(প্রথম পর্বের পর)

দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স

বিশ্ব জুড়ে নগদের বাজারকে সঙ্কুচিত করার লক্ষ্যে ২০১২-তে এই সংস্থা তৈরি হয়, যার অন্যতম সদস্য ইউএসএআইডি। নিউইয়র্কে ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে এর সচিবালয়। এই কারণেই বোধহয় পূর্ববর্তী দু’টি বছরের একটিতে গেটস্‌-ফাউন্ডেশন এবং আরেকটিতে মাস্টার কার্ড- ফাউন্ডেশন রাষ্ট্রপুঞ্জের এই ছোট্টো দরিদ্র সংগঠনটিকে উদার ভাবে সাহায্য করেছিল।

নগদকে সঙ্কুচিত করলে যাদের লাভ সব চেয়ে বেশি সেই সব বৃহৎ মার্কিন-প্রতিষ্ঠান এই অ্যালায়েন্সের সদস্য। এই প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে রয়েছে মাস্টার কার্ড ও ভিসা-র মতো ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি এবং সেই সব মার্কিন প্রতিষ্ঠান যাদের নাম মার্কিন গোয়েন্দা সার্ভিসেসের ইতিহাস বইগুলোতে অনেক বারই উঠে এসেছে যেমন ফোর্ড ফাউন্ডেশন, ইউএসএআইডি ইত্যাদি। গেটস্‌-ফাউন্ডেশনও একটি উল্লেখযোগ্য সদস্য। ই বে-র ওমিডিয়ার নেটওয়ার্ক-এর প্রতিষ্ঠাতা পিয়ের ওমিডিয়ার এবং ‘সিটি’ এই অ্যালায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ-জোগানদার। অ্যালায়েন্স সদস্যদের বেশির ভাগই নগদের উপর নির্ভরতা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৈরি ইউএসএআইডি-ভারত উদ্যোগের অন্যতম অংশীদার। এই উদ্যোগ এবং ক্যাটালিস্ট-কর্মসূচি ‘দ্য বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’-এর আর একটু বিস্তৃত সংস্করণ, যেখানে যোগ দিয়েছে ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের বেশ কিছু সংস্থা যাদের নগদ অর্থনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভালো রকম ব্যবসায়িক স্বার্থ নিহিত আছে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার আইএমএফ-শিকাগো সন্তান

ভারতে নগদ বাজার সঙ্কোচনের জন্য এই সমঝোতার পরিকল্পনা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। রঘুরাম রাজন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর থাকার সময়কাল (২০১৩, সেপ্টেম্বর– ২০১৬, সেপ্টেম্বর) জুড়েই এই পরিকল্পনা চলছিল। রাজন ছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদ ছেড়ে আবার ফিরে গিয়েছেন সেখানে। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল অবধি রাজন ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের মুখ্য অর্থনীতিক ছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অফ থার্টি’-রও সদস্য রাজন। এটি একটি সন্দেহজনক সংগঠন। এরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে গোপনে নানা রকম চিন্তাভাবনা, আর পরিকল্পনা বিনিময় করে এবং সেই সব আলোচনার কোনো সূচি রাখা হয় না। নগদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী যে অন্যতম সমন্বয়-কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছে, সেই বিষয়টি ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেছে। কেন রগফ, ল্যারি সামার্স-এর মতো নগদ-বিরোধী যুদ্ধের সৈনিকরাও এই গোষ্ঠীর সদস্য।  

আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার আরও উঁচু ধাপে ওঠার ইচ্ছা থাকার যথেষ্ট কারণ রাজনের আছে। তাই ওয়াশিংটনের খেলার অন্যতম খেলোয়াড় হওয়াও তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। এর আগে আমেরিকান ফিনান্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজন এবং অর্থনৈতিক গবেষণায় প্রথম ফিশার-ব্ল্যাক পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে অর্থনৈতিক গবেষণার জন্য ইনফোসিস পুরস্কার, আর্থিক অর্থনীতির জন্য ডয়েশ ব্যাঙ্ক পুরস্কার এবং ইকনমিকসের সব চেয়ে ভালো বই লেখার জন্য ফিনান্সিয়াল টাইমস/গোল্ডম্যান স্যাকস পুরস্কার। ন্যাসকমের ‘বর্ষসেরা ভারতীয়’-র সম্মান এবং ‘ইউরোমানি’ ও ‘দ্য ব্যাঙ্কার’-এর ‘বর্ষসেরা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কার’ সম্মানও জুটেছে তাঁর। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ক্রিস্টিন ল্যাগার্ডের সম্ভাব্য উত্তরসূরির তালিকায়ও জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। তবে আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থার আরও অনেক উচ্চ পদেও যেতে পারেন তিনি।

দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে আর্থিক ক্ষেত্রের শীর্ষ স্থানীয়দের কাছে রাজন খুবই সম্মাননীয় ও পছন্দের মানুষ ছিলেন, কিন্তু বিনিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে যতই তাঁর আগ্রহ থাকুক উৎপাদন ক্ষেত্রের মানুষজনদের কাছে তিনি ছিলেন রীতিমতো অপছন্দের।  তার কারণ অবশ্য তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ অর্থনৈতিক নীতি। এই নীতির তিনিই প্রবক্তা এবং জোরদার সমর্থক। শাসক দলের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রচণ্ড সমালোচিত হওয়ার পর জুন মাসেই তিনি ঘোষণা করেন সেপ্টেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় তিনি আর দায়িত্ব নেবেন না। পরে তিনি ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে বলেছিলেন, তিনি থাকতে চেয়েছিলেন, তবে পুরো মেয়াদের জন্য নয় এবং এই ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আপত্তি ছিল।   এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন বাণিজ্য ও আইনমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছিলেন, রঘুরাম রাজনের গভর্নরশিপ শেষ হওয়ায় খবরে দেশের শিল্পপতিরা খুশি- “আমি তো এটা চেয়েইছিলাম। প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার করে বলেও ছিলাম। ওঁর (রাজনের) যাঁরা লক্ষ্য তাঁরা মূলত পশ্চিমী…। আমার কাছে দলে দলে লোক আসত, বলত কিছু একটা করুন…।”   

দুর্ঘটনা, যা ঘটারই ছিল

ভারতের অধিকাংশ ব্যাঙ্কনোট অবৈধ ঘোষণা করার এই যে যুদ্ধ, তার প্রস্তুতিতে যদি রাজন জড়িয়ে থাকেন এবং এ বিষয়ে যে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই তা রাজনের ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগ ও নগদ ব্যবস্থাপনায় ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে বলাই যায়, তাহলে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে এই গোটা ঘটনার পিছনে তাঁর থাকাই স্বাভাবিক। যাদের উপকারের নামে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দোহাই দেওয়া হয় সেই বেশির ভাগ গ্রামীণ ও দরিদ্র ভারতবাসীই যে নোট বাতিলের উদ্যোগে সব চেয়ে বেশি দুর্দশায় পড়বেন, এই ব্যাপারটায় এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিস্মিত করে না। ইউএসএআইডি এবং তার অংশীদাররা গোটা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। ‘বিয়ন্ড ক্যাশ’ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভারতে এখনও ৯৭ শতাংশ লেনদেন নগদেই হয়, এবং মাত্র ৫৫ শতাংশ মানুষ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। এই ৫৫ শতাংশের মধ্যে “মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ গত তিন মাস ধরে ব্যবহার করছেন।”

এটা সবটাই ভালো ভাবে জানা ছিল এবং একেবারে স্থিরনিশ্চিত ছিল যে, বাজারের বেশির নগদ রাতারাতি বিলোপ করলে দেশের বহু ছোটো ব্যবসায়ী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের (যেখানে আশেপাশে কোনো ব্যাঙ্ক নেই)  উৎপাদক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হবে, এমনকি অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। যখন নোট বাতিল হল তখন পরিষ্কার হয়ে গেল, নগদকে পিছনে ঠেলে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস কতটা মিথ্যে। বাজার অর্থনীতিতে প্রত্যেকের যোগদান কাম্য হলে লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারতের মতো দেশে নগদের কোনো বিকল্প হয় না।

নগদের ওপর এই আঘাত ভিসা, মাস্টারকার্ড ও পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী অন্যান্য সংস্থা, যাদের দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের মতো অস্তিত্বের কোনো সংকটে পড়তেই হল না, তাদের কাছে বড়োই লাভজনক হল। ‘পরীক্ষামূলক অঞ্চলেও’ ডিজিটাল পেমেন্ট ‘বেড়ে গেল’।  চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা সেই ক্ষতি বহন করতে সক্ষম, তাঁরাই পরবর্তীতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেন। ব্যাঙ্ক এবং এটিএম থেকে টাকা তোলার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করায় উপভোক্তারাও এখন কার্ড ব্যবহার করার সুযোগ খুঁজবেন, যাতে উপকার হবে মাস্টারকার্ড, ভিসা-সহ ‘বেটার দ্যান ক্যাশ’ জোটের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সদস্যদের।

বিশ্ব জুড়ে নগদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কেন এই যুদ্ধ

বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার সংকুচিত করার জন্য মার্কিন সরকারের প্রবল আগ্রহের অন্যতম কারণ হল বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি ও পেমেন্ট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক মার্কিন কোম্পানিগুলির স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। সম্ভবত সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণও নয়। আরেকটি কারণ হল, ডিজিটাল পেমেন্টের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি করার ক্ষমতা। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে সমস্ত আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং এ সংক্রান্ত অধিকাংশ ডিজিটাল ডেটা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলির নখদর্পণে রাখাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। আর্থিক তথ্যই হল সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান তথ্য।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, মুদ্রার গুরুত্বের বিচারে ডলারের স্থান ও মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় মার্কিন কোম্পানিগুলির প্রতিপত্তি, নগদহীন অর্থনীতির বিশ্ববাজারে মার্কিন সরকারকে ক্রমশ সর্বক্ষমতাশালী করে তুলেছে। অন্য সব দেশকেই স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের পরিবর্তে মাথা নোয়াতে হচ্ছে মার্কিন আইনের কাছে। কী ভাবে তা ঘটছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় সম্প্রতি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার আলগেমাইনে ৎসাইটুং’ নামে এক জার্মান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হাড় হিম করা এক প্রতিবেদন থেকে। জানা যায়, ইরানের সঙ্গে আইনসঙ্গত ভাবে ব্যবসা করা সত্ত্বেও এক জার্মান সংস্থার কর্মচারীদের মার্কিন প্রশাসনের তৈরি জঙ্গি-তালিকায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ হল, বেশির ভাগ আর্থিক ব্যবস্থা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়েছে, এমনকি কিছু রসদ বহনকারী কোম্পানিও তাদের তৈরি আসবাব পরিবহন করছে না। আরও দৃষ্টান্ত আছে। মার্কিন অনুরোধে জার্মানির এক বড়ো ব্যাঙ্ক থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে বেশ কিছু কর্মচারীকে, যাঁরা কোনো রকম অবৈধ বা অন্যায় কাজকর্মে জড়িত নন।

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ককে মার্কিন সরকারের আদেশানুসারে চলতে বাধ্য করতে পারে আমেরিকা। আদেশ না মানলে রয়েছে আমেরিকায় বা ডলারে বাণিজ্য করার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি। এটা হওয়া আর ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দেওয়া, দু’টোর মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। ডয়েশ ব্যাঙ্কের কথাই ভাবুন। ১৪০০ কোটি ডলার জরিমানা দিয়ে তারা ব্যবসা থেকে পাততাড়ি গোটাবে, নাকি ৭০০ কোটি ডলারে রাজি করিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে, এই নিয়েই মার্কিন ট্রেজারির সঙ্গে কয়েক মাস ধরে আলাপআলোচনা চালাতে হল তাদের। শেষ পর্যন্ত ৭০০ কোটি দিয়ে বাঁচল। একটা দেশের হাতে যখন অন্য দেশের ব্যাঙ্ককে দেউলিয়া করার ক্ষমতা থাকে এবং সেই দেশটা বেশ বড়ো দেশ, তখন সেই দেশের সরকারকেও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার থাকবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সেই সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে আধিপত্য করার ক্ষমতা ইতিমধ্যেই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। বিশ্ব জুড়ে নগদের ব্যবহার যত কমবে, আমেরিকার হাতে এই ক্ষমতা ততই পুঞ্জিভূত হবে। কারণ নগদের ব্যবহার এই ক্ষমতাকে অনেকটাই নড়বড়ে করে দিতে পারে। (শেষ)

সৌজন্যে : গ্লোবাল রিসার্চ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here