এ স্বাদের ভাগ হয় না

0
529
পাপিয়া মিত্র

এ কী অপূর্ব স্বাদ দিলে বিধাতা আমায়! টকজলে ভেসে বেড়ানো ধনেপাতার কুচি, পুদিনার গন্ধ, পাতিলেবু আর গন্ধরাজ লেবুর আদর। ধনেগুঁড়ো, এলাচগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো আর স্বাদমতো বিটনুন – একবারে জমিয়ে দিলাম আমার রূপের বাহার। আমি হলাম তোমার মানে একান্তভাবেই তোমার আদরের ফুচু। আমি সেই চিরকালীন ভার্জিন আহ্লাদি।

‘তুমি যদি ফুচকা হতে, আমি হতাম তেঁতুলজল – এই রকম স্লোগান উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে হামেশাই শোনা যেত। সে ছিল আমাদের সময়। তখন এত ঠান্ডা ঘরের খাবার আসেনি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধের মুখ পর্যন্ত সেই ঝাঁকা বা কাচের বাক্সই যথেষ্ট ছিল। আজ, এই মুহূর্তে, এই গরমের দুপুরে মনটা কেমন হুহু করে উঠল। কী করি, কী পড়ি, কী লিখি – এমনটাই যখন ভাবছি তখন মনে পড়ে গেল ফুচুকে। আমার মায়ের খাওয়ার শেষে হাতের ফাউকে। আমার কিশোরীবেলার সহপাঠীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার রসদকে। আমার প্রথম কবিতা প্রকাশের দিন যে আমাকে অভিবাদন জানিয়ে ছিল তাকে। প্রথম বান্ধবীর বিয়ের আনন্দে, আমার ‘মা’ হওয়ার সোহাগে যে সব সময় আমাকে সাহস জুগিয়েছিল সেই ফুচু ওরফে ফুচকাকে সম্মান জানানোর আজ মোক্ষম দিন। ফেলে আসা দিনের কথা মনে করে ওকে ডেকে নিলাম মনে মনে।

আমাদের পাঁচ জনের গ্রুপ্রে সুস্মিতার আগে বিয়ে হয়। বিয়ের খবর চাউর হতেই আমাদের উল্লাসের শেষ নেই। এই উল্লাস অবশ্য আমার বিয়ের পরে আমার বর ও তার বন্ধুদের মধ্যে দেখেছিলাম। ব্যাপারটা বেশ মজার। বউ নিয়ে আমার বর বেড়াতে যাচ্ছে, তাতে থাকছে বরের বন্ধুরাও। কিন্তু আমাদের একমাত্র মাসিমা বুঝতে পেরে সকলের সামনে যাচ্ছেতাই করে বললেন, “তোদের লজ্জা করে না? ও বিয়ে করে বউ নিয়ে ঘুরছে আর তোরা দেখছিস? তোরা বিয়েটা করবি কবে?” এক চোট হাসির পরে সে দিন ঘোষপার্কের ফুচকার ঝুড়ি বেশখানিক ফাঁকা হয়েছিল। অবশ্যই মাসিমা সঙ্গী ছিলেন। যা বলছিলাম, সুস্মিতার বিয়ের আগে তো হইচই করে দিন কেটে গেল। ঠিক হল অষ্টমঙ্গলার পরের রবিবার আমাদের আক্রমণ। আমরা চার বন্ধু সকাল থেকে হাজির, বন্ধুবর আমাদের নানা কথায় জেরবার। খুব কাছেই সিনেমা হল অনন্যা, সিনেমা হলের সামনে আমাদের দাপাদাপি। কলেজ-উত্তীর্ণ আমরা কী বেয়াদপ ছিলাম। সেই সন্ধেটা আজও ভুলতে পারিনি। ফুচকাওলার কানে কানে এক বান্ধবী কী যে বলল, আমরা মুখ চাওয়াচায়ি করলাম। অনন্যা সিনেমা হলের সামনে বিখ্যাত রথীনদার ফুচকা। বন্ধুবরকে সঙ্গী করে আমরা মোট ছ’জনা ঘিরে দাঁড়ালাম।

খুব মন দিয়ে দেখতে থাকলাম। ডেকচিতে সেদ্ধ আলুর গায়ে একে একে পড়তে লাগল সেদ্ধ মটরদানা, সামান্য পাকা তেঁতুল, পাতিলেবু, গন্ধরাজ লেবুর রস, কুচিকুচি কাটা ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, লবণ আর বিটনুন। ঝাঁপিয়ে পড়ল লাল-সবুজ লঙ্কার টুকরো। জিরে-ধনে-মৌরি-জোয়ান-এলাচগুঁড়ো ও লঙ্কাগুঁড়ো। এ বার সেই রথীনদার হাতের কায়দায় সেই মিশ্রণ এক্কেবারে মসলিন জামদানি হয়ে উঠল। মটরগুলি তাতে শোভা পেল যেন ফুলতোলা কাজ। শালপাতা হাতে এল। রথীনদার ছন্দময় হাত ঘুরে চলেছে। একটু পরে শুরু হল শত্রু-আক্রমণ। একটা আলাদা মাখা ছিল বন্ধুবরের জন্য। সে বেচারি হেঁচকি তুলে, কান-মাথা-চোখ এক হাত দিয়ে ঝাকিয়ে রগড়িয়ে অস্থির কাণ্ড। গৌরবরণ রূপে যেন সুজ্জ্যিদেবের বিদায়বেলা। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে আমরা তো রথীনদার দেওয়া উপহার চেটেচুষেকামড়েখাবলে একেবারে যেন উপাখ্যানমালা উপভোগ করছি। কিন্তু এক জন বুঝতে পেরেই সুস্মিতার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল।

আরও পড়ুন: “কে রে ?”

সেই দিনটা ছিল এমন এক ভয়ংকর গরমের দিন। কিছু খেতে ভালো লাগছে না। ঘেমেনেয়ে এক শা। ভাত মুখে তুলতে গিয়ে গা গুলিয়ে উঠল। আমি শাশুড়িমাকে পাইনি। শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে খেতে বসি। অভিজ্ঞতা ভুল বলেনি। খেতে খেতে বললেন, বৌমা বিকেলে ফুচকাওলা গেলে ডেকো, আমি খাওয়াব। ‘মা’ হতে যাওয়ার উপহার। বিয়ে হয়ে খিদিরপুরের বাড়িতে এসে প্রথম দেখলাম আমার শ্বশুরমশাই দিব্যি ছেলে-বৌমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুচকা খান। আবার এ-ও বিধান দিতেন, মাঝে মাঝে পেট পরিষ্কার রাখতে ফুচকার গুণ অসীম। তবে আমাদের বকুলতলার রাজুভাইয়া আমার ছেলেকে বেশ শাসন করে ছিল এক দিন। ‘এত কাচালঙ্কা খেও না বাবু’।

কলকাতার ফুচকা, দিল্লির গোলগাপ্পা আর মুম্বইয়ের পানিপুরিই হোক, বস্তুত যে তেঁতুলজলে তিনি অবগাহন করেন তার স্বাদ অনবদ্য। তবে হলফ করে বলতে পারি কলকাতার ফুচকার কাছে সব ফ্যাকাশে। কলেজে এক টাকায় ৬টা বা ৮টা ফুচকা পেলেও কয়েক বছর আগে ধর্মতলায় যখন টাকায় একটা ফুচকা, তা শুনে চমকে উঠেছিলাম। কিন্তু অমোঘ টান থেকে মুখ সরাতে পারিনি। আর এখন তো দশ টাকায় ৪টে কিংবা ৬টা। ফুচকার খাদ্যগুণ আছে বলেই তো সে দিন রাতের দিকে দেখলাম গৌরী সিনেমার সামনে পরিচিত এক ডাক্তারবাবু টপাটপ মুখে দিচ্ছেন। কেমন সে খাদ্যগুণ? ফুচকা আর আলুতে কারবোহাইড্রেট, ফুচকা ভাজতে তেল (ফ্যাট), লঙ্কা, ধনেপাতা, পুদিনাপাতায় সবজির গুণাবলি, তেঁতুলজল আর লেবুর রসে ভিটামিন সি, আর মটর বা কাবলি ছোলায় প্রোটিন। অতএব ফুচকা কমপ্লিট ফুড, ব্যালান্সড ফুড। তাই ফুচকা জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনেই রইল।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here