behind the bars
nilanjan-mandal
নীলাঞ্জন মণ্ডল

মুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। সাধারণ এক জন মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রের স্নেহস্পর্শে ২০০৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় ছিল একজন ভয়ংকর ‘সন্ত্রাসবাদী’। তিনি নাকি ২০০২ সালে অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, যিনি নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।

শুধু উনি নন, ওঁর সঙ্গে পোটা (প্রিভেনশন অব টেরোরিস্ট অ্যাক্টিভিটিজ আইন) আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন আরও পাঁচ জনমুফতি আবদুল কায়ুম মনসুরি, আদম সুলেইমান আজমিরি এবং চাঁদ খান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হনমহম্মদ সেলিম হানিফ শেখের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় আবদুল্লা এবং আলতাফ মালিকের যথাক্রমে দশ বছর ও পাঁচ বছর কারাদণ্ড হয়।

অক্ষরধাম মন্দিরে আক্রমণের ঘটনা নিশ্চয় আপনাদের স্মরণে আছে। ২০০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঘটনাটি ঘটে দুজন ফিদায়েঁগুলি চালিয়ে ৩৩ জনকে হত্যা করেন এবং ৮৬ জন জখম হন

১৬ মে, ২০১৪। লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হল। ওই দিনই গুজরাতের সবরমতি কারাগারে সকাল থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন মুফতিসহ ছয় জন। কারণ ওই দিন সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের মামলার রায় ঘোষণা হবে। বিকালবেলা রায়ের খবর পেলেন তাঁরা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক এবং বিচারপতি ভি গোপালগৌড়ার বেঞ্চ অক্ষরধাম মামলায় অভিযুক্ত ছজনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে তাঁদের মুক্তির আদেশ দেন কারও বিরুদ্ধে পোটা প্রয়োগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজনতৎকালীন গুজরাত সরকারের অনুমোদন প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে মন্তব্য করেন, ‘clear non-application of mind’। ২০০২ থেকে ২০১৪এর মে, এই সময়কালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী

মুক্তিলাভ করার পর মুফতি আবদুল কাইয়ুম তার দীর্ঘ এগারো বছরের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গুজরাতি ভাষায় একটি বই লিখেছেনবইটির নাম, ‘গ্যারা সাল সালাখো কে পিছে বইটি ইংরিজি, হিন্দি এবং উর্দুতে অনুবাদও হয়েছে বইটির ইংরাজি সংস্করণের নাম, ‘Eleven Years Behind the Bar’। বইটির প্রকাশক জমিয়ত উলেমা অমদাবাদ/জমিয়ত উলেমা মহারাষ্ট্র।

11 years behind the barsবইটি পড়তে পড়তে শিউরে উঠতে হয়। কী ভাবে নিরপরাধ মানুষকে সন্ত্রাসবাদীবানিয়ে দেওয়া হয় তার ধারাবিবরণী বইটিতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ পুলিশের মধ্যে কী পরিমাণে বিদ্যমান তাও আমরা জানতে পারব বইটি থেকে।

মুফতির লেখা অনুযায়ী, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। মুফতির কথায়, “আমি বাড়ির সবাইকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম। কে ভেবেছিল যে সে বিদায় দু’চার দিনের জন্য না হয়ে দীর্ঘ এগারো বছরের জন্য হবে।”

বইটি থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০৩এর ১৭ আগস্ট থেকে মুফতিকে, ৬ আগস্ট থেকে আলতাফ মালিককে, ৯ আগস্ট থেকে আদম সুলেইমান আজমিরিকে, ১ আগস্ট থেকে সেলিম হানিফ শেখকে এবং ১৭ আগস্ট থেকে মৌলানা আবদুল্লাকে ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক রাখা হয় এবং নারকীয় অত্যাচার চালানো হয়। পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে পিটিয়ে যাওয়া, যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, পায়ুতে পেট্রল ইঞ্জেকশন দেওয়া কোনো রকম অত্যাচারই বাদ যায়নি। তাঁদের ধর্ম নিয়েও খুব আপত্তিকর কথাবার্তা বলা হত ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে থাকাকালীন।

মুফতি লিখছেন, “১৯ আগস্ট ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার বানজারার ঘরে আমার ডাক পড়ল। যথারীতি চোখ বেঁধে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের বাঁধন খুলতে দেখি সেখানে আদমভাই, মৌলবি আবদুল্লা, আবদুল রহমান পানারা, মুনাফ রেডিয়েটর, নাসির দোমান প্রমুখ উপস্থিত। এঁরা সবাই আমার মহল্লার এবং আমার ভালো বন্ধু।পরে জানতে পারি আমার মতোই তাঁদেরও তুলে আনা হয়েছে এবং বেআইনি ভাবে তাঁদের ক্রাইম ব্রাঞ্চের হেফাজতে আটক রাখা হয়েছে এবং অক্ষরধাম মন্দির হামলায় কোনো না কোনো ভূমিকায় তাঁদের যুক্ত করা হয়েছে।”

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, যে ক্রাইম ব্রাঞ্চের দফতরে তাঁকে চোখ বেঁধে রাখা হত। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরের দিন বানজারার সামনে তাঁকে হাজির করা হয়। বানজারার নির্দেশে পুলিশের বিশেষ লেঠেলবাহিনী মুফতিকে মারতে শুরু করে। লেঠেলবাহিনীর পুলিশ খুবই হিংস্র প্রকৃতির। তাদের চেহারা স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা মেরেই চলে যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়। এই বাহিনী ক্লান্ত হয়ে পড়লে বানজারা মার শুরু করে। বানজারা মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আরেক অফিসার ভানর মার শুরু করে। এই ভাবে চলতে থাকে। এই রকম ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে তাঁরা যখন ভেঙে পড়েন এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের কথামতো কাজ করতে রাজি হন, তখন তাঁদেরই পছন্দমতো ভূমিকা বেছে নিতে বলা হয়। অর্থাৎ অক্ষরধাম মন্দিরে হামলায় কার কী ভূমিকা হবে সেটা তাঁদেরই ঠিক করতে বলা হয়। কাউকে কাউকে আবার অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা, গোধরাকাণ্ড, এবং হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলার মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)

বিমানে মুফতিকে শ্রীনগরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে বলা হয় সেখানে গিয়ে চাঁদ খান নামে একজনকে শনাক্ত করতে হবে, যাঁকে তিনি কোনো দিন দেখেনি। এ সমস্ত কিছুই ঘটছে হেফাজতে বেআইনি ভাবে আটক থাকা অবস্থাতেই। উনি লিখছেন যে এ ছাড়া ওঁর আর কোনো উপায় ছিল না।

অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার ঘটনার তদন্ত শুরু করে গুজরাতের এটিএস (অ্যান্টি টেরোরিস্ট স্কোয়াড)। ২০০৩এর ২৮ আগস্ট তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তরিত হয় ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডি জি বানজারা ঘোষণা করেন, তিনি অক্ষরধাম মন্দিরে হামলার তদন্তের সমাধান করে ফেলেছেন। সব কিছু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে ২৯ আগস্ট মুফতিসহ অন্যদের গ্রেফতার দেখানো হয় এবং ৩০ আগস্ট এঁদের ম্যাজিস্ট্রেট এস এস ওঝার এজলাসে হাজির করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ক্রাইম ব্রাঞ্চের দাবিমতো পনেরো দিনের হেফাজতের দাবি মঞ্জুর করেন।

মুফতির বইটি থেকে আমরা জানতে পারছি, ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানিয়েছিল যে তারা আক্রমণকারী দুই ফিদায়ের পকেট থেকে উর্দুতে লেখা দুটি চিঠি উদ্ধারকরেছে এবং চিঠি দু’টি থেকে তারা ষড়যন্ত্রের বিষয় অনেক কিছু জানতে পেরেছে। মুফতিকে দুটি উর্দু চিঠি দিয়ে তা ওঁর হাতের লেখায় নকল করতে বলা হয়। বারংবার তাঁকে দিয়ে ওই চিঠি দুটি নকল করানো হয়। আদালতে চিঠি দুটি মুফতির বিরুদ্ধে প্রমাণ রূপে পেশ করা হয়। যদিও আদালতে শেষ পর্যন্ত তা নাকচ হয়ে যায়।

তাঁকে যখন বেআইনি ভাবে পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখা হয়েছিল তখন তাঁর পরিবারের লোকেরা হেবিয়াস কর্পাস করতে পারতেন, কিন্তু করেননি। কারণস্বরূপ তিনি লিখেছেন যে বেশ কয়েক জনের পরিবারের তরফ থেকে হেবিয়াস কর্পাস করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ তাঁদের গোধরা কাণ্ড, হারিণ পাণ্ড্য হত্যা মামলা প্রভৃতি কোনো না কোনো একটা মামলায় যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।

হেফাজতে অত্যাচার করে স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে মামলা সাজানো হয়েছিল এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট তাদের রায়ে বলে, “the story of prosecution crumbles at every juncture” (সরকারপক্ষের মামলাটি প্রতিটি সন্ধিস্থলে ভেঙে পড়ছে)। তারা আরও বলে, “The confessional statements cannot be relied upon and the case of the prosecution fails. Accordingly, we hold there is no independent evidence on record to prove guilt of the accused beyond reasonable doubt in the face of retractions and grave allegations of torture and violation of human rights the accused have made against police,”

মুফতিসহ ছজন নির্দোষ প্রমাণিত হলেন কিন্তু তাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া ১১টা বছর কে ফিরিয়ে দেবে? প্রসঙ্গত জানাই আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মুফতি মামলা করেছিলেন আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দিয়েছেনকারণ “The law in India does not have any rules to asses damages to people who suffer false imprisonment.” যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে The Innocence Project নামে একটি প্রকল্প আছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here