ওয়েবডেস্ক: বাবু পুতুল না টেপা পুতুল?

যে শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার বুক থেকে, তার গায়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই জুড়ে গিয়েছে অস্তিত্বের সঙ্কট চিনিয়ে দেওয়া এই প্রশ্ন। ঠিক কোন নামে ডাকা হবে মজিলপুরের এই মৃৎশিল্পকে?

প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের কাছে। অবিভক্ত বাংলাদেশের যশোহর জেলা থেকে দত্ত জমিদারদের সঙ্গে অধুনা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মজিলপুরে আসেন কালীচরণ দাস। তিনি জমিদারদের পেয়াদা ছিলেন, সেই সঙ্গে পুতুল ও ঠাকুরও গড়তেন। দুই আঙুলে, নরম মাটি টিপে তৈরি হতো এই পুতুলের কায়া, তাই পরিচিতি টেপা পুতুল নামে। তা হলে বাবু পুতুল নামটা কখন আর কী ভাবে জুড়ে গেল?

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে দু’রকমের পুতুল জনপ্রিয় হয়। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল ও মজিলপুরের পুতুল। মজিলপুরের পুতুলের মধ্যে দেশজ ভাব অনেক বেশি। এই পুতুলের মধ্যে কালীঘাটের পটের প্রভাবও লক্ষণীয়। একসময় বাংলার বাবুদের আচার-আচরণকে কটাক্ষ করে এই পুতুল তৈরি হত বলে ‘বাবু-পুতুল’ নামে এগুলি বেশি পরিচিত। তবে কেবল বাবু নয়, বনবিবি-দক্ষিণরায়ের মতো স্থানীয় দেবদেবী থেকে শুরু করে গণেশ, শিব, কালীয়দমন, গৌরাঙ্গের মতো নানা রূপের পুতুল তৈরি করেন মজিলপুরের শিল্পীরা।

আধুনিক যুগে প্লাস্টিকের খেলনার দাপটে কোণঠাসা মাটির পুতুল। শিল্পীরাও অনেকে এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে বাংলার একান্ত আপন ঐতিহ্যশালী শিল্পকলা। চালচিত্র আকাদেমি তাই চাইছে আধুনিক সময়ের প্রেক্ষিতে এই সাবেক শিল্পের ভিত্তি আরও দৃঢ়ভাবে তৈরি করতে। যাতে অতীতের শিক্ষা থেকে সমৃদ্ধ হয় বর্তমান আর বর্তমানের ছোঁয়ায় অতীত আবিষ্কৃত হয় নতুন রূপে। অগস্ট মাসের ‘বাবু-কালচার’ কর্মশালাতে সেই চেষ্টাই করেছে প্রতিষ্ঠান।

এবং সাড়াও পেয়েছে আশাতীত। ওয়ার্কশপটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন নানা বয়সের ৩২ জন। এর মধ্যে যেমন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা, তেমনই ছিলেন সাধারণ মানুষও। নান্দীমুখ সংস্কৃতি কেন্দ্রে, মজিলপুরের শম্ভুনাথ দাস এবং গৌতম দাসের হাতে সূচনা হওয়ার পরে অংশগ্রহণকারীরা পরিচিত হতে থাকেন এই শিল্পের লুকিয়ে থাকা দিকগুলোর সঙ্গে। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে বাড়তি পাওনা ছিল লোকগান ও পুতুলের অপেরা। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে সবাইকে গাছ দিয়ে বরণ করে নেয় প্রতিষ্ঠান।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিষ্ঠানের তরফে আশাবাদী শিল্পী মৃণাল মণ্ডল। “খুবই ভালো সাড়া এসেছে ওয়ার্কশপ থেকে। এ দেশে এখনও এই মৃৎশিল্প নিয়ে তেমন কাজ না হলেও ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্রিট পেন্টিংয়ে তা উঠে এসেছে”, জানাচ্ছেন মৃণাল। পাশাপাশি তিনি আশাবাদী, এক দিন হয়তো শারদীয়া উৎসবের থিমেও জায়গা করে নেবে এই শিল্প।

নীচের এই গ্যালারিতে দেখে নিতে পারেন সেই শিল্পের কিছু নমুনা। সংগ্রহ করতে চাইলে যেতে হবে সেলিমপুরের প্রাঙ্গন দোকানে। ৬০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০ টাকার মধ্যে পুতুলের দাম, যা আপনার ঘরে নিয়ে আসবে নিখাদ বাংলার সৌরভ!

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন