farukhফারুক ভূঁইয়া রবিন

১ জুলাই ২০১৬। মুসলমানদের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে সবশেষ শুক্রবার। সারা বাংলাদেশের মানুষ ঈদ উৎসব নিয়ে নানা পরিকল্পনায় মত্ত। কিন্তু আচমকা গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ঘটল নজিরবিহীন জঙ্গি হামলা — তা-ও খোদ রাজধানীর অভিজাতপাড়া গুলশানে। সেই হোলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গিদের অবিশ্বাস্যরকম ভয়ানক হামলায় প্রাণ হারান ২ পুলিশ ও ১৭ বিদেশি নাগরিক-সহ ২২ জন।  

আর এর ৬ দিনের মাথায় ৭ জুলাই দুঃস্বপ্নকেও হার মানানোর মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে। বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জমায়েত হিসেবে বিবেচিত শোলাকিয়া ময়দানের কাছে জঙ্গিদের আরেক ভয়াল হানা। এবার ওদের আক্রমণে প্রাণ হারাতে হল ২ পুলিশ সদস্য ও ১ নারীকে। গুলশানে জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উৎসব ঈদুল ফিতরের আগের মুহূর্তে দেশ জুড়ে যে বিষাদের কালো মেঘ দানা বেঁধেছিল, শোলাকিয়ায় হামলার মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত মাত্রায় ঘনীভূত হয়। কারণ এমন নিদারুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা বাংলাদেশের মানুষ চিন্তার পরিসীমার মধ্যেও কখনো আনতে পারেনি।

কিন্তু এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনও আরেক শুক্রবার। মুসলমানদের আরেক অন্যতম পবিত্র উৎসব পবিত্র ঈদুল আযহার পর এটি প্রথম শুক্রবার। গত ঈদের আগে শেষ শুক্রবার আর এবারের ঈদের পরের শেষ শুক্রবার — মাঝখানে পেরিয়ে গেছে কাঁটায় কাঁটায় আড়াই মাস। কিন্তু এই মধ্যবর্তী সময় বদলে দিয়েছে অনেক কিছুই। আর হ্যাঁ! সেটি অবশ্যই ইতিবাচক বদল।

রোজার ঈদের আগের মুহূর্তে যেখানে ধর্মীয় উৎসবে ভয়ের অনেক উপাদান যুক্ত করেছিল, এবার সেখানে সব ভয় জয় করে মানুষ তার চিরায়ত উদযাপনের পথেই ফিরে গেছে। সব শঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে মানুষ মজেছে আনন্দ-উৎসবে। ধর্মীয় উৎসবগুলোকে ঘিরে বাংলাদেশে যে চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন চেহারার দেখা মেলে, এবারের ঈদেও তার কোনো ব্যত্যয় হয়নি।

বরং এবারের ঈদে ছিল বিরূপ আবহাওয়া, ঈদের সকালে দেশ জুড়েই অঝোর ধারায় বৃষ্টি — কিন্তু তাতেও মানুষের উৎসবে ছিল না কোনো খামতি। সারা দেশেই নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে ঈদ উদযাপিত হয়েছে। যা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের কড়া বার্তা।

গত ঈদের পর বাংলাদেশ ও তার নাগরিকদের অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়েছিল। নাগরিকদের মধ্যে যেমন আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনি নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।

কিন্তু বাঙালি হার মানতে জানে না। অতীতের নানা প্রতিকূলতা পেরোনোর মতো এবারও বাংলাদেশের মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশ জুড়েই মানুষ সোচ্চার হয়েছে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, সবখানেই সমান তালে আওয়াজ উঠেছে মানবতার হন্তারকদের বিরুদ্ধে। মানববন্ধন-সভা-সেমিনার-সমাবেশে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ওঠেছে জোরালো স্লোগান। ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ — জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের প্রত্যয় জানানো থেকে বাদ যায়নি কেউই। সেই আওয়াজে শামিল হয়েছেন ধর্মগুরুরাও। ধর্মের নামে জঙ্গি তৎপরতাকে খারিজ করে দিয়ে তাঁরা শুনিয়েছেন ধর্মের শান্তির বার্তা।

অর্থাৎ আঘাত আসার পর গত দুই-আড়াই মাসে শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ-বয়স নির্বিশেষে কেউই জঙ্গিবিরোধী অবস্থানে নিশ্চুপ থাকেনি। সকলের সাফ কথা, জঙ্গিবাদের কোনো স্থান হবে না এই বাংলার মাটিতে। আর শিকড়শুদ্ধ জঙ্গিদের উপড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে আইনশৃংখলা বাহিনী। গত দুই-আড়াই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরই মধ্যে ঢাকার কল্যাণপুর ও আজিমপুর এবং নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানে গুলশান-শোলাকিয়ার হামলার নেপথ্য কুশীলব ও নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ নিহত হয়েছে। এখনও যে সব জঙ্গি ধরা পড়েনি, তাদের হন্যে হয়ে খোঁজা হচ্ছে।   

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের এমন স্বতঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসার প্রতিফলনই হল গুলশান-শোলাকিয়া হামলার মাস দুয়েকের ব্যবধানে স্বস্তি ও আনন্দঘন পরিবেশে আরেক ঈদ উদযাপন। তবে এবারের ঈদে আশঙ্কাজনক হারে মুসল্লির সংখ্যা কমে গেছে শোলাকিয়া ঈদের ময়দানে। সাধারণত কোরবানির ঈদের জামাতে শোলাকিয়ায় মানুষের সংখ্যা রোজার ঈদের তুলনায় কমই হয়। তবে তুলনামূলক কম হলেও সংখ্যার হিসেবে সেটা লাখ তিনেকের মতো হয়ে থাকে। এক সময় সোয়া লাখ মানুষের অংশগ্রহণে ঈদের জামাতের জন্য শোলাকিয়া নামে পরিচিত এই ময়দানে হাল আমলে রোজার ঈদে অংশ নিয়ে থাকেন লাখ চারেক মানুষ। কিন্তু এবারের ঈদে শোলাকিয়ায় ঈদের ময়দানে মাত্র কয়েক হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছে।

তবে শোলাকিয়ায় মুসল্লির সংখ্যা পড়তির জন্য আসলে বৈরি আবহাওয়া নাকি গত ঈদের জঙ্গি হামলা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, তা তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। আবার হতে পারে দুটোরই সংমিশ্রণ। তবে জঙ্গি হামলার শঙ্কা নয়, বরং বৈরি আবহাওয়াকেই শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে লোকজন কম হওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অধিকাংশ মানুষ। কারণ বিখ্যাত শোলাকিয়া ময়দানে যাঁরা অংশ নেন, তাঁরা সিংহভাগই সেখানে যান দূরদূরান্তের জেলা থেকে। কিন্তু এবারের ঈদে বৃষ্টির কারণে নিজেদের ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেই মানুষকে অনেক ধকল সইতে হয়েছে।

ঈদের জামাতে শোলাকিয়ায় যাওয়ার ব্যাপারে জঙ্গিরা সত্যিই মানুষকে ভীত করে তুলতে পেরেছে কিনা, তার পরিষ্কার জবাব পেতে অপেক্ষা করতে হবে অনুকূল আবহাওয়ার এক ঈদের জন্য। তবে সকলেরই বিশ্বাস, মানুষ এ হামলাকে ধর্তব্যের মধ্য নেবে না এবং শোলাকিয়ায় জমায়েত থেকেও পিছু হটবে না। এবার ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে ব্যতিক্রম হলেও আগামীতে ঠিকই শোলাকিয়ায় নামবে লাখ লাখ মানুষের ঢল।   

তবে সব ছাপিয়ে এবারের ঈদে যে বিষয়টি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ তা হল, মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই জঙ্গিবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের মানুষ ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। শঙ্কার কালো মেঘ কেটে মানুষের মনে উদয় হয়েছে আশার আলো। উদ্বেগ ছাড়িয়ে মানুষ ঈদ উদযাপন করেছে স্বস্তি ভরে। কোনো কিছু ব্যত্যয় ঘটাতে পারেনি মানুষের আনন্দময় উৎসব আমেজ। আর এই সম্প্রীতির ধারাই চিরায়ত বাংলাদেশের আসল রূপ। যার সঙ্গে জঙ্গিবাদ বড় বেমানান।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here