পাপিয়া মিত্র

কাজের দিনে নানা কাজে, থাকি নানা লোকের মাঝে, আজ আমি যে বসে আছি তোমারি আশ্বাসে। মেঘের পরে মেঘ জমেছে আঁধার করে আসে। এই শ্রাবণে এই মুহূর্তে সেই রুপোলি শস্যের আশায় মন বেঁধেছে জগাখুড়ো। বিড়িতে একটান দিয়ে আকাশ দেখে।

গতকাল বিকেল শেষ হয়েছিল নিবিড় ধারাপাতে। বাদল মেঘে যখন আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল তখনও আশপাশের মানুষগুলোর হাতে শতেক কাজ। বাড়ির পাশের ঝোপ থেকে ব্যাঙগুলো আগেভাগে ডাকতে শুরু করে দিল। তার মাঝে আবহাওয়ার রাঙা চোখ কয়েক দিনের ভারী বর্ষার খবর জানাচ্ছে। শ্রাবণ মাস, বাবা তারকনাথের মাস, বৃষ্টি তো হবেই। টিনের চালে টপটপাটপ, ফটফটাফট বেড়েই চলল। এর সুন্দর ছন্দ আছে, আছে একটা ধারা, তা বিলক্ষণ জানে খুড়ো। এমন কত দিনে মালমশলা না পড়া কেমন সুগন্ধি খিচুড়ি রেঁধে গরম গরম মুখের কাছে ধরে দিত খুড়ি। তাও বছর ১৬ হল সে নেই, তাই সেই অমৃতও নেই। মশলা বলতে ওই সামান্য একটু পাঁচফোড়ন, শুকনো খোলায় গরম করে শিলে বেটে নিয়ে খিচুড়ির ওপর ছড়িয়ে দেওয়া। তাই-ই অমৃত, ঘি তো মহার্ঘ।

জগাখুড়ো ছিল শ্রাবণমেঘের খেয়াতরির মাঝি। জগবন্ধু ঘোড়ুই এই খেয়াঘাটের ডাকসাইটে মাঝি। শ্রাবণমাসভর গঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দিত নিজের ডিঙিটা। সারা দিন শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির গান শুনত আর শেষ-বিকেলে ডিঙি নিয়ে গঙ্গায় পাড়ি। ঠিক আর পাঁচ জন যেমন রাস্তাঘাটে সান্ধ্যভ্রমণে যান আর কী!

ওরে ও হরেন, বলি চোখের মাথা খেয়েচ নাকি, ইলিশখানা ধরতি পারচোনি। ঠিক এই কথাগুলো কানে ধেয়ে এল। আসলে এই উঠোন ঘিরে বারো ঘরের বাস। এক দেওয়াল, মাথায় টিনের চাল। সব শোনা যায়। জগাখুড়োর ঘরখানা একবারে গঙ্গার ধার ঘেঁষে। বড়ো সাধ জাগে এক বার ইলিশ দেখি। কিন্তু কথা কানে এলেও কোথায় ইলিশ?

‘জলের উজ্জ্বল শস্য, রাশি-রাশি ইলিশের শব,/নদীর নিবিড়তম উল্লাসে মৃত্যুর পাহাড়।/তারপর কলকাতার বিবর্ণ সকাল ঘরে-ঘরে/ইলিশ ভাজার গন্ধ; কেরানী গিন্নির ভাঁড়ার/সরস সর্ষের ঝাঁজে। এলো বর্ষা, ইলিশ উৎসব।’

বুদ্ধদেব বসুর এই কবিতায় মন গলবে না আজ। ঝিঁঝিঁর একটানা কলরব কেমন গা ছমছমে আবহ তৈরি করেছে। খুড়ো একটা সুখটান দিয়ে গঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। অমাবস্যার ঘাটে, কেবল জলের শব্দ। বাজারে ইলিশ তেমন কোথায়? আষাঢ়ে তেমন বৃষ্টি না হলেও শ্রাবণের শুরু নেহাত মন্দ ভাবে হয়নি। এই ধারার সঙ্গে খিচুড়ির যে অনুষঙ্গ তার ঠিকানা মিলবে কোথায়?

শরীরে তখন মত্ত জোয়ার। একাসঙ্গী হাল বেয়ে বেয়ে চষে বেড়ানো নদীময়। এক ঋতু যায়, এক ঋতু আসে। কখনও কখনও ঘরে না ফেরার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল ঘরনি। নাম-না-জানা ঘাটে ডিঙি বেঁধে সেখানের হাটে-বাজারে টাটকা ইলিশ বেচে রাত কাটিয়েছে নিজের বাহনে। এমনই কত হাট-বাজার, রাস্তার ফুটপাথ জগাখুড়োর বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। সেই ইলিশ নিয়ে নেহাত কম জ্ঞান নেই খুড়োর। এ আর বইয়ের পাতা পড়ে নয়, জীবনের অভিজ্ঞতা।

কেমন যেন শুনতে লাগে ইলিশরা ভ্রমণপ্রিয় জাত বললে। টানের উলটো দিকে তারা একটানা মাইলের পর মাইল সাঁতার কেটে যায়। নোনা সমুদ্রপথে ঝাঁক বেঁধে ভেসে যাওয়ার সময় এরা খাওয়াদাওয়া প্রায় কিছুই করে না। ফলে তখন চেহারাটাও বেশ খারাপ হতে থাকে। তার পর মিষ্টি জলের নদীতে পড়ার পরে তারা শ্যাওলা জাতীয় খাবারদাবার খেতে শুরু করে। তখন ওদের শরীর-স্বাস্থ্য তাগড় হয়। শরীরে তেল ও চর্বি জমতে থাকে। স্বাদও বাড়তে থাকে হু হু করে। এই কারণে সমুদ্রে বা মোহনার মুখে ধরা পড়া ইলিশের স্বাদের চেয়ে, ভরা নদীতে জালে ধরা পড়া ইলিশের স্বাদ আরও সরেস। এখানেই খুড়োর জয়।

সে বার ইলিশের ঝুড়ি নিয়ে খুড়ো ডিঙি থেকে নামতেই পাড়েই সব বিকিয়ে গেল। ইলিশ চিনত বটে খুড়ো। বুঝত ভালো। ডিম হওয়ার আগের মেয়ে মাছ বেছে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ভোঁতা মাথা আর ধারালো পেট দেখে  যদি কেনা যায়, তবে ইলিশটির স্বাদ সম্বন্ধে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হওয়া যেতে পারে। হাঁটুজল ভেঙে সেই ইলিশ কিনতে যে কেউ দৌড়োবে। সেই রত্নকে ঘরনি যত্ন করে ভাপা, পাতুরি, দই-ইলিশ, ইলিশের টক, কচুর লতি দিয়ে ঘন্ট, আনারস দিয়ে চাটনি, নিদেন পক্ষে ভাজা। আহা, কত সুখ দিয়েছে এই জগাখুড়ো।

খুড়ো, ও খুড়ো যেওনি, এই ভরা কোটালের গাঙে একাটি অমন করে যেওনি… কথার ঝুড়ি ঘাটে রইল পড়ে। খুড়োর ডিঙি এক আকাশ বাদলা নিয়ে ভেসে চলল।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here