Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

বয়স্ক লোকেরা বলত, এখন দু’মুখো সময়। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে সুন্দরবনের লোকেরা প্রায়শই অভুক্ত অবস্থায় থাকত। বছর চল্লিশ আগে একফসলি সুন্দরবনে এই সময়টা মলমাস। মাঠঘাটে জল। গোরু-ছাগলও ঘরে বন্দি। এই সময় কোনো কাজ থাকে না। অবশ্য অনেকে উত্তরে খাটতে যেত। কিন্তু বাড়িতে থাকত পরিবার-পরিজন। তারা আটাঘোঁটা, চালভাজা, মাইলোঘোঁটা, ধানখেত থেকে তোলা শাপলা সেদ্ধ করে নুন দিয়ে খেত। শাপলার ফল বা চাকের দানা ভেজে খেত।

ধারাবাহিক/ দ্বিতীয় পর্ব

আমাদের গ্রামের পাগলাহরি সকালবেলা আমানি (পান্তাভাতের জল) নিতে আসত। বাড়তি পাওনা ছিল ওর গান। মুখে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইত। চোখে দেখতে পেত না, পেলেও সামান্য। সেই অবস্থায় গাইত – বাবলা বনের ধারে ধারে বাঁশি বাজায় কে… বাঁশি বাজায় কে রে সখি– বাঁশি বাজায় কে/ মাথার বেণী তারে দিয়ে আমায় আইনা দে।

‌- দু’টো পান্তা দাও…

গৃহস্থ বলত– পান্তা নি। সাত সকালে মোলাকো কাজ!

– তা হলি আমানি দাও।

পরবর্তী কালে সত্যি মনে হত, হ্যাঁ, ভিখারিরাও গান গায়।

রেডিও তখন গ্রামবাংলার একমাত্র মাধ্যম। হরি বাংলায় খবর পড়ত – আকাশবাণী কলকাতা, খবর পড়ছি হরিপদ মণ্ডল।

গৃহস্থরা আপদ বিদায় করার জন্য তাড়াতাড়ি পান্তা, জলদা, যা হোক কিছু দিয়ে বিদায় করত। তখন তমাল তরুমূলে শিশির সরিয়ে সোনা রোদ উঠত। সেই রোদে গেঁতি ধান সবে পেকে উঠেছে। বাবুই-চড়াই-টিয়া পাকা ধান খেয়ে নিত। ধানখেতের মাঝখানে টিন বেঁধে দেওয়া হত। লম্বা দড়ি থাকত আমাদের হাতে। পাখির ঝাঁক দেখলেই দড়ি ধরে টান দেওয়া হত। আর ঢং ঢং করে বাজত। পাখিরা পালাত। আমরা ছাত্রবন্ধু নিয়ে বসে থাকতাম।

দিগন্তে পুজোর গন্ধ। নোনা মাটির বাঁধ। নদীর চর সাদা বাতাসার মতো। সামনেই পুজো। গ্রামে কারওর পুজোর সময় জামা-প্যান্ট হত না। বিশেষত কলুনপাড়ায়। এই পাড়ায় শিবের বউকে দেখেছি বর্ষার সকালে কচুপাতার ওপর পান্তাভাত দিয়ে আঁচলের নীচে করে নিয়ে যেত। পাগলাহরি, কানাহরি শিবের ভাগনে। এই শিবকে বলা হত বাঁকা শিবে। পাগলাহরির জামাইবাবুর নাম ছিল প্যানা। প্যানাচরণ হাঁদা লোক। খয়াটে চেহারা। ওর বউ একেবারে টনি গ্রেগের মতো লম্বা। আঁধারের মতো কালো। আমাদের বাড়িতে গোবর কুড়িয়ে নিত। হাঁটুর ওপর কাপড় বেঁধে গোবর চটকাত। বড়ো বড়ো হাতে ঘুঁটে দিত।

এক দিন মাঠের মাঝখানে ধান কাটা হচ্ছে। প্যানা তার শালাকে নিয়ে ধান কাটছে। আমরা মাঠে ধান কুড়োচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম ইটখোলায় প্যানা আর হরি মারপিট করছে। হরি হাতের কাস্তে ফেলে দিয়ে প্যানাকে ধান বাগানে একেবারে শুইয়ে ফেলে দিয়েছে। আমরা অনেক কষ্টে মারামারি থামালাম। চার পাশে ধান। শুধু ধান কাটার অপেক্ষায়। ধান রোওয়ার সময় আর কাটার সময় কেউ মারা গেলে বাড়ির লাশ বাড়িতে পড়ে থাকত।

প্যানাচরণ বউকে খুব ভয় পেত। বউ এলে খুব বকাঝকা করে। আড়ালে জিজ্ঞাসা করেছি – তুমি ওকে মারলে কেন?

– মারব না? আড়ো বেলা। এখনও ধান কাটানো এগোয়নি। বেলা পড়ে যাচ্ছে। বাড়িতে এক খুঁচি চাল নেই। চোখে দেখতে পায় না বলে খায় তো কম না।

আরও পড়ুন: সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ বাঘা নটো

ও দিকে হরি ঝকঝকে আকাশের নীচে দাঁত বার করে হাসে। জিজ্ঞাসা করি, হাতের কাস্তে ফেলে দিলে কেন? এক বার প্যানার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘নাগ (রাগ) না চণ্ডাল’। পাশে অন্য কিষেন ফোড়ন কাটে – পাগলার কাণ্ডজ্ঞান টনটনে।

হরি আবার তারস্বরে গান গায়-

বাবলা বনের ধারে ধারে

বাঁশি বাজায় কে?

বাঁশি বাজায় কে রে সখি – বাঁশি বাজায় কে?’ (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here