প্রদর্শক মান্দিওয়ালা এন্টারটেনমেন্টের মালিক নাদিম মান্দিওয়ালা বলেছেন, পাক সেনাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতেই তাঁরা ভারতীয় ছবির প্রদর্শন বন্ধ করে দিচ্ছেন। অবশ্য‌ বুঝতে বাকি থাকে না এটা এক ধরনের টিট ফর ট্য‌াট নীতি।

সেটা ১৯৯৭ সাল। কিছু দিন পরেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যাবে কলকাতা বইমেলা। তার কিছু দিন আগে বইমেলা উদ্বোধন করে রবীন্দ্র সদনে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন প্রখ্য‌াত মণীষা জাঁক দেরিদা। তাঁর বলার বিষয় ছিল হসপিটালিটি বা আতিথেয়তা। দেরিদা বলেছিলেন, আতিথেয়তা শব্দটা নতুন বিশ্বে আমরা ভুলে যেতে বসেছি। এ এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা। এক দিকে বিশ্বায়ন, অন্য‌ দিকে বিশ্বজনীন মানবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা — এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা হবে কী করে? দেরিদার সেই প্রশ্নের উত্তর আজও আমরা খুঁজে চলেছি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here