মৌসুমি বিলকিস

দু’দিনের জনতার সাহিত্য উৎসবে (দ্বিতীয়) সব মিলিয়ে হল এক মিশ্র অভিজ্ঞতা। প্রেম, দ্রোহ, প্রতিরোধ, যৌনতা, বিতর্ক, প্রশ্ন, উত্তর, গান, বাজনা মিলিয়ে চলল উৎসব।

প্রথম দিন উৎসব শুরু হল সূচনা-প্রস্তাবনা দিয়ে। লাল-অন এর গান স্বাগত জানালো উপস্থিত অতিথি ও আমন্ত্রিতদের। যে সব পাঠকরা ‘লাল-অন’-এর গান সম্পর্কে অবহিত নন তাঁদের জন্য বলে রাখি এই দলের গান ও বাদ্যে ধরা থাকে দ্রোহের ধ্বনি ও শব্দমালা, কখনও শ্রোতা-পরিচিত সুর ও শব্দে, কখনও শ্রুতি-অভ্যস্ত গণ্ডি ভেঙে আঘাত করতে করতে প্রবল জলস্রোতের মতো এগিয়ে চলে লাল-অন। তার সঙ্গে মিশে থাকা ট্রাম্পেটের ধ্বনি শ্রোতাকে নিয়ে চলে যাপনে মলিন ফ্রেম ভেদ করে।

এদিনের প্রথম আলোচনার শিরোনাম ‘বোল কে লব আজাদ হ্যায় তেরে… ফ্যাসিজম ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাহিত্য’। সঞ্চালক নীলাঞ্জন দত্ত’র মধ্যস্থতায় বললেন ভারালক্ষ্মী, উমা চক্রবর্তী, শাহ্‌ আলম খান। তিনজন অতিথিই আলোচনা করেন নিজেদের লেখায় কী ভাবে উঠে এসেছে ফ্যাসিজম ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা। ‘ভিরাসম’ (Viplava Rachayitala Sangahm)-এর অন্যতম সদস্য ভারালক্ষ্মী ভীমা কোরেগাঁও ঘটনায় গ্রেপ্তার সমাজকর্মী ও লেখকদের ওপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় দমনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অন্যতম এক মুখ। নারীবাদী উমা চক্রবর্তীর কলমে পিতৃতন্ত্রের বিপক্ষে জেহাদ ঘোষিত হয়। এক বিশেষ সময়ের প্রান্তিক মানুষের স্বর তুলে ধরেন তিনি (উনিশ শতক)। শাহ্‌ আলম খান তাঁর উপন্যাস ‘ম্যান উইথ দ্য হোয়াইট বিয়ার্ড’-এ তুলে ধরেন শিখ দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি। ডাক্তারি বিদ্যার শিক্ষক আলম স্বাস্থ্য ও মানবাধিকারের পক্ষে লিখে চলেন।

এর পরেই ছিল ‘দ্য বিগ আদার’-এর পারফরম্যান্স। জিপসি জ্যাজ ধারা সঙ্গী করে কলকাতার এই ব্যান্ড মনে করিয়ে দিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনা-কালীন স্থিতিহীন জীবনের অনুষঙ্গ, যুদ্ধ-পরিস্থিতি পিড়িত সম সময়কেও। উল্লেখ্য যে উৎসবের এই পর্বে পারফর্ম করার কথা ছিল বাংলাদেশের ‘লীলা’ দলের। দলের মুখ্য গায়ক অরূপ রাহি ভিসা না পাওয়ায় বঞ্চিত হলেন শ্রোতা। শ্রোতার মাঝে ‘ঝিরঝিরিয়ে বইতে’ চাওয়ার ইচ্ছে ব্যাহত হল, ‘যৌবন চঞ্চল ঠোঁটের বাক্য’ হল অবদমিত।

পরবর্তী আলোচনার বিষয় ছিল ‘মোদের কোনও দ্যাশ নাই: উচ্ছেদ বিরোধী সাহিত্য’। সন্মিত চ্যাটার্জির সংযোজনায় অতিথি ছিলেন মলয়কান্তি দে, হাফিজ আহমেদ, রঞ্জনা পাঢ়ি। প্রথম দুজন বক্তা আসামের সাধারণ জনগণের ওপর এনআরসি-র অভিঘাত দেখেছেন অতি ঘনিষ্ঠভাবে। মলয়কান্তি দে থার্ড থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত। হাফিজ আহমেদ ‘মিয়া সাহিত্য আন্দোলন’-এর প্রতিনিধি। মিয়া জনগোষ্ঠীর উৎপীড়িত জীবনের আখ্যান প্রসারিত করে দিয়েছেন বিশ্বময়। সোশ্যাল মিডিয়া হাতিয়ার করে ‘আরব বসন্ত’-র আগুন জ্বেলেছেন। রঞ্জনা কথা বলেন মানবাধিকারের সপক্ষে। অন্ত্যজ মানুষের জীবন, লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য বিচলিত করে তাঁকে।

বলা প্রয়োজন যে এই বিভাগের আমন্ত্রিত অতিথি পাকিস্তানের বিশিষ্ট কবি ও অনুবাদক আফজল আহমেদ সইদ এবং এদিনের প্রথম বিষয়ের বক্তা একই দেশের কবি তনভির আনজুম ভিসা না পাওয়ায় উৎসবে যোগ দিতে পারেননি।

এদিনের শেষতম বিষয় ছিল ‘কুচকাওয়াজের তলায় আছে গানের ডাইনামাইট: আত্ম নির্ধারণের আখ্যান’। নিশা বিশ্বাসের সংযোজনায় জমে উঠলো আলোচনা। ‘প্রিজন নাম্বার হান্ড্রেড: অ্যান অ্যাকাউন্ট অব মাই ডেজ অ্যান্ড নাইট ইন অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিজন’ গ্রন্থে ‘হুরিয়ত’-এর প্রতিষ্ঠাতা  সদস্য আনজুম জামারুদ হাবিব জানিয়েছেন তাঁর বন্দি জীবনের দিনলিপি। এদিনের আলোচনাতেও উঠে এল সেই দিন ও রাতের আখ্যান, কাশ্মীরি হিসেবে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া জীবন। অথচ পোটা (The Prevention of Terrorism Act) আইনে ‘ভুল সময়ে ভুল জায়গায়’ থাকার জন্য গ্রেফতার হন তিনি। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে এই আইন কিভাবে নাগরিক অধিকারের পরিসর সঙ্কুচিত করে দিচ্ছে তা নিয়ে দেশ জুড়ে সচেতন নাগরিকরা প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন, যেভাবে আফস্পা (Armed Forces (Special Powers) Acts) নিয়েও উঠেছে সমালোচনার ঝড়। রাষ্ট্রের দমননীতি কীভাবে কাশ্মীরের সাধারণ জনজীবন বিদ্ধস্ত করে দিচ্ছে, কীভাবে সাধারণ নাগরিক চিহ্নিত হচ্ছেন ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে, কীভাবে একেকটি গ্রাম হয়ে উঠছে পুরুষহীন, সেই অভিঘাতে পর্দানসিন মেয়েরাও প্রতিবাদে দল বেঁধে রাস্তায় নেমে আসছেন, খুলে যাচ্ছে নারী আন্দোলনের হাড় হিম করা এক নতুন দিগন্ত, যা ‘নারী’ নয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষতম রাস্তা—আনজুমের আলোচনা আলোকপাত করে সেদিকেও। শহরের নিরাপদ দূরত্বে বসে রাষ্ট্রের ছড়িয়ে দেওয়া খবরকে ধ্রুব সত্য হিসেবে ধরে নিই আমরা। কিন্তু না। বেয়নেটের ফাঁক গলে ‘সত্য’ বেরিয়ে আসে। সেনা বাহিনীর জিপের সামনে শক্ত করে বাঁধা কাশ্মীরি যুবক আমাদের চোখের সামনে প্রবল অস্বস্তির মতো জেগে থাকে।

নিয়মগিরির কবি হেমন্ত দলপতির প্রতিদিনের জীবন ও মূল্যবোধের সঙ্গে সম্ভবত কোনোভাবেই সংযোগ নেই আমাদের। ‘তাঁর’ না বলে ‘তাঁদের’ বলাই বোধহয় যুক্তিসংগত। গোন্ড আদিবাসী জন একা বাঁচতে শেখেননি। আমরা জানি না কেন তাঁদের কাছে নোটের থেকেও দামি গাছের একটি পাতা। খবর রাখি না নোটবন্দির সময় সারা ভারত যখন বিপর্যস্ত তার আঁচ কেন পৌঁছায় না তাঁদের জীবনে। তাঁর জনগোষ্ঠী প্রবল ভাষা-জাতীয়তাবাদের শিকার। গোন্ডি ভাষা বিলুপ্ত। এ ভাষার একটিই শব্দ জানেন তিনি, ‘আকো’(ঠাকুরদা)। অবদমনের রক্ত চোখ এড়িয়ে নির্ভীক একটি শব্দ একাকী সৈনিকের মতো বেঁচে থাকে। একটি ভাষা ও সেই ভাষা ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর ইতিহাস অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে। সে কথাই মনে করিয়ে দেয় এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস। ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধেও যেমন দাঁড়ান এই সময়ের রাষ্ট্রীয় দমন নীতির সামনেও ‘আকো’ শব্দটির মতোই জল জঙ্গল মাটির প্রাচীন অধিকার টিকিয়ে রাখতে লড়ে যান এই মানুষেরা।

নাগাল্যান্ডের কবি, গল্পকার, সম্পাদক মোনালিসা চাংকিজা আলোকপাত করেন কীভাবে হারিয়ে গেছে ‘আও’ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়, যে জনগোষ্ঠীর তিনিও এক সদস্য। তাঁদের সংস্কৃতি, পোশাক সবই ‘সভ্য’ জনতার মতো করে তুলতে ধর্ম ও রাষ্ট্র কী প্রবল চেষ্টা চালিয়েছে। তাঁদের সবকিছুই পশ্চিমী আগ্রাসনে ‘সভ্য’ হয়ে উঠেছে। যে প্রচেষ্টা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর ওপর এখনও হয়ে চলেছে। উত্তরপূর্ব ভারত যেন প্রকৃতই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কেননা মুছে দেওয়া হয়েছে তাঁদের নিজস্ব স্মৃতি। আর তাঁর ভূখণ্ডের মাতৃতন্ত্র আসলে এক মিথ। প্রবল পিতৃতন্ত্র যেমন আছে তাঁর জনগোষ্ঠীতে তেমনি তাঁরা মোকাবিলা করছেন সেনা বাহিনীর পিতৃতান্ত্রিক উল্লাস। তাঁর নিজেরই জনগোষ্ঠী নিষিদ্ধ করে তাঁর বই। এর থেকে বড় আর কী প্রমাণ দেবে মাতৃতন্ত্রের মিথ?

উৎসবের দ্বিতীয় দিনের প্রথম বিষয় ছিল ‘চিমনির মুখে শোন সাইরেন শঙ্খ, গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে: খেটে খাওয়া মানুষের সাহিত্য’। শুদ্ধব্রত দেবের সঞ্চালনায় তামিল দলিত লেখক বামা তুলে ধরলেন অস্পৃশ্য নারীর রোজনামচা। ক্লাস, কাস্ট, জেন্ডার এই তিন উৎপীড়নই সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। উচ্চ বর্ণের উদ্ধত তলোয়ারের সামনেও থেমে নেই তাঁর লেখা।

সত্তরের তরুণ স্বশিক্ষিত মহাদেব নস্কর ‘জন্মেছো যখন দাগ রেখে যেও’ চরণের সূত্র ধরে দাগ রাখতে রাখতে ‘দাগী’ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ আনলেন। সত্যি,‘দাগ’ রাগার মহড়া চলেছে এমন গভীরভাবে যে আজ তা পুঁজওয়ালা এক ক্ষতে এসে দাঁড়িয়েছে। সহজে শুকোবার নয়।

বি. অনুরাধা ভাষা রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করলেন। রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা তিনি জানেন না, শিখতেও চান না। জেল জীবনে সহবন্দি মেয়েদের কাছে যেটুকু হিন্দি তিনি শিখেছেন তা মান্য হিন্দি নয়। প্রান্তিক মেয়েদের প্রান্তিক হিন্দিই জানেন তিনি। শিখবেনই তো। সহবন্দি মেয়েরাই যে তাঁর লেখার বিষয়। তাঁর গল্পের চরিত্র তাঁরাই। বন্দি নারীর জীবন আলেখ্যে উঠে আসে দেশের অন্ধকার দিক। সন্তানও জেলের ভেতর কাটায় মায়ের সঙ্গে। স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বোধ ব্যাহত হয় চার দেয়ালের ঘেরাটোপে। সেসব করুণ জীবনের ছবি তাঁর গল্পের ছত্রে ছত্রে।

এই বিভাগের অন্যতম আমন্ত্রিত আল্পনা মণ্ডল বাবার অসুস্থতার কারণে উৎসবে যোগ দিতে পারেননি।

এর পরে চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের বেশ কিছু ছবি দেখিয়ে ছবির বিশিষ্ট ভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করেন সোমশঙ্কর। চিত্রশিল্পীর চিত্রে ঘাম, রক্ত, দ্রোহ, দেখার ভঙ্গি, লাইনের বলিষ্ঠতা ও গতি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনায় সমৃদ্ধ হন শ্রোতা।

‘জাত গেল জাত গেল বলে…: ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পিতৃতন্ত্র বিরোধী সাহিত্য’ বিষয়ের সঞ্চালক ছিলেন সমতা বিশ্বাস। মীরা সংঘমিত্রা তথাকথিত তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি রাষ্ট্রের মানসিকতা নিয়ে কথা বলেন। অনেক নেতা মন্ত্রী কোনও বিষয়ে বয়ান দিতে গিয়ে অকার্যতা বোঝাতে ‘নপুংসক’ শব্দটা আকছার ব্যবহার করেন। লিঙ্গ বৈষম্যের একেবারে শেষ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় একদল মানুষকে। তিনি নিজেকে মেয়ে ভাবতেই ভালবাসেন। প্রচলিত নারী-পুরুষ বৃত্তের বাইরে লিঙ্গ ধারণা বিষয়ে তাঁর দ্বিমত গোপন করেন না তিনি।

তামিল কবি, অভিনেতা, ফিল্ম পরিচালক লীনা মনিমেকালাই সবচেয়ে উপেক্ষিত এক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। মেয়েদের যৌন আকাক্ষা ও তার অসংখ্য শেড আমাদের দেশে এখনও ট্যাবু। আসলে যৌনতার আলোচনা-ই ট্যাবু (ধর্ষণ ট্যাবুহীন!)। অতি দক্ষিণ বা অতি বাম কারও কাছেই বিষয়টি ঠিক গ্রহণযোগ্য নয়। যৌন আকাক্ষার রংরূপ নিয়ে মেয়েরা তাই প্রান্তিকের থেকেও প্রান্তিক। তাই কবিতায় লীনা যখন মেয়েদের যৌন আকাক্ষা পূরণে পুরুষের ব্যর্থতার কথা বলেন তখন অতি দক্ষিণপন্থী পুরুষরাও তাঁর দিকে ছুঁড়ে দেন অমোঘ তীর,

‘How many communist penises do you had in your life?’

যেন পুং লিঙ্গও কমিউনিস্ট। তার নেই কোনও হৃদয়ের বোধ। মেয়েদের যৌনতা সন্তান ধারণেই সীমায়িত যেন। সন্তানহীন মেয়ে তাই এখনও বিদ্ধ হয় প্রশ্নবাণে। শুনতে হয় অক্ষমতার অভিযোগ। আকাক্ষা পূরণের ইচ্ছে প্রকাশ পেলে সে মেয়ে ‘স্লাট’। নিজস্ব শরীর উদযাপনের অধিকার যেন নেই তাঁর। এ এক সীমাহীন একাকী পথ। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর এই প্রবণতার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে লীনা একা লড়ে যান। তাই তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম দেন ‘কুইন অব স্লাটস’।

তেলেগু লেখক নুল্লুরি রুকমিনি তাঁর গ্রামের প্রথম দলিত কন্যা যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে শুরু করেন। তাঁর কথায় উঠে আসে অস্পৃশ্য জীবনের আখ্যান। তিনি দলিত, আদিবাসী ও মেয়েদের অধিকারের সপক্ষে লিখে চলেন।

পরবর্তী পারফর্মেন্স গোকুল হাজরা, প্রাণেশমোহন পাল ও অন্যান্য বাদ্য শিল্পীদের কবিগান। কবিগানের যে জমজমাট পারফর্মেন্স তা বিষয়ের ভারে আক্রান্ত হল। মার্জিনালাইজড শিল্পীদের দ্বিধা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল মঞ্চেও। শহুরে শিক্ষিত শ্রোতার সামনে শিল্পীরা আড়ষ্ট হয়ে থাকলেন। সবথেকে বড়ো কথা কবিগানের যে ফর্ম তা এক ঘণ্টার পরিসরে ধরা সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে গান করেন কবিগানের শিল্পীরা, সারারাত বা সারাদিন। দুজন কবির বিষয়ের স্পষ্টতা না থাকায় পক্ষ বিপক্ষের বিতর্কও জমলো না। তবু শ্রমজীবী মানুষের কবিগানের দল আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলেন।

জনতার সাহিত্য উৎসবে গান গাইছেন গোকূল হাজরা-গোষ্ঠীর শিল্পীরা

উৎসবের শেষতম বিষয় ‘খোলা বাজারের হাওয়া চুপিসাড়ে করে ধাওয়া…: দক্ষিণপন্থী ছদ্ম সাহিত্য’। মানস ঘোষের সঞ্চালনায় বললেন মীরা নন্দা, সব্যসাচী দেব, সুনন্দন রায়চৌধুরী। মীরা নন্দা বিজ্ঞানের ইতিহাসের শিক্ষক। পুরাণের গল্পকে বিজ্ঞান বলে চালানোর অতি দক্ষিণপন্থী ধাপ্পাবাজির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তি সাজান তিনি। পুষ্পক রথকে বিমান বলে চালানোর বা গোমূত্র গবেষণায় রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তি সাজান বিজ্ঞান ইতিহাসের এই শিক্ষক। তিনি বলেন মানুষের মুত্র বা শূয়রের মূত্রর সাথে গোমূত্রের কোন বৈজ্ঞানিক তফাৎ নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সাম্প্রতিক এক নিউজ রিপোর্ট অনুসারে গোমূত্র বিক্রির ব্যবসা পশ্চিমবঙ্গেই সর্বাধিক। দীর্ঘদিন বাম রাজনীতির কারাগার হয়ে থাকা এই বঙ্গে এমন বিষয় হওয়ার কথা ছিল কি?

সব্যসাচী দেব বাংলা সাহিত্যে নকশাল চরিত্র ও মেয়েদের ভাবমূর্তি বিষয়ে অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিকের সৃষ্টি ধরে ধরে আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন ইশ্বর গুপ্ত নারী শিক্ষার বিপক্ষে কবিতা লেখেন, ‘যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে, কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে। তখন ‘এ বি’ শিখে বিবি সেজে বিলাতী বোল কবেই কাবে।।’। তিনি দেখান দেবী চৌধুরানীর মতো ডাকাবুকো চরিত্রও কীভাবে বাঙালি নারীর আর্কিটাইপে পরিণত হয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসেও নকশাল যুবককে দেখানো হয় এক ভয়ঙ্কর রক্তকামী চরিত্র হিসেবে। প্রেক্ষাপটের দ্বন্দ্ব একজন মূল ধারার লেখক কী ভাবে ভুলে যান বা উপেক্ষা করেন তাও উল্লেখ করেন তিনি।

সুনন্দন রায়চৌধুরী সংবাদপত্রের ফিলগুড রিপোর্ট (যা নিয়ে আপত্তি ছিল এক শ্রোতার এবং সে বিষয়ে নিজের মতামতও জানান আলোচক) ও বাংলা ভাষার নব নব বিষয় সম্পর্কে ভাব প্রকাশের সঙ্কীর্ণতার কথা বলেন। অনেক প্রয়োজনীয় শব্দের বাংলাকরণে অক্ষম বাংলা ভাষা নিয়ে তিনি উদ্বেগও প্রকাশ করেন।

দু দিনের এই উৎসবে কোনও কোনও উপস্থাপক ও সংযোজকের হোম ওয়ার্কের অভাব স্পষ্ট বোঝা গেল। ফলত অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জমলো না কিছু আলোচনা।

এছাড়া বস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্ক(কলকাতা চ্যাপ্টার)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবের অঙ্গ ছিল বিভিন্ন প্রকাশনী ও লিটল ম্যাগাজিনের টেবিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের বই সংগ্রহ করতেও দেখা গেছে উৎসাহী পাঠককে।

এই উৎসবের ত্রুটিবিচ্যূতি পর্যালোচনা করে আশা করা যায় পরের উৎসব আরও সফল হবে।

ছবি সৌজন্য: বিএসএন

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here