Mamata Banerjee and Amit Shah
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অমিত শাহের গ্রাফিক্স ছবি পত্রিকা.কম থেকে
jayanta mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

বিজেপি নেতৃত্বের মুখে মুখে এখন ‘মমতা’, ‘গৃহযুদ্ধ’ বা ‘রক্তবন্যা’ গোছের শব্দপুঞ্জ ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। কারণটা অবশ্যই অসমের নাগরিকপঞ্জি। এক দিকে যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অসম নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করার অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে, অন্য দিকে দিল্লির অমিত শাহ টু কলকাতার দিলীপ ঘোষ, প্রত্যেকের অভিযোগ, মমতা অযথা উসকানি দিয়ে শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছেন। শিক্ষিত সমাজের একাংশ অবশ্য বিজেপির এই যুক্তিকে মান্যতাও দিচ্ছেন। কিন্তু কেন?

প্রথমত, ন্যাশনাল সিটিজেন্স রেজিস্টার (এনসিআর) বা নাগরিকপঞ্জি নিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি যে তৈরি হতে পারে, তা বিন্দুমাত্র টের পায়নি বিজেপি। একাধিক ‘প্রাচীন’ তত্ত্ব এবং তথ্যকে সম্বল করে নাগরিকপঞ্জির আগে ‘খসড়া’ তকমাটা জুড়ে দিয়ে ধেই ধেই করে উতরে যাওয়ার আশা ছিল কেন্দ্রের শাসক দলের। দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে খসড়া দিয়ে নুড়ো গোঁজা যেমন সম্ভব, তেমনই তারই মাঝে দলের কেষ্টবিষ্টুরা এক দিকে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী আর অন্য দিকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী নিয়ে ব্যাপক লম্ফঝম্ফে মেতে উঠবে। কিন্তু তেমনটা আর হল কোথায়?

অসমের মন্ত্রী পরিমল শুক্ল বৈদ্য বেশ রসিয়ে বলেছেন, “গৃহযুদ্ধের সেনাপতিরা এলে তাঁদের তো আটকানো হবেই”। তা হলে অশান্তির জন্য ১৪৪, না কি ১৪৪-এর জন্য অশান্তি, সেটা নিয়েই ধন্দ।

এনসিআর কী, এর উদ্দেশ্য কী, এর প্রয়োজনীয়তাই বা কতটা – এ বিষয়ে বাস্তব যুক্তিযুক্ত কারণগুলিকে অস্বীকার করার ক্ষমতা বা অধিকার নেই কোনো ভারতবাসীর। কিন্তু বিজেপির তরফে আতসকাচের নীচে ধরা ‘বেআইনি বাংলাদেশি’রা তো এক দিনে সীমান্ত অতিক্রম করে এ দেশে প্রবেশ করেনি। সে প্রসঙ্গেই হাজার কোটি টাকা খরচ করে সীমান্তপ্রহরা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসতে বাধ্য। প্রায় শতাব্দী সময়কাল ধরে এ দেশে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক মানুষকে এক ঝটকায় ‘অবৈধ’ তকমা দিতে হলে সে প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে কেন্দ্রকে। বিজেপির তরফে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, “ভারতে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন অসম থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যেই অসম চুক্তি করেছিলেন। তার পরে দু’টি ইউপিএ সরকার যা করতে পারেনি, গত চার বছরে এনডিএ সরকার তা করে দেখাল।”

এমন যুক্তিকে সামনে রেখে জাতীয় কংগ্রেসকে দমানো সহজ হলেও তৃণমূল কংগ্রেস তো সেই সলতে পাকালই! এবং ধরালও। উসকানিমূলক বক্তব্য পেশ করার অভিযোগে মমতার বিরুদ্ধে পর চার-চারটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। আইন মোতাবেক তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে মমতার ‘গৃহযুদ্ধ’ সংক্রান্ত মন্তব্যে আইনের বিরুদ্ধাচরণের কোনো লক্ষণ খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না। তৃণমূলের আট সদস্যের প্রতিনিধিদল শিলচর বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে থেকেই সেখানে ১৪৪ ধারা জারি ছিল। ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াল? শান্তি বিরাজ করলেও কোনো স্থানে আইন মেনে ১৪৪ ধারা জারি করা সম্ভব? উত্তর দেবেন আইনরক্ষকরা। তবে অসমের মন্ত্রী পরিমল শুক্ল বৈদ্য বেশ রসিয়ে বলেছেন, “গৃহযুদ্ধের সেনাপতিরা এলে তাঁদের তো আটকানো হবেই”। তা হলে অশান্তির জন্য ১৪৪, না কি ১৪৪-এর জন্য অশান্তি, সেটা নিয়েই ধন্দ।

অনেকেই মনে করে, নিতান্তই পার্টি অফিসে বসে যে কথা বলার, তেমন কথাই প্রকাশ্য সভায় বলে ফেলেছেন মমতা। এমন মন্তব্যে প্ররোচিত হতে পারেন সাধারণ মানুষ। ফলে এই ইস্যুকে হাতিয়ার করতে চেয়েছিলেন অমিত শাহ। মমতার এ হেন মন্তব্যের অব্যবহিত পরেই তিনি সাংবাদিক বৈঠক ডেকে চাঁচাছোলা ভাষায় তৃণমূলনেত্রীকে আক্রমণ করলেন। তিনি বলেন, উসকানি দিয়ে সস্তা রাজনীতি করতে চাইছেন মমতা। তার কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য অমিতের দলের দিল্লি শাখার সভাপতি মনোজ তিওয়ারি দাবি তুললেন, দিল্লিতেও নাগরিকপঞ্জি চাই। মহারাষ্ট্র থেকেও উঠল একই দাবি।

…মাসখানেক ধরে মমতা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছেন, তাঁর যে কোনো মন্তব্য বেশ ওজনদার হয়ে উঠছে। এ দিকে দেশের ‘চৌকিদার’ও এখন দেশেই নেই।

তা হলে কী হল, নাগরিকপঞ্জি নিয়ে যখন সমস্ত সিদ্ধান্তগ্রহণের একমাত্র মালিক রাষ্ট্র, সেখানে বাদ পড়া নাগরিকের সামনে উপযুক্ত প্রমাণ জমা করা ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করার অন্য কোনও পথ খোলা নেই, সেখানে একটা রাজনৈতিক দলের রাঘববোয়ালরা স্থির করে ফেলছেন দেশের কোথায় কোথায় এই স্পর্শকাতর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। কারণ, আমি ভাই শাসক দল, তাই আমার হাতেই সমস্ত বল।

রাজনীতি চলবে। মমতা বা তৃণমূল কংগ্রেসের খুব বেশি কিছু হারানোর নেই গৃহযুদ্ধ মন্তব্যের নেতিবাচক (!) প্রতিফলে। কারণ, মাসখানেক ধরে মমতা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছেন, তাঁর যে কোনো মন্তব্য বেশ ওজনদার হয়ে উঠছে। এ দিকে দেশের ‘চৌকিদার’ও এখন দেশেই নেই। তিনি ফিরলে হয়তো, মমতার গৃহযুদ্ধ মন্তব্যকে দাঁড়িপাল্লায় ফেলবেন। তাতে আখেরে লাভ মমতারই। ২০১৪ সালে বিজেপির প্রস্তাবিত প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধ-প্রচারে বাকি দলগুলো যতটা মনোযোগ দিয়েছিল, ২০১৯-এর আগে সরকারি দল কি মমতার জন্য সেটুকু করবে না?

1 মন্তব্য

  1. ঠিক সময়ে ঠিক লেখা। লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য জয়ন্তকে ধন্যবাদ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন