giগালিব ইসলাম:

ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে, তিন তালাক নিয়ে আরএসএস-বিজেপি ধর্মযুদ্ধ শুরু করেছে। এ নিয়ে কেন্দ্র কি কোনও খসড়া তৈরি করেছে আজ পর্যন্ত? সবাই জানেন, কেন্দ্র তা করেনি। সমাজব্যবস্থাই যেখানে অসম বিকাশের শিকার, যেখানে এখনও হিন্দু সমাজ হিন্দু কোড বিলের সুবিধা থেকেই বঞ্চিত, সেখানে তিন তালাক নিয়ে আরএসএস-বিজেপি যা বলছে, তাতেই সন্দেহ বাড়ছে। আধা-সামন্ততান্ত্রিক ভূমিব্যবস্থায় নারী, গোটা সমাজের নারী, চূড়ান্ত ভাবে ভূমির অধিকার থেকেই বঞ্চিত। কারণ ভূমিতে পুরুষের আধিপত্য স্বীকৃত। এই স্বীকৃতি পুরুষের ভূমি উৎপাদনে, মূলত কৃষিতে পুরুষই শেষ কথা। রাষ্ট্রও পুরুষকে মান্যতা দিয়েছে। এই চিত্র সমাজে সর্বজনীন। নারী যত দিন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সেকেন্ড জেন্ডার থাকবে, সমানাধিকারের প্রশ্নে আইন, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, শাসকদল, কেউই নারীকে সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে না।

ছোট্টো উদাহরণ দিই। পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার আন্দোলন হয়েছে। পুরুষ আর নারীরা কতজন ভাগচাষি, ক্ষেতমজুর, খাস জমির পাট্টাহোল্ডার আছেন? কার শতাংশ কত? অধিকারের সূত্রে নারী যদি ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তা হলে সেই নারীর অস্তিত্ব কতটুকু? ধরুন এক জন নারী তিনি বর্গাদার, তিনি কৃষি উৎপাদনের সঙ্গেই আছেন, তিনি কিন্তু হঠাৎ তিন তালাকের শিকার হবেন না। কিংবা ওই মহিলা স্বামীর জমির সঙ্গে আইনগত ভাবে জড়িত থাকলে দেখা যাবে, তাঁকে তালাক দিতে স্বামী-শ্বশুর-আত্মীয়রা তেষট্টি বার ভাববে!

তিন তালাক বা যত্রতত্র তালাক রাষ্ট্র আইন করে বন্ধ করে দিলেই সুরক্ষার বর্মে নারী চলে যাবে, এ ধারণার বাস্তবতাও ক্ষীণ। আইনের ব্যবসায়িক মূল্যে নারী কি বারগেন করার ক্ষমতা রাখে? এক জন নারী তালাকপ্রাপ্তা হলে ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষার জন্য আইনি পরিষেবা, তাঁর সার্বিক নিরাপত্তা কে দেবে? নিজের তো কিছুই নেই। অর্থাৎ, নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রথমেই দরকার ভূমিতে তার অধিকার সুনিশ্চিত করা। আরএসএস-বিজেপির মতো কট্টরপন্থী পুরুষকেন্দ্রিক ধর্মীয় আধিপত্যবাদী দলের পক্ষে কখনোই ভূমিতে নারীর অধিকারের জায়গাটা সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত করেনি। করবে এমন আশাও দূরাশা। তাই হিন্দু কোড বিল থেকেও হিন্দু নারী কতটুকু সুরক্ষা পেয়েছে? আইন নিয়ে নারী ধুয়ে খাবে? যেখানে সমাজে ভূমিব্যবস্থাটাই আধা-সামন্ততান্ত্রিক? কতগুলো তথ্য দিয়ে এ সবের কিছুই কাজে আসবে না বলা বাহুল্য।

সমাজে সমস্ত সম্পর্কের মধ্যে জমি ও যৌনতার সম্পর্কই মৌলিক ও প্রধান দ্বন্দ্ব। একটি পরিবার থেকে একটি নারী অন্য একটি পরিবারে আসে প্রধানত যৌনতার সূত্রে। এর সঙ্গে যে জমির সম্পর্কটাই প্রবল থেকে গেছে, তা সব সময়ই গুরুত্বহীন বিবেচিত হওয়ায়, নারীর অধিকারটা গোড়া থেকেই দুর্বল ও অমীমাংসিত। অর্থাৎ, পুরুষপ্রধান সমাজে আগে ভূমিতে নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নারীর যৌন অধিকারের সঙ্গে নারীর সম্পত্তির, বিশেষত জমির অধিকারকেই সুরক্ষিত করতে হবে।

জনসংখ্যায় নারী অর্ধেক হয়েও তার অস্তিত্বের এই ভগ্ন দশার প্রধান কারণ তিন তালাক নয়। তিন তালাক আসলে প্রধান দ্বন্দ্বের অপ্রধান দিক মাত্র। সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকে অপ্রধান দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা আজ সামনে এনেছে আরএসএস, বিজেপি ও মুসলিম সমাজের স্বঘোষিত মোড়লরা। বহু গবেষক, সমাজসেবী, মুসলিম সমাজের নারীমঞ্চ ইদানীং জেগেছে। নানা আলোচনা-সমালোচনায় মুখর হচ্ছে। এটা খুবই ইতিবাচক। দেখা যাচ্ছে, তিন তালাক, যথেচ্ছ তালাক, তালাকব্যবস্থা ব্যবহারের প্রশ্নে পুরুষের আধিপত্য ও আধিক্যের ফলে নারীর অধিকার ভুলুন্ঠিত হচ্ছে। এ সব সত্য। কিন্তু এটি হল সত্যের অপ্রধান দিক। ধর্ম তো জীবনের নিয়ন্তা হতে পারে না। ধর্ম কেউ মানতে পারেন, আবার না-ও পারেন। কিন্তু নারীর অধিকার, সর্বাগ্রে ভূমিতে  অধিকারের প্রশ্নে নারীকে সুরক্ষিত করতে হবে। এটাই হওয়া উচিত প্রধান দাবি। বিবাহে যৌনতা যেমন প্রধান শর্ত, তেমনি জমির অধিকার হোক আর একটি প্রধান শর্ত। এই দুই শর্ত নারীর সুরক্ষার প্রশ্নে যথাযথ বিবেচ্য না হলে শুধু আইনি অধিকার মানে হল, টিকিট হাতে ট্রেনশূন্য প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা। যৌনতা না থাকলে, বিবাহের পর নারী যেমন পুরুষ ত্যাগ করতে পারে, পুরুষ যেমন নারী ত্যাগ করতে পারে, তেমনি সম্পত্তির প্রশ্নে, নারীর স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা একান্তই জরুরি। শরিয়ত একটি সামন্তবাদী শাসন-যুগের সংবিধান। আজ প্রায় অচল। মনুর বহু আইন যেমন অচল। শরিয়ত পরিত্যাগ জরুরিও। কিন্তু তার বিকল্প এটা হতে পারে তখনই যখন রাষ্ট্র নারীকে জমি বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সুরক্ষিত করবে। বরং দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রযন্ত্র নারীকে এখনও প্রান্তশক্তিতেই রাখতে চায়। এই ভ্রান্তি চিহ্নিত হোক। নারী সুরক্ষিত হোক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here