Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

ভুঁড়ে কেনা ছিল অলস। বিশাল বপু নিয়ে ঘুরতে ফিরতে হাঁপাত। সংসার চালাত ওর বউ। অভাবের দিন কাটতে শুরু করেছে, সৌজন্যে বাগদার মীন। এই পর্ব শুরু হল আশি সাল নাগাদ। জলের নীচে কাঁচা টাকা, ধরতে পারলেই পয়সা। সরু কাঠির মতো বাগদার পোনা। সেই প্রথম নাইলনের জাল ঢুকল। জোয়ার হোক, ভাটা হোক সেই কোমরজলে জাল টানতে হত।

সংগৃহীত বাগদার পোনা ঘরকন্নার হাঁড়ি-ডেকচিতেই রাখত। একঘেয়েমি কাজ, সেই কারণে গুনগুন করে গান গাইত। জনপ্রিয় বনবিবির গান – বনবাসীর দুখের মার আক্ষেপ – দ্যাখরে দুখে নয়ন ভরে আমি যে তোর মা।

শিশুদের দুধ খাওয়ানোর ঝিনুক দিয়ে বাগদা গোনা হত। রাতের বেলা হলে টেমির আলোয় গুনতে হত। চোখের দফারফা। আগে সুন্দরবনের লোক কেউ চশমা পরত না। নদীর ভাঙন তরান্বিত করল এই বাগদা মারা, চোখেরও। বিশাল চর। লোকেরা বলত পুবের ঘের। জোয়ারের সময় ভুঁড়ে কেনার বউ আর তার সঙ্গে অন্যরা জাল টানছিল। দখিনা বাতাসে সেই জল জল বেলুনের মতো ভাসছিল। তাতে পোনা মেলে কম।

এই সব কারণে কেনার বউ বোধ হয় একটু পাড় থেকে দূরে। কিন্তু অন্যরা দেখছে – কেনার বউ হাসছে। হেসেই যাচ্ছে। কেনার বউ-এর পেছনে ছিল সীতা। বিধবা রমণী। সে দেখছে নদীর জল কুমকুমের মতো লাল। কেনার বউ সমানে মাঝ নদীতে যাচ্ছে। গাঙভেরিতে বসেছিল অনেকে। নৌকো নিয়ে পৌঁছোতেই সব শেষ। রক্ত জলে মিশছে, কেনার বউ কাতরাচ্ছে…। এই নোনা দেশে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এখানে জীবন শুরু হয়, আবার শেষও।

[ আরও পড়ুন: সুন্দরবনের সেই মুখগুলি/ লম্বা কালো ]

এর পরেও কিন্তু বাগদা কম ধরা পড়েনি। কারণ পয়সা। চাষের জন্য কাজের লোক কম পড়ছে। সবাই নদীতে। ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ কোনো ভেদাভেদ নেই। আমাদের গ্রামের পূজারি ব্রাহ্মণ ও তাঁর বউও বাদ যায়নি। অমূল্য ঠাকুর তাঁর ছেলেদের নিয়ে নৌকোয় করে পোনা ধরতেন। বাগদা পরবর্তী গ্রামের হালচাল পালটে গেল। প্রত্যেকের হাতে কাঁচা পয়সা। পায়ে মুগুর মার্কা চটি, বগলে সন্তোষ রেডিও। বাগদা-মারারা গাঙবাতাড়ি বাতাসে গল্পগুজব করত। কেনার বউ মারা গেল। সেই প্রথম শহিদ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here