modi-cartoon
ব্যঙ্গচিত্র: চিরঞ্জীব পাল
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

বাজারে এখন একটা কথা খুব চলছে- মোদীনোমিক্স। খোলসা করার আগেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটা আসলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আবিষ্কৃত এ দেশের নতুন ইকনোমিক্স। দুইয়ে মিলে মোদীনোমিক্স। দেশবাসীকে কোন দিকে নিয়ে চলেছে এই চটকদারি আর্থিক নীতির প্রয়োগ?

সেভিংস অ্যাকাউন্টে গত ৫৫ বছরের সর্বনিম্ন অর্থ সংগ্রহের রেকর্ড গড়েছে এ দেশের ব্যাঙ্কগুলি। ২০১৭-‘১৮ আর্থিক বছরের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে এমনটাই জানিয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া। অথচ ২০১৬-‘১৭ অর্থবর্ষে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছিল সেভিংস অ্যাকাউন্টে। কেন এত অদলবদল?

কারণ জানতে পিছোতে হবে বেশ কিছুটা সময়। ২০১৬-র ৮ নভেম্বর রাত ৮টায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর তথাকথিত নোটবন্দির পর গোটা দেশ দাঁড়িয়ে পড়েছিল ব্যাঙ্কের লাইনে। কিন্তু বছর ঘুরতেই টাকা তোলার হিড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যাঙ্কের এই খাতে অর্থ সংগ্রহ। সাধারণ মানুষ কিছুটা আতঙ্কে, আবার কিছুটা বিরক্ত ও হতাশ হয়ে নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্ট থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নেন। ঠিকানা লাগান পোস্ট অফিসের মেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্প, মিউচুয়াল ফান্ড অথবা অনিশ্চয়তার শেয়ার বাজারে। মোদী বলেছিলেন, আর্থিক সংস্কার হবে। আয়করহীন টাকার টুটি চেপে ধরা হবে। আর্থিক দুর্নীতি লেজ গুটিয়ে পালাবে। ইত্যাদি। তাই তিনি দেশবাসীকে ব্যাঙ্কে যেতে বলেছিলেন।

আরবিআইয়ের সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০১৭-‘১৮ আর্থিক বছরে ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগের পরিমাণে নিছক থোক টাকা জমার হার বেড়েছে মাত্র ৬.৭ শতাংশ। যা ১৯৬৩ সালের পর থেকে এখনও পর্যন্ত সব থেকে কম। অথচ, ডিজিটাল লেনদেনের মতো সময়োপযোগী শর্তকে সামনে রেখে মোদী দেশবাসীকে বলেছিলেন, বালিশের তলায় টাকা না লুকিয়ে রেখে ব্যাঙ্কে যান।

শিশু কৃষ্ণ অবশ্য সহচরদের উদ্দেশে উলটোটাই বলেছিলেন। খতরনক অগাসুর ঘাপটি মেরে পড়ে রয়েছে পাহাড়ের রূপ ধরে। সহচররা দেখে বলল- বাহ, কী সুন্দর গুহা। চল্‌ ওখানে খেলতে যাই। কিছুটা পিছন থেকে কৃষ্ণ সহচরদের উদ্দেশে চিৎকার করল- “মিত্রোঁ, গুফাও মে মত যাও…”।

তারা শোনেনি। গুহা যে আদতে মরণগুহা, তা টের পাওয়ার পর সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না তাদের কাছে। তবে কৃষ্ণের ক্যারিশমায় সে দিন অগাসুর বধ হয়েছিল। প্রাণে বেঁচেছিল সহচরেরা। কিন্তু ভারতবাসীর কী হবে?

এ ক্ষেত্রে সরাসরি বলতে হয় অদূরদর্শিতার অভাব। শুধু এই একটি কারণেই নিছক চমকের জন্য যে নোটবন্দি-খেলা আয়োজিত হয়েছিল, তা আর কারও বুঝতে বাকি নেই। সম্প্রতি আরবিআই রিপোর্টে জানিয়েছে, নোটবন্দির আগে বৈধ হিসাবে বাজারে থাকা ৫০০ ও ১,০০০ টাকার পুরোনো নোটের ৯৯.৩ শতাংশ ফের ঢুকে পড়েছে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে। এ কথা ঠিক, মোদী দেশবাসীকে ব্যাঙ্কে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু ব্যাঙ্কগুলি তখন কি চলে যায়নি অগাসুরদের দখলে?

এমন প্রশ্ন ওঠা যতটা না স্বাভাবিক ততটাই প্রাসঙ্গিক। তা না হলে এত কালো/আয়করহীন নোট কে গিলে খেল?

২০১৬-র নোটবন্দির পর ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে সঞ্চয়ের পরিমাণের হার বেড়ে গিয়েছিল ১৫.৮ শতাংশ। কিন্তু পরের বছর মাত্র ৬.৭ শতাংশ। ১৯৬৩ সালের পর থেকে এতটা খাটো হার আর দেখেনি ব্যাঙ্কগুলি। তা হলে টাকা যাচ্ছে কোথায়?

  • নোটবন্দির পর রাষ্ট্রায়ত্ত লাইফ ইনসুরেন্স কোম্পানি (এলআইসি‌)-র প্রিমিয়াম সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে ১৪২ শতাংশ। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক নোটবন্দির মাসে সংগহীত রেকর্ড প্রিমিয়ামের পরিমাণ পরে কমতে থাকে, কিন্তু এলআইসির ভাঁড়ারে গচ্ছিত সেই অর্থ তো মেয়াদ পূরণের আগে গ্রাহকের হাতে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু সংস্থা সেই টাকা বাজারে খাটিয়ে মোটা মোটা লাভের অঙ্ক ঘরে তুলতেই পারে।

  • মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ বেড়েছে ২২ শতাংশ। ২০১৭ সালে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৭ লক্ষ কোটি টাকা। শুনে মাথা ঘুরতে পারে কারণ, এটা ছিল আগের বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা (আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ)। আধুনি মোদীনোমিক্সের বড়োসড়ো একটা জায়গা দখল করে রেখেছে এই মিউচুয়াল ফান্ড।

  • শেয়ার বাজারও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। নগদ টাকা তো বটেই, সোনা অথবা রিয়াল এস্টেটে টাকা রাখা এখন ততটা নিরাপদ নয়। ফলে আইনি পথে অনিশ্চয়তায় ঠাসা শেয়ার বাজারে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষও। শেয়ার বাজারের সূচক সেনসেক্স বা নিফটি ফিফটির রেকর্ড বৃদ্ধির নেপথ্যেও রয়েছে অদৃশ্য হাতছানি।

  • এ মাসের শুরুতে শেয়ার বাজারের সূচকগুলি যখন সর্বকালীন সেরা উচ্চতায় তখন বহৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি বাজার থেকে তুলে নিয়েছে ২৮ হাজার কোটি ডলার, সেখানে এ দেশের বিনিয়োগকারীরা অবিশ্বাস্য ভাবে বাজারে ঢেলেছেন ১০ হাজার কোটি ডলার।

  • প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনায় যে জিরো ব্যালান্সের অ্যাকাউন্ট খোলানো হয়েছিল তার একটা বড়ো অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে ব্যাঙ্কমুখো করে তোলার জন্য মোদীর এই আহ্বানের নেপথ্যে ছিল ডিজিটাল লেনদেনকে বিকল্পহীন করে তোলার প্রয়াস।

পুনশ্চ: মোদী কিন্তু দেশবাসীকে ব্যাঙ্কে যেতে বলেছিলেন!

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন