pankaj৭৪টা বছর পেরিয়ে ৭৫-এ পা দল সেই দিন। সেই ইতিহাসে ফিরে গেলেন পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়।

১৯৪২-এর ২৯ সেপ্টেম্বর। বেলা তিনটে। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য নিবেদিত বিপ্লবী জনতার মিছিল চলছে এগিয়ে তমলুক থানা ও দিওয়ানি আদালতের দিকে। তমলুক শহরের চারটে প্রধান প্রবেশপথে সেই মিছিল আটকানোর জন্য মোতায়েন করা হয়েছে ব্রিটিশ পুলিশ। বিপ্লবীদের মুখে স্লোগান, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘গান্ধীজি কি জয়’। মেদিনীপুরের তমলুক শহরের উত্তর দিকের গ্রাম হোগলা, আলিনান, জ্যামিট্যা, সোয়াদিঘি, খোসখানা, ডিমারী, বিশ্বাস, ধলহারা, মথুরি, সিউরি থেকে দলে দলে সাধারণ মানুষ রূপনারায়ণ নদের পাড় ধরে হেঁটে আসছে স্লোগান দিতে দিতে। বছরের পর বছর ব্রিটিশ শাসকের অমানবিক অপমানকর অত্যাচার আর সহ্য করা যাচ্ছে না। নিজের দেশেই পরাধীন। সারা শরীরের রক্ত ফুটতে শুরু করেছে জনতার। পায়রাটুঙ্গি খালের কাছে দেওয়ানি কোর্টের পেছনে বানপুকুর পাড়ে বিশাল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অহিংস জনতার মিছিলের পথ আটকে দাঁড়াল। আর এগোলেই গুলি করা হবে। এগোনো চলবে না। সঙ্গে চলল অকথ্য ভাষায় অপমানকর কথা আর অশ্রাব্য গালাগালি। উদ্যত বন্দুকের সামনে তখন আগুনময় উদ্বেলিত জনতা। হঠাৎই মথুরি গ্রামের ১৩ বছরের ছোট্ট রোগা বালক লক্ষ্মীনারায়ণ দাস ছুটে গিয়ে এক ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে উত্তেজিত হয়ে ছিনিয়ে নিতে গেল নেট বন্দুক। সেই ছোট্ট বালককে পুলিশের বীরপুরুষরা বন্দুকের বাঁট আর বেয়োনেট দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে খোঁচা মেরে মেরে খুন করে ফেলল। মৃত্যুযন্ত্রণার বুকচেরা চিৎকার-আর্তনাদ কিছুটা হতচকিত করে ফেলল জনতাকে।

ঠিক তখনই সেই মিছিলের মধ্যে থেকে লোকজন ঠেলে এগিয়ে এলেন ৭৩ বছরের এক বৃদ্ধা। সামনের একজনের হাত থেকে একটা ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা নিজের হাতে নিয়ে নিলেন। সামনের একটা বাড়ির দালানে উঠে হতচকিত জনতাকে আহ্বান করে বললেন, “হয় জয়, না হয় মরণ। হয় এগিয়ে যাব নয় মরব। আমি সকলের আগে থাকব। কেউ পিছিয়ে যেও না। এসো। আর যদি কেউ না আসো তবে আমি একাই এই পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাব। তাতে যদি মর্তে হয় মরব। এসো আমার সঙ্গে।”

সেই মহীয়সী প্রবীণা পতাকাটি নিয়ে শুরু করলেন হাঁটা। দেশমুক্তির এক অদম্য জেদ এই বৃদ্ধার অন্তরে-বাহিরে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসকের পুলিশের হুমকি, “খবরদার, এক পা এগোলেই গুলি করব।” যদিও সেই হুমকি টলাতে পারেনি এই তেজস্বিনী বৃদ্ধার গতিপথ। তাঁর লক্ষ্য পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন, দেশের স্বাধীনতা, একমাত্র স্বাধীনতা। অকুতোভয় সেই বৃদ্ধা বন্দেমাতরম বলতে বলতে এগিয়ে চললেন।

হঠাৎ একটি গুলি ছুটে এসে বিদ্ধ করল বৃদ্ধার বাম হাতটি। রক্তের লাল নদী যেন বইতে লাগল তাঁর বাম হাত-সহ সারা শরীরে। তবু দৃপ্ত পায় এগিয়ে চলতে লাগলেন বৃদ্ধা, অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও পতাকাটিকে ডান হাতে আঁকড়ে ধরে বানপুকুরের পাড় ধরে।

ব্রিটিশের সেনাবাহিনী আবার গুলি চালাল বৃদ্ধার শরীর লক্ষ করে এবং বৃদ্ধার ডান হাতে গিয়ে বিদ্ধ হল সেই গুলি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে দেশমাতৃকার সেই বীরাঙ্গনার পরনের সাদা থান কাপড়টা। গুলিবিদ্ধ জখম দুটি হাত দিয়ে বুকের মাঝে পতাকাদণ্ডটি সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখার মতো সজোরে ধরে রেখে বৃদ্ধা এগিয়ে চলেছেন, মুখে ‘বন্দেমাতরম। কপালে, মুখে, ঘামের বিন্দুগুলো যেন হীরকখণ্ডের জ্যোতির্ময় দ্যুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। রক্তের স্রোত বইছে সারা শরীরে, লাল রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছে পরাধীন দেশের মাটি। বৃদ্ধার কণ্ঠে তবু সেই মুখরিত উচ্চারণ ‘বন্দেমাতরম’, ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’। রক্তাক্ত গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে দু’হাতে দেশের পতাকাটি বুকে আঁকড়ে ধরে বীর দর্পে পরাধীন ভারতবর্ষের বীরমাতৃকা এগিয়ে চলেছেন।  

ব্রিটিশ শাসকের অমানবিক পুলিশকর্মী বিস্মিত, ভীত। তাই তারা আরও ন্যক্কারজনক ঘৃণ্য হিংস্রতার পরিচয় দিল। আবার চলল গুলি। সেই গুলি গিয়ে বিদ্ধ হল সেই অহিংসার প্রতীক প্রবীণা মহীয়সীর কপালের কাছে বাঁ চোখের নীচে। গুলিটা তাঁর মাথার খুলি ফাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আগ্নেয়গিরির মতো শত সহস্র কোটি ধারায় ছিটকে পড়ল রক্তের বন্যা। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। তখনও তাঁর বুকে চেপে ধরা সেই পতাকাটি। রক্তে ভিজে উঠেছে ত্রিবর্ণ পতাকা। নিথর হয়ে পড়ে রইলেন ‘গান্ধীবুড়ি’, ‘বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা’।

সে দিন মাতঙ্গিনী হাজরা ছাড়াও ব্রিটিশের গুলিতে তমলুকের মাটি লাল হয়েছিল মথুরি গ্রামের লক্ষ্মীনারায়ণ দাস, দ্বারিবেরিয়ার পুরীমাধব প্রামাণিক, মাশুরির জীবনকৃষ্ণ বেরা, আলিনানের নগেন্দ্রনাথ সামন্ত, ঘটুয়ালের পূর্ণচন্দ্র মাইতি, তমলুকের নিরঞ্জন জানা, কিয়াখালির রামেশ্বর বেরা, হিজলবেড়িয়ার নিরঞ্জন পাখিয়াল, খনিকের উপেন্দ্রনাথ জানা ও ভূষণচন্দ্র জানা এবং নিকাশীর বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী-সহ বারোজন দেশপ্রেমিক শহিদের তাজা রক্তে।

মাতঙ্গিনী হাজরার জন্ম ১৮৭০ সালে তমলুক থানার হোগলা গ্রামে। বাবা ছিলেন গরিব কৃষক ঠাকুরদাস মাইতি। বাবা ঠাকুরদাস মেয়েকে ডাকতেন ‘মাতু’ বলে। বারো বছর বয়সে মাতঙ্গিনীর বিয়ে হয় আলিলান গ্রামের ত্রিলোচন হাজরার সঙ্গে। ১৮৮৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি স্বামীহারা হন। সাধারণ কৃষক বাড়ির সন্তানহীনা, নিরক্ষর, বাল্যবিধবা ছিলেন তিনি। খুব সাধারণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অসাধারণ, অনন্যা। তাই তিনি স্বপাকে আতপচালসিদ্ধ আর নিরামিষ আহার করতেন। থাকতেন তাঁর স্বামীর বাড়ির এক গোলাঘরে। ১৯৩০ সালে গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান ও লবণ আইন আন্দোলন মাতঙ্গিনীকে অনুপ্রাণিত করেছিল দেশসেবা ও জনসেবার মহান ব্রতে। তিনি নিয়োজিত করেছিলেন নিজেকে দেশ ও দেশের মানুষের কাজে। গান্ধীজির মতোই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন মাতঙ্গিনী। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘গান্ধীবুড়ি’। দেশের মানুষের বলিষ্ঠ অনুপ্রেরণা এবং বন্ধু।

প্রসঙ্গ ক্রমে জানাই, বর্তমানের বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, তমলুকেরই সন্তান ড. মণি ভৌমিক তখন বারো বছরের এক গ্রাম্য বালক। সেদিনের সেই অতি সহজ সরল কপর্দকশুন্য মাতৃময়ী বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন মণি ভৌমিকের বাল্য বয়সের বন্ধু। তাঁর নিজের বর্ণনায়, “তাঁর বাবার বাড়ির অবস্থা ভালো ছিল না। তিনি আঠারো বছর বয়সে বিধবা হওয়ার পরে ধান ভাঙার কাজ করে, একটি ঝুপড়ির মধ্যে থেকে তাঁর জীবন ধারণ করতেন। আমি তখন হাড় জিরজিরে নিঃসঙ্গ গরিব এক বালকমাত্র। কিন্তু স্নেহমমতার দৃপ্ততায় এবং দীপ্ততায় মাতঙ্গিনী হাজরা হয়ে উঠেছিলেন আমার বন্ধু এবং উপদেষ্টা।”

আজ থেকে ৭৫ বছর আগে মেদিনীপুরের মাটিতে এক বীরাঙ্গনা অকুতোভয় মহীয়সী নারীর যে দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ দেখেছিল ব্রিটিশ শাসক, তাতে তারা উপলব্ধি করেছিল, এ দেশে আর বেশিদিন তাদের অত্যাচার চলবে না। মাত্র পাঁচ বছর পরেই ভারত ছেড়ে তাদের চলে যেতে হয়েছিল – ভারতবর্ষ পেয়েছিল স্বাধীনতার আস্বাদন। শহীদমাতৃকা মাতঙ্গিনী হাজরার বলিদানের আজ ৭৫তম পবিত্র বছরে এবং দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা বলতে পারি- ওগো আমাদের বীরব্রতী শহিদ জননী, মাতঙ্গিনী তোমার আঁচলে বাঁধা রয়েছে – যুগযুগান্ত ধরে বাঁধা থাকবেই আমাদের জন্ম জন্মান্তরের রক্ত ঋণ, যা অপরিশোধ্য চিরকাল, চিরদিন।

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here