Utpalendu Mondal
উৎপলেন্দু মণ্ডল

কেরীসাহেবের ছিল বিশাল ভিটে। অনেক ক’টি ভাই। সবাই অল্পবিস্তর লেখাপড়া শিখেছিল। আমাদের কেরীসাহেবের গায়ের রং পাকা গমের মতো। আমাদের গ্রামের প্রথম গ্র্যাজুয়েট। তখন চাকরি চাইলেই পাওয়া যেত। কেরীসাহেব কেন নেয়নি আজও তা অজ্ঞাত। নোনা জল-বাতাস ছেড়ে কোথাও যাবে না বলেই হয়তো।

পাড়ার কারো ইংরাজিতে চিঠি এলেই পাঠক কেরীসাহেব। কালীপদ কেরী কথায় কথায় ইংরাজি বলত। আমরা হাডুডু, ফুটবল খেললে সে রেফারি হত। সস্তা টেরিলিনের জামা গায়ে সে রেফারিগিরি করত। রেডিওতে তখন অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্যের দিনকাল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে, চরে শেষ বিকেলের রোদ ধানীখালে খেলা করত। দূরে পাল তোলা মিদনাপুরের বোট বাদামি আকাশছোঁয়া। লঞ্চের মতো। বোট তখন এগিয়ে যেত, সেই সময় কেরী চুপ করে বসে থাকত। জোয়ারের জল পাড়ে ঘা মারত। বাতাসে বসন্তের দোল। বান ক্যাওড়ার গন্ধ নোনা ধুলোতে মিশে যেত – তখন কেরীসাহেব বসে থাকত।

ধারাবাহিক পর্ব/ ৭

কলকাতায় ফিরিয়ে দেওয়া প্রণয়ীদের কথা মনে করত। এক দিন বাড়ি যেতে দেখলাম ভাঙা দালানের দেওয়ালে টাঙানো ওর বিএ পাশের সার্টিফিকেট। জ্যৈষ্ঠ মাসের এক বিকালে – কালীপদের বিয়ে হল। শোনা কথা, হাজার টাকা পণ নিয়েছিল।

আমরা বলতাম, হাজার টাকার দামড়া। দূর থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতাম। কখনও রাগতে দেখিনি। কয়েক বছর বাদে জলে বাগদা, কাঁচা টাকা। কেরীসাহেব জাল পেতে বসে থাকত কাঁচা টাকার জন্য। এক সময় সংসার আলাদা হল। ভাইরা জমির ভাগ সেরে আলাদা আলাদা ভিটা-বাড়ি সাজাল। সাহেব পড়ে থাকল পুরোনো কোঠাবাড়িতে।

এক সময় সে বাড়ি ভিটেমাটি-সহ আয়লার তাণ্ডবে নদীতে। কেরীসাহেব সরকারি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আলিপুরে যায়। অ্যনেক্সচার বিল্ডিং-এর নয় তলা থেকে কলকাতা দেখে। আবার ফিরে যায় গ্রামে। সরকারি টাকা ঘুর পথে আসে। হাল-খতিয়ান-মৌজা পেরিয়ে আসতে আসতে বর্ষা আসে।

আয়লার দশ বছর পূর্তি হয়। কেরীসাহেব ঘর তোলে। ছেলে আন্দামানে, বউ অমর্ত্য সেনের স্কুলে। হারিয়ে যাওয়া ছবির মতো কেরীসাহেব বসে থাকে। সামনে ভাঙনকুলের নদী। দূরে সাতজেলের হাট। ভটভটির শব্দে কানপাতা দায়। তবুও অন্ধকারে, ছবিঘরের অন্ধকারে বসে থাকে কেরীসাহেব। এক অমলিন স্মৃতিছবি যেন বা!


আগের পর্বগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here