নীলাঞ্জন দত্ত:

আলিপুর মহিলা জেলে (সরকারি নামে ‘সংশোধনাগার’) এসএফআই-এর রাজ্য সভানেত্রী মধুজা সেনরায়-সহ তিন জন কর্মীকে নগ্ন-তল্লাশির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

৯ মার্চ ধর্মতলায় টেট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে আইন অমান্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এঁরা গ্রেফতার হন। রাত কাটাতে হয় লালবাজার পুলিশ লকআপে। পরের দিন আদালতে তোলার পর বিচার বিভাগের হেফাজতে রাখার জন্য তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুর জেলে। ১৪ মার্চ অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে তাঁরাও জামিনে মুক্তি পান। জেল থেকে বাইরে আসার পর তাঁরা রাজ্য মহিলা কমিশনে গিয়ে এই হেনস্থার কথা জানান।

মহিলা কমিশনের সভানেত্রী যদিও অভিযোগ শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তা নিয়ে তদন্ত করার আশ্বাস দেন, সাংবাদিকরা কারামন্ত্রীর কাছে সেই অভিযোগ তুললে তিনি তা একেবারেই উড়িয়ে দেন। কোনো এক কারাকর্তা দোষ চাপান জনৈক ‘নতুন অফিসারের’ ওপরে এবং বলেন যে তাঁকে নাকি ডিআইজি ধমকেও দিয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মীরা কিন্তু অন্য কথা বলছেন। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির (এপিডিআর) সাধারণ সম্পাদক ধীরাজ সেনগুপ্তর কথায়, “মহিলা জেলে এই ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে ঘটে চলেছে। আমরা একাধিকবার এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। সুপারকে স্মারকলিপিও দিয়েছি। সর্বশেষ গত ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যখন ‘রাজবন্দি মুক্তি যৌথ উদ্যোগ’-এর প্রতিনিধিরা সুপারের সঙ্গে দেখা করেন, তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা একটা মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে বার বার আমার কাছে আসছেন কেন?’ এখন তো দেখাই যাচ্ছে, অভিযোগটা মোটেই মিথ্যে নয়।”


বাস্তবটা আগেও একই রকম ছিল। অভিযোগও হয়েছিল। কিন্তু, তা নিয়ে এখনকার মতো আলোড়ন হয়নি। কারণ, আগে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন তাঁরা এখনকার মতো ‘মূলধারার রাজনৈতিক কর্মী’ ছিলেন না এবং সমাজের প্রত্যন্ত অংশ থেকেই তাঁদের উঠে আসা।


এসএফআই কর্মীদের ঘটনাটা সামনে আসার পর ১৮ মার্চ জেলের সামনে বিক্ষোভ দেখায় এপিডিআর। তার প্রতিনিধিরা সুপারের সঙ্গেও দেখা করেন। এ বার কিন্তু তিনি অভিযোগকে সত্যি-মিথ্যে কিছুই বলেননি, তাঁদের সঙ্গে কোনো কথা বলতেই অস্বীকার করেছেন, এমনকি তাঁদের স্মারকলিপিও নেননি। মানবাধিকার কর্মীদের প্রশ্ন, “জেলের ভেতরের নির্মম বাস্তবটা আর ঢেকে রাখা যাচ্ছে না বলেই কি এত রাগ?”

বাস্তবটা আগেও একই রকম ছিল। অভিযোগও হয়েছিল। কিন্তু, তা নিয়ে এখনকার মতো আলোড়ন হয়নি। কারণ, আগে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন তাঁরা এখনকার মতো ‘মূলধারার রাজনৈতিক কর্মী’ ছিলেন না এবং সমাজের প্রত্যন্ত অংশ থেকেই তাঁদের উঠে আসা। জেলের ভেতর অথবা জেলের বাইরে, তাঁদের ওপর কী হল না হল, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো মানুষ অত্যন্ত অল্প। আর মিডিয়ার তো তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই।

যে তিন জন বন্দিনির যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা গত মানবাধিকার দিবসে সরব হয়েছিলেন, তাঁরা হলেন হিরন্ডি দীনেশ ওয়াংখাড়ে, পারো অর্জুন পটেল ও ঠাকুরমণি (তারা) হেমব্রম। ‘ভয়ঙ্কর মাওবাদী’ আখ্যা পেয়ে এঁরা বছরের পর বছর ‘বিচারাধীন’। আগে পুলিশ হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও জেলে নতুন ‘আমদানি’ হয়ে আসার সময় তো এঁদের নগ্ন-তল্লাশির মধ্যে দিয়ে যেতেই হয়েছে, তার ওপর আবার যত বার আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়, ঘটে চলে একই অনুষ্ঠান। শুধু এই বন্দিদেরই নয়, শোনা যায়, এই ঘটনা ঘটে অনেকের ক্ষেত্রেই। নগ্ন-তল্লাশিই শেষ নয়, তার সঙ্গে রয়েছে ‘ক্যাভিটি সার্চ’ – একেবারে যৌনাঙ্গে হাত ঢুকিয়ে তল্লাশি। ‘সংশোধনাগারের’ সংশোধনের পদ্ধতি বটে!

হিরন্ডিদের কাহিনি চাপাই পড়ে থাকত, যদি না এসএফআই কর্মীরা জেল থেকে বেরিয়ে এই বর্বরতার কথা জানাতেন। সত্তর দশকে সিপিআই-এর মহিলা সমিতির সদস্যরা মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আইন অমান্য করে জেলে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে নকশালপন্থী মেয়েরা কী রকম নির্যাতন ভোগ করে বিনা চিকিৎসায় আটক রয়েছেন। তাঁরা বাইরে এসে তা না বললে সে কথা কেউ জানতেও পারত না। এ বারে অবশ্য যাঁরা জেলে গিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেদের কথাই জানিয়েছেন, যদিও অন্যদের কথাও সেই সূত্রে আবার উঠে এসেছে। ইতিহাসের পরিহাস এটাই যে, এ বারের নির্যাতিতারা যে বাম দলের ছাত্র শাখার সদস্য, সেই দলটি ক্ষমতায় থাকার সময়েও ভিন্ন রাজনীতির সমর্থক বলে সন্দেহভাজন মেয়েদের ওপর পুলিশের যৌন পীড়নের অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু তার কোনো বিচার হয়নি। যেমন বিচার পাননি বেলপাহাড়ির পচাপানি গ্রামের সুলোচনা কালিন্দী, যাকে ২০০১ সালে ‘মেয়ে না ছেলে’ দেখার জন্য পুলিশ বিবস্ত্র হতে বাধ্য করেছিল।

সুলোচনারা গ্রামের গরিব ঘরের মেয়ে। তাঁদের কণ্ঠস্বর বেশি দূর শোনা যায় না। আজও তেমনই চলছে। কিন্তু কখনও যদি তাঁদের পরিস্থিতিতে সমাজের ওপরের স্তরে থাকা মেয়েদের পড়তে হয়, তখন কিছুটা জানাজানি হয়, ‘খবর’ হয়। এই নগ্ন-তল্লাশির ব্যাপারটাই যখন ২০১৩ সালে আমেরিকায় ভারতীয় দূতাবাসের উচ্চপদস্থ আধিকারিক দেবযানী খোবরাগাড়ের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, তখন ভারত সরকারের থেকেই দাবি উঠেছিল, আমেরিকাকে ক্ষমা চাইতে হবে।

২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর আমেরিকার শিখ আইনজীবী ও চিত্রনির্মাতা ভ্যালেরি কৌর মিনিয়াপোলিস থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস যাচ্ছিলেন। তিনি যে ‘সন্ত্রাসবাদী’ নন এবং তাঁর ব্যাগে থাকা একটি ব্রেস্ট পাম্প যে কোনও ‘অস্ত্র’ নয়, বিমানে চড়ার সময় তা প্রমাণ করতে সেটি ব্যবহার করে দেখাতে তাঁকে বাধ্য করা হয়। এ বছর ৩১ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর প্রবাসী গায়ত্রী বোস ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দর থেকে প্যারিসের প্লেনে ওঠার সময় তাঁর সঙ্গে একই আচরণ করা হয়। এই দু’টি ঘটনা নিয়ে ন্যায্য ভাবেই টিভি আর টুইটারে জোর আওয়াজ ওঠে এবং দায়ী বিমান সংস্থাগুলি ক্ষমা চায়। অথচ ছত্তীসগঢ়ে ‘মাওবাদী’ দমন অভিযানের সময় আদিবাসী মেয়েরা যদি তাদের ছোট বাচ্চা আছে বলে আকুতি জানায়, তবে তাদের বুক টিপে দেখা হয় দুধ বেরোয় কিনা, এই অভিযোগ বার বার উঠেছে। তা সত্ত্বেও সরকার নীরব থাকতে পেরেছে, কারণ ‘জনমতের’ কোনো চাপ তৈরি হয়নি।


শুধু এই বন্দিদেরই নয়, শোনা যায়, এই ঘটনা ঘটে অনেকের ক্ষেত্রেই। নগ্ন-তল্লাশিই শেষ নয়, তার সঙ্গে রয়েছে ‘ক্যাভিটি সার্চ’ – একেবারে যৌনাঙ্গে হাত ঢুকিয়ে তল্লাশি। ‘সংশোধনাগারের’ সংশোধনের পদ্ধতি বটে!


আর একটা ঘটনা নিয়ে সঙ্গতভাবেই খুব শোরগোল পড়েছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি গোয়ায় ফ্যাব ইন্ডিয়ার দোকানে জামাকাপড় কিনতে গিয়ে ট্রায়াল রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন। পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছিল, বহু মেয়ের বেশ পাল্টানোর ছবি তাতে ধরা পড়েছে। রক্ষী আর কর্মচারীরা দেখেছে তো বটেই, হয়তো ইন্টারনেটে বিক্রিও করেছে। এ ঘটনা ২০১৫ সালের ৩ এপ্রিলের।

ঠিক তার দু’দিন আগে মহারাষ্ট্রের বাইকুল্লা জেলের মেয়েদের ওয়ার্ডে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর প্রতিবাদে বন্দিনিরা আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে রাজনৈতিক বন্দি এঞ্জেলা হরিশ সোনটাক্কেকে নির্জন সেলে আটকে শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি সেখানে অনশন ধর্মঘট করেন। অবশেষে তাঁর অবস্থার অত্যন্ত অবনতি ঘটলে কর্তৃপক্ষ তাঁর জেদের কাছে নতিস্বীকার করে এবং ক্যামেরা লাগানো বন্ধ হয়।

এই ঘটনাও বিশেষ প্রচার পায়নি, জনমনে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। মহারাষ্ট্রের মানবাধিকার সংগঠন ‘কমিটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব ডেমোক্র্যাটিক রাইটস’ (সিপিডিআর) এঞ্জেলার সঙ্গে দেখা করে এবং এক স্মারকলিপিতে কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দেয়, সুপ্রিম কোর্টও বলেছে, এক জন মানুষ জেলে থাকলেই তার সমস্ত মৌলিক অধিকার হারিয়ে ফেলে না।

সর্বশেষ খবর, আলিপুর মহিলা জেলের ঘটনা নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য কারা দফতর। সিপিআই(এম) দলের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও অভিযোগ জানানো হয়েছে। যাদের গলার জোর কম, তাঁদের অভিযোগগুলিও কি এবার শোনা হবে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here