Sunderban
সুন্দরবন। প্রতীকী
Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

গাড়ুশুভেন– ডাক নাম। ভুঁড়ির আয়তনের জন্য তার এই নাম। শুভেন অসুরের মতো খাটতে পারে। এক সময় রায়মঙ্গলের পাড়ে ওদের বাড়ি ঘরদোর ছিল। এক রাতে ওদের বাড়ি ঘরদোর নদীতে চলে যায়। সে সাংঘাতিক ব্যাপার। বাপ-ঠাকুরদার আমলের বড়ো বড়ো বাক্স। ডালা খুলতেই বড়ো বড়ো সাপ। গৌরসাধু সাহসী লোক। কী সব মন্ত্র পড়ে হাতের বরাভয় দেখাতেই মনসার বাহনরা সব গলা উঁচু করে পগার পার।

বড়ো নৌকো করে এল আমাদের গ্রামে। দাদার শ্বশুরবাড়িতে। এক রাতেই ভাগ্য নির্ধারিত। শুভেন অ্যান্ড কোম্পানি লোকের বাড়ি খাটাখাটনি করত। ভাইরা সব ছোটো। তার মধ্যে এক ভাই খোঁড়া– পোলিও। সে ভালো পাখি ধরতে পারত।

সরকারি জমি পেল। ওর বাবা বাড়ি করল। দোকান করল। শুভেন একটু বারমুখো। বিয়ে হল স্বগ্রামের রায়মঙ্গলের মেয়ের সঙ্গে। বিদ্যাধরীর পাড়ে। প্রথম সন্তান মেয়ে হতেই শুভেনের খাটুনি বেড়ে গেল। শীতের মধ্যে লোকের বাড়িতে মশুম চুক্তিতে থাকত। রাতে বউয়ের শরীর খারাপ বলে বাড়ি চলে যেত। বাড়ি গিয়েই লঙ্কার খেত বানাত। বউ চারা লাগাত।

মেয়ে ঋতুমতী হতেই বিয়ে দিল। শূন্য সংসারে সন্তান এল- ছেলে। রায়মঙ্গল পাড়ের দম্পতি খুব খুশি। কিন্তু বাধ সাধল ওর মেয়ে-জামাই। তার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা হাসিঠাট্টা করতেই মেয়ের গোঁসা হল। বাপের বাড়ি এসে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া। মা গলায় দড়ি দিল। শুভেন ছেলে মানুষ করল। গ্রামের ছোটোখাটো পরকীয়াতেও জড়িয়ে পড়ল।

নোনা হাওয়া সাঁই সাঁই করে বয়ে যায়। শীতের পড়ন্ত বেলায় বসে থাকে শুভেন। পথ দিয়ে কত লোক যায়। মাস্টার, পণ্ডিত, স্কুল কলেজের ছেলেমেয়ে – তারা কত কী বলে যায়। কানে এক ফোঁটাও শব্দ যায় না। বদ্ধ কালা।

শুভেন এখন কানে শোনে না। সকালবেলা উঠে কাজে চলে যায়। এর মধ্যে ছেলে লায়েক হয়ে উঠেছে। বাপকে এক দিন গুছিয়ে পেটাল। সুইজ গেটের মাথায় গাঙভেড়িতে বাসা শুভেনের। প্রণয়ীর বাড়ি খালের ওপারে। চাঁদের আলো, আকাশ, বাতাস – সেই জলে আবর্তিত হয়। মাঝে নদী বহে রে……।

নোনা হাওয়া সাঁই সাঁই করে বয়ে যায়। শীতের পড়ন্ত বেলায় বসে থাকে শুভেন। পথ দিয়ে কত লোক যায়। মাস্টার, পণ্ডিত, স্কুল কলেজের ছেলেমেয়ে – তারা কত কী বলে যায়। কানে এক ফোঁটাও শব্দ যায় না। বদ্ধ কালা। পাড়ার লোক ওকে প্রায় আগল-পাগল ঠাওরায়।

হড়পা বানের মতো মনে পড়ে সে দিনের রাতের কথা। রায়মঙ্গল তাদের সব নিয়ে নিয়েছে। এখনও তাদের জমিজমা সব রায়মঙ্গলের বুকে। মাঝে মাঝে মনে হয় এক ডুবে গিয়ে সব উদ্ধার করে। কিন্তু এ জীবনে আর সে পারবে না। জোয়ার এলে হাত পেতে বসে থাকে। সুইজ গেটের খালে সাঁতার দিয়ে দিয়ে মাছ ধরে। এক পাল কুকুর-বেড়াল ওর পোষ্য। বাঘা ওকে দেখলেই লেজ নাড়ে। পাহারা দেয়। এক আকালের ছেলে অন্য আকালে গিয়ে আটকে পড়ে। বিদ্যাধরী নিরন্তর বয়ে যায়। গাড়ু শুভেনের ঘরকন্যা থামে না।

আগের পর্বগুলি পড়ুন এখানে ক্লিক করে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here