three monkeys image

সমরজিৎ মিত্র

হ্যাঁ, মহাশয়, আমি কমলাকান্ত চক্রবর্তীর সাক্ষাৎ লাভ করিয়াছি। চমকাইবেন না। আমি মাঝেমাঝেই সাক্ষাৎপ্রার্থী হইয়া তাঁহার নিকট গমন করি। বেশ বুঝিতে পারিতেছি, আপনাদের ভ্রূ কুঞ্চিত হইতেছে। মুখমণ্ডলে অবিশ্বাসের ছায়া পড়িয়াছে। আপনারা আমার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দিহান হইতেছেন। না মহাশয়, আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ। পাঠকবৃন্দকে পূর্বেও স্মরণ করাইয়া দিয়াছি, এক্ষণে আবার বলিতেছি, ইঁহারা অজর, অমর। ইঁহাদের মৃত্যু নাই। আপনি, আমি, আমরা সবাই কাল কবলিত হইব, যেমন আপনার আমার পূর্বপুরুষগণ হইয়াছেন, কিন্তু কমলাকান্ত চক্রবর্তীরা টিকিয়া থাকিবেন। সৃষ্টিকর্তা বঙ্কিমবাবু কমলাকান্তকে অমরত্বের বর প্রদান করিয়াছেন। তাহারই কৃপায় কমলাকান্ত কালকে অতিক্রম করিয়া আজ বিরাজমান রহিয়াছেন। বিশ্বাস হইল কি? বিশ্বাস হইলে মঙ্গল। না হইলেও ক্ষতি নাই। তাহাতে কমলাকান্তের কিছু আসে যাইবে না।

যাহা হউক, আসল কথায় আসি। প্রতিবেশীর বাড়িতে বিবাহোৎসব। বেশ কয়েক দিন যাবৎ সমারোহ চলিতেছে। সমারোহ বলিতে দিবানিশি বাদ্যনিনাদ এবং সুরলহরি লাউডস্পিকার দ্বারা দিগ্‌বিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছে। আমি বলিতে গেলে তাহাদের একেবারে দ্বার-পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী। তাহারই পীড়নে নিদ্রাদেবীও আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছেন। ফলত আমার কান ভোঁ ভোঁ, মাথা ঝন ঝন, বুক দুর দুর, পেট গুড় গুড় এবং গা ঢিস ঢিস করিতেছে। সকালে গৃহিণী চায়ের বদলে এক পাত্র চিরতার জল আগাইয়া দিলেন। তাহা পান করিয়া আবার শয়নের উদ্যোগ করিতে তিনি আমার বৃদ্ধের মতো আচরণের নিন্দা করিলেন এবং বাহিরে একটু পায়চারি করিবার পরামর্শ দিলেন। বৃদ্ধরা হয়তো জানেন, বৃদ্ধকে বৃদ্ধ বলার মতো বড়ো গালি আর নাই। তাই গৃহিণীর মুখের বৃদ্ধ শব্দটি আমাকে বড়োই পীড়া দিল। তবে বৃদ্ধ নয়, বৃদ্ধের মতো বলিয়াছেন, এই ভাবিয়া আমি সান্ত্বনা পাইলাম। এবং যুবাবৎ তড়াক করিয়া লম্ফ দিয়া বিছানা হইতে নামিয়া বাহিরে যাইবার জন্য ঝটিতি প্রস্তুত হইলাম। এইরূপ পরিস্থিতিতে কমলাকান্ত চক্রবর্তীর কথা অগ্রে মনে পড়ে। আমার গৃহ হইতে কিয়দ্দূরে কমলাকান্তের আবাসস্থল। কিছুটা ভ্রমণ করিলে হয়তো শরীরের সুরাহা হইবে, এইরূপ চিন্তা করিয়া আমি অগ্রবর্তী হইলাম। তদুপরি কমলাকান্তের সান্নিধ্যলাভের সম্ভাবনা তো আছেই। উহাও শরীর ও সর্বোপরি মনেরও পীড়ার পক্ষে ফলদায়ক হইতে পারে।

কমলাকান্তের জীর্ণ আবাসের সম্মুখে উপনীত হইয়া দেখিলাম, দ্বার রুদ্ধ। বাহির হইতে দ্বারে করাঘাত করিলাম। কিয়ৎকাল পরে ভিতর হইতে উত্তর আসিল – এই ভগ্ন গৃহে সকলে স্বাগত। অতএব আসিতে আজ্ঞা হউক। দ্বার ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম আসনোপরি কমলাকান্ত উপবিষ্ট রহিয়াছেন। তিনি আমাকে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন, কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ দেখিতেছি। ইহা কি গৃহিণীর তাড়নায় না কি অন্যবিধ কারণ আছে? কারণসমূহের বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তিনি বলিলেন, একের আনন্দ অপরের নিরানন্দের কারণ হয়। রামের বনবাসে কৈকেয়ীর আনন্দ হইলেও তাহাই আবার কৌশল্যার দুঃখের কারণ। দ্রৌপদীর অবমাননা কৌরবদিগের স্ফূর্তির বিষয় কিন্তু পাণ্ডুপুত্রদের পক্ষে তা ছিল অত্যন্ত ক্লেশদায়ক। আমি বলিলাম, শব্দব্রহ্ম আমরা শুনিয়াছি। এখন শব্দদানবের সহিত পরিচিত হইতেছি। আপনি প্রাচীন। ইহাতে যে দূষণ সৃষ্টি হইতেছে, তা হয়তো অবগত নহেন। ইহাকে এখন শব্দদূষণ বলে। ইহার ফলে মানুষ শ্রবণশক্তি হারাইতেছে। পক্ষীকুল বিপদাপন্ন হইতেছে। আরও – আমাকে থামাইয়া দিয়া কমলাকান্ত বলিলেন, প্রাচীন চক্ষু নবীনের কাণ্ড সর্বদাই প্রত্যক্ষ করিতেছে। আমিও ভুক্তভোগী বই-কি! নতুন বছরের সূচনায় তোমাদের কী এক তন্ত্রের দিনে স্কুলে স্কুলে নাচগান, প্রভাতফেরি, জয়ধ্বনি, জয়ঢাক, বিউগল ইত্যাদি নানা রকমের আয়োজন করা হইয়াছিল। সেই আয়োজনের ধাক্কায় প্রসন্নময়ীর গাভীটি দড়ি ছিঁড়িয়াছিল। সে তিন দিবস নিরুদ্দিষ্ট ছিল। ফলত গোয়ালিনী আমাকে তিন দিবস দুধ জোগায় নাই। বাজারের ঠোঙার দুধে তেমন মৌতাত জমে না। প্রসন্নের দুধকে যতই দুগ্ধমিশ্রিত জল বলিয়া ঠাট্টা করি, তাহাতেই মৌতাত জমে ভালো। মার্জারীরও তাহাই পছন্দ। আর আজকাল মনে হইতেছে কানে কম শুনিতেছি। তোমরা বলিবে ইহা বয়সের দোষ। আমি বলিব, ইহা শব্দ দৌরাত্ম্যের ফল হইতে পারে। আমি বলিলাম, আপনি সঠিক বলিয়াছেন। এ ছাড়া আছে বায়ুদূষণ, দৃশ্যদূষণ। চারিদিকে গাছ কাটার হিড়িক পড়িয়া গিয়াছে। ফাঁকা জায়গায় কলকারখানার পত্তন হইতেছে। তাহারা গলগল করিয়া ধুঁয়া ছাড়িতেছে। ফলে মানুষ শ্বাসকষ্টে ভুগিতেছে। কমলাকান্ত কহিলেন, আমিও আজকাল অল্পে হাঁপাইয়া পড়ি। নসিবাবুর বৈঠকখানায় যাইতে হইলে এখন আমাকে মাঝপথে জিরাইয়া লইতে হয়। পূর্বে ইহা ছিল না।

আমি বলিলাম, আর চারিদিকে যে সব দৃশ্য দেখি, তাহা না দেখিতে পাইলেই ভালো হইত। আপনি ইহা ভালো বুঝিতে পারিবেন। আপনাদের মতো বয়স্ক ব্যক্তিদের পক্ষে –। কমলাকান্ত আমার মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া বলিলেন, অস্বস্তিকর বলিতেছ? শুন বৎস্য, কত কুদৃশ্য দেখিতেছি, কত কুবাক্য শুনিতেছি, আমি এখন সব মানাইয়া লইয়াছি। কিছু দিন পূর্বে একদল ছোকরা আমার গৃহে চড়াও হইয়াছিল। তাহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, এই বুড়া তোর রঙ কী? আমি বলিলাম, দেখিতে পাইতেছ না আমার গাত্রবর্ণ গৌর? তবে যত্নাভাবে ইহা একটু চাপিয়া গিয়াছে। তাহারা পিঠে চাপড় কষাইয়া বলিল, সে বন্ন নয়। আমি তখন বলিলাম, আমি বিপ্রবর্ণ, পৈতা তাহার প্রমাণ। তাহারা আবার কয়েক ঘা চাপড় দিয়া বলিল, সে বন্নও নয়। আমরা জিজ্ঞাসা করছি, তুই সবুজ, গেরুয়া না লাল? আমি উত্তর করিলাম, হরিদ্রাবর্ণ। এখন চোখে সর্বদা সরিষা ফুল দেখিতেছি। তাই ওই হলুদ বর্ণকেই সার বলিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহা শুনিয়া তাহারা বলিল, ওরে, বুড়া আমাদের সঙ্গে মজাকি করছে। আয় একে আমরা পাতলা করে ক্যা—। এই শব্দটি উচ্চারণ করিতে আমার রুচিতে বাধে। তবে উচ্চারণ করিতে না পারিলেও এই সব শব্দে আমি অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি। তবে প্রশ্ন তুলিতে পারো, কু আর সু’র বিচার করিবে কে? আমার বিচার যাহা বলে তাহা হইল, যাহা আমার বিচারবুদ্ধিকে আহত করে তাহাই কু। আর ইহার বিপরীতে অবস্থান করিতেছে সু। তবে বলিতে পারো, ইহা আপেক্ষিক। কু দৃশ্যের ক্ষেত্রে একই কথা।

কমলাকান্ত বলিলেন, তোমাকে একটি বৃত্তান্ত শোনাই। প্রসন্ন গোয়ালিনী কত কাল ধরিয়া আমাকে এবং আরও অনেককে দুধের জোগান দিয়া যাইতেছে। সে তো প্রাচীনাই। এখন সে অন্য কাজ জুটাইয়াছে। সে একটি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের রান্না করে। আরও কিছু কিছু কাজ সে করিয়া থাকে। ফলত তাহার অবস্থা এখন ফিরিয়াছে। সে এখন পায়ে চটি পরিয়া ফট ফট শব্দে হাঁটে। সর্বদা সুরভিত জর্দা সহযোগে পান চিবায়। কোমরে শাড়ির খাঁজে রুমাল ঝোলে। কপালে ছোটো টিপ। তাহাকে দেখিয়া আধুনিকা বলিয়াই ধারণা জন্মাইবে। সে দিন সুসজ্জিতা গোয়ালিনী চোখে কালো চশমা পরিয়া ফট ফট শব্দ সহযোগে আসিয়া আমার গৃহে প্রবেশ করিল। আমার সম্মুখে ঝনাৎ করিয়া তাহার চাবির গোছা ফেলিয়া দিয়া বলিল, খুড়ামহাশয় আমি আসিতেছি। চাবির গোছখান তোমার জিম্মায় রহিল। দেখিও, হারাইয়া ফেলিও না। আমি মাগীকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কোথায় যাইতেছিস? সে কহিল, শহরে বায়স্কোপ দেখিতে। দেবের ছবি। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, শুধু দেব? দেবী নাই? সে বলিল, আছে। রুক্মিণী। রুক্মিণী অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রধানা মহিষী। প্রসন্নের দেবদেবীর প্রতি মতি হইয়াছে ভাবিয়া প্রীত হইলাম। পরে অবশ্য শুনিয়াছি, এ দেব দেবী সে দেব দেবী নহে। যাহা হউক, এ দেব দেবীর পালা প্রসন্ন কালো চশমা পরিয়া দেখিয়াছে কিনা জানি না। ইহার মাধ্যমে হয়তো ছবি পরিশ্রুত হইয়া উপস্থিত হয়। রৌদ্রের তেজ যেমন স্তিমিত হইয়া ধরা দেয়। এই বৃত্তান্ত এখানেই শেষ করিব। যাহা বুঝার বুঝিয়া লও। শুধু এক্ষণে উপদেশ, কু বাক্য বলিবে না, কু কথা শুনিবে না, কু দৃশ্য দেখিবে না। কী উপায়ে? মুখ বুজিয়া থাকিবে, কানে তুলা দিবে এবং চোখও বুজিয়া থাকিবে। তবে ঠুলি বা কালো চশমা চলিতে পারে। এবং পারিলে পিঠে কুলা দিবে। নচেৎ উহাদের ক্যা— আছে। শব্দটি আর উচ্চারণ করিলাম না। এখন আসিতে পারো। আর শুনো, আজ দ্বিপ্রহরে সুসিদ্ধ অন্ন পাতলা সুপ সহযোগে ভক্ষণ করিবে। শেষ পাতে ঘরে পাতা টক দই। আর দিবানিদ্রা নৈব নৈব চ।

আমি গাত্রোত্থান করিলাম। দেখিলাম আমার বুক, পেট, কান, মাথা ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিয়াছে। ইহা পথশ্রম, না কমলাকান্তের সান্নিধ্যলাভের ফল তাহা জানি না। তবে ফল যে ফলিয়াছে তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায়। ফল লাভে খুশি হইয়া খুশি মনে গৃহাভিমুখে যাত্রা করিলাম।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন