saibal-biswas শৈবাল বিশ্বাস:

বিতর্ক ১

বেঁচে থাকতে কম বিতর্কে জড়াননি সিস্টার নিবেদিতা। বিবেকানন্দর সঙ্গে অভিমানী সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল উত্তর ভারত সফরের সময়। গুরুর মৃত্য‌ুর পর গুরুভাইদের সঙ্গে তাঁর বেশ দূরত্ব তৈরি হয়। স্বামী ব্রহ্মানন্দের নির্দেশে্ সিস্টার কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই সে কথা জানিয়েছিলেন। তার পর বাংলার বিপ্লব প্রয়াসে তাঁর সম্পর্ক থেকে শুরু করে তাঁকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের মাথাব্য‌থা — সবটাই এক মহাবিতর্কিত অধ্য‌ায়।

কিন্তু মৃত্য‌ুর এতদিন পরেও যে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়বে না তা কে জানত।

সম্প্রতি অত্য‌ন্ত ঘটা করে বাগবাজারের ১৬এ বোসপাড়া লেনে নিবেদিতা কলকাতায় এসে ১৮৯৮-এ যে বাড়িতে উঠেছিলেন সেই বাড়িটির উদ্বোধন হল। আসলে সিস্টার নিবেদিতা কলকাতায় প্রথম যে বাড়িতে এসে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করলেন সেটি ছিল ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের একটি একতলা বাড়ি। অথচ কলকাতা পুরসভা যে বাড়িটি ২০০৫-এ অধিগ্রহণ করেছিল সেটি হল ১৬এ বোসপাড়া লেন। বাড়ির মালিক প্রবীর বসাক এই অধিগ্রহণ করা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেন এবং ১৬এ বোসপাড়া লেন এক বাড়ি নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়ে অধিগ্রহণ করলে আইনি লড়াইও খুব বেশি দূর গড়াতে পারে না। সরকারের তরফে এবং সারদা মিশনের তরফে যুক্তি দেওয়া হয় ১৬এ নম্বরে কোনো বাড়ি ছিল না। ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনকেই ১৬এ বলে চালানো হচ্ছে। অন্য‌দিকে প্রবীরবাবু এবং এলাকার প্রবীণ নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেন অবশ্য‌ই ছিল এবং সেটি গিরিশ অ্য‌াভেনিউ হওয়ার সময় ভাঙা পড়েছে। নিবেদিতা বোসপাড়ার অন্য‌ যে বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ছিলেন সেই ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনও গিরিশ অ্য‌াভেনিউ হওয়ার সময় ভাঙা যায়। কোনোক্রমে গিরিশ ঘোষের বাড়ির একটু অংশ রাস্তার মাঝ বরাবর সংরক্ষণ করা হলেও ১৬ এবং ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেন সংরক্ষণ করা হয়নি। কিন্তু বাঙালির স্মারক চাই। সেই স্মারক-প্রীতির অতি উৎসাহে ১৬এ বাড়িটিই এখন ১৬ নম্বর হয়ে গিয়েছে। পুরসভার নথিতে যদিও ১৬ নম্বর আর ১৬এ নম্বরের একই দেহে বিলীন হওয়া সংক্রান্ত কোনো নথি নেই।

২০১৩ সালের ১৬ মার্চ বাড়িটি রাজ্য‌ সরকার সারদা মিশনের হাতে তুলে দেয়। এই বাড়িটির সামনেই আগামী ১২ থেকে ১৪ নভেম্বর সারদা মিশন ও প্রকাশনা সংস্থা সূত্রধরের উদ্য‌োগে নিবেদিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।

১৬এ বোসপাড়া লেনের পূর্বতন মালিক প্রবীরবাবু শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘লেটার্স অফ সিস্টার নিবেদিতা’ এবং নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত লিজলে রেমন্ডের লেখা ‘দ্য ডেডিকেটেড’ বইদুটিকে প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। এই দুটি বইতেই বারবার বলা হয়েছে নিবেদিতা বাগবাজারে যে দুটি বাড়িতে ছিলেন সে দুটি হল ১৬ ও ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেন। জোসেফিন ম্য‌াকলয়েড ও মিস অ্য‌ালিস ল্য‌াঙফেলোকে লেখা চিঠিতে সিস্টার নিবেদিতা একবারও বলেননি তিনি ১৬এ বোসপাড়া লেনে থাকেন। তাঁর চিঠিতে ঠিকানা হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে ১৬ ও ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেন। ১৮৯৮ সালের ১৩ নভেম্বর ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে কালীপুজোর দিন তাঁর স্কুলের উদ্বোধন করেন মা সারদা। কিন্তু এই বাড়িতে তিনি ছিলেন মাত্র সাত মাস। পরে বিদেশ থেকে ফিরে বরাবর ১৭ নম্বর বাড়িতেই বসবাস করেছেন। ওই বাড়িতেই তাঁর স্কুল চলত। ১৯২২ সালে স্কুলটি ৫ নম্বর নিবেদিতা লেন ঠিকানায় উঠে যায়।

হাতে গরম প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সরকার (কেন্দ্র ও রাজ্য‌ উভয়েই) এবং সারদা মিশন ১৬এ-কেই নিবেদিতার বাড়ি হিসাবে কেন চালাতে চাইছেন তা দেবা ন জানন্তি। ১৬এ আর ১৬ নম্বর বাড়িদুটি যদি একই হয় তাহলে তার স্বপক্ষেই বা কী নথি রয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিতর্ক ২

সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে জীবিতাবস্থায় রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পর্ক ছিল না। নিজের মতো করেই তিনি বাংলার সারস্বত সমাজে এবং রাজনৈতিক মহলে মেলামেশা করতেন। তিনি ছিলেন বিপ্লবের অগ্নিকন্য‌া। রামকৃষ্ণ মিশন তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সরকারের রোষে পড়তে চায়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে সারদা মিশন সিস্টারকে মান্য‌তা দেয় এবং বরাবরই তাঁর স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখতে নানা উদ্য‌োগ গ্রহণ করে। অথচ রাজ্য‌ সরকার সিস্টার নিবেদিতার সার্ধ শতবর্ষ উদ্বোধনে যে উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে সেখানে সারদা মিশনের মাতাজিদের স্থান না হলেও রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজরা রয়েছেন। আছেন সাহিত্য‌িক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, অধ্য‌াপক বিশ্বজিৎ রায়, লেখক দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত, সুমন ভৌমিক, এক সাংসদের স্ত্রী প্রমুখ। প্রশ্ন উঠছে সিস্টারকে নিয়ে এতদিন যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের কেন ব্রাত্য‌ করে রাখা হল? আসলে সারদা মিশন বরাবরই রাজনীতির সংশ্রব এড়িয়ে সেবাকার্য চালিয়ে গিয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশনের মতো রাজনীতিবিদদের প্রতি এতটা ঔদার্য দেখাতে পারেনি। তাই হয়তো সরকারি কাজে তাদের জড়ানোর স্পর্ধা সরকার দেখাতে পারেনি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here