cover of bengali book 'panch projanmer naxalbari'

প্রসিত দাস

নকশালবাড়ি আন্দোলনের পঞ্চাশ বছরে পঞ্চাশের অধিক বইপত্তরই প্রকাশিত হয়ে থাকবে। সদ্যপ্রকাশিত ‘পাঁচ প্রজন্মের নকশালবাড়ি’ (সম্পাদনা: নীলাঞ্জন দত্ত), যাকে বলে, সেই তালিকায় আরও এক সংযোজন, এমন একটা সন্দেহ মনে জাগাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে বইটা উলটেপালটে দেখতে গিয়ে বোঝা গেল সন্দেহটা নেহাত অমূলক। কেন সেটা ভেঙে বলা দরকার।

এ বই বিভিন্ন প্রজন্মের লেখকদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কথনের সংকলন, বিষয় অবশ্যই নকশালবাড়ি, নানা ধারায়, নানা বর্ণে। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, “এ বই নকশাল আন্দোলনের ইতিহাস নয়, ইতিহাসের আকর।” এক দিক থেকে সবক’টা লেখারর বিষয়ই ‘নকশালবাড়ি ও আমি’। আর নকশালবাড়ির রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কের বিবিধ বৃত্তান্তগুলোর মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে গত অর্ধ-শতকের সামাজিক ইতিহাসেরও কিছু ‘আকর’।

এই সংকলনের প্রবীণতম লেখকের জন্ম তিরিশের দশকের গোড়ায়, আর নবীনতম লেখকের জন্ম আশির দশকের গোড়ায়। কাজেই সোজা হিসেবেই পাঁচ প্রজন্ম হচ্ছে বটে। সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বা নিমাই ঘোষের মতো বইয়ের গোড়ার দিকের লেখকরা রাজনীতিতে এসেছিলেন চল্লিশের দশকের শেষ ভাগে বা পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির ছত্রচ্ছায়ায়, পরে নকশালপন্থী রাজনীতিতে যোগ দেন। আবার ষাটের দশকে সরাসরি নকশাল রাজনীতি করতে-আসা বাপী সেনগুপ্ত বা রানা বোসের ক্ষেত্রে সিপিআই-সিপিএম ধারার সঙ্গে একটা সরাসরি বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছে। এই বিচ্ছেদটাই ছিল সে দিনের মূল সুর – যে বিপ্লবের প্রশ্ন সুদূরপরাহত নয়, ঘটমান বর্তমানের অংশ। সেই ঝাঁঝালো মেজাজটাই তাঁদের লেখায় ধরা পড়েছে। তবে ষাট-সত্তর আর নকশালবাড়ি বলতেই শুধু সিপিআই (এম-এল) নয়। সিপিআই (এম-এল) ধারার বাইরের দু’টো নকশালপন্থী ধারার কথা উঠে এসেছে সুমিত চট্টোপাধ্যায় ও সঞ্জয় মিত্রের লেখায়।

“…চারপাশে দেখতে পাচ্ছি নকশালবাড়ি সম্পর্কে বেশিরভাগ আলোচনা আর ভাবনাচিন্তা মূলত দুটি মেরুতেই আটকে থাকছে। একদিকে রয়েছে, যা করেছি ভুল করেছি।… অন্যদিকে আহা কী মহান ছিল সে সব তুফান তোলা দিন!” আলোচ্য সংকলন এই দুই মেরুর ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে চলে যেতে পেরেছে বহু দূর।

নকশালবাড়ি যে সে দিন সামাজিক মূল ধারারই অংশ হয়ে উঠেছিল সেটা স্পষ্টই বোঝা যায় যখন কলকাতার সাংবাদিকতার জগতে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাবের কথা উঠে আসে সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায়। এ জিনিসটা অবশ্য সাধারণ ভাবে গোটা ষাটের দশকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সুমন্তবাবুর লেখাটার ইঙ্গিতও তেমনই। ‘স্টেটসম্যান’-এর সহ-সম্পাদক ও কলকাতার বিদ্বৎসমাজে উন্নাসিক বলে পরিচিত নিরঞ্জন মজুমদার যে সমর সেনের ‘নাও’ পত্রিকায় বেনামে লিখতেন আর ঠাট্টা করে বলতেন ‘নাও অর স্টেটসম্যান’, সে তথ্য চিত্তাকর্ষক বটে। আবার এই সর্বত্রগামী প্রভাবেরই আরও একটা দিক ছিল পারিবারিক ক্ষেত্রে প্রভাব, যেটা উঠে এসেছে কল্পনা সেনের লেখায় (‘নকশালবাড়ি ও আমার বাড়ি’)।

এই সংকলনের লেখকরা ছোটোখাটো বা কম-গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার খোলস ছাড়িয়ে কোনো আঁকাড়া রাজনৈতিক লাইন বার করে আনতে চেষ্টা করেননি। করেননি বলেই লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগে। বড়োসড়ো সামাজিক-রাজনৈতিক বদলের চালচিত্রের পাশাপাশি উঠে আসে অনেক নজর-এড়িয়ে-যাওয়া ছোটখাটো বদল, যে বিষয়টা খোলসা করেই বলা হয়েছে নীলাঞ্জন দত্তের সম্পাদকীয়তে – “হঠাৎ পাড়ার ‘ঝি-চাকর’রা কাজের বাড়ির ভদ্রলোকদের ‘দাদা’ বা ‘মেসোমশাই’ বলে ডাকতে শুরু করল। কেউ চোখ কপালে তুললে জবাব – ‘দাদারা বলে দিয়েছে, কাউকে বাবু বলবি না।’” এ ভাবেই ষাট-সত্তরের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনেক টুকিটাকি তথ্য ধরা পড়েছে নিমাই ঘোষ বা জর্জ মীরজাফর গোস্বামীর লেখায়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ‘নকশালবাড়ি কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি’-র প্রথম মিটিংয়ে যে সাহিত্যিক বিমল মিত্রও এসেছিলেন সে তথ্য উল্লেখ করে সঞ্জয় মিত্র তাঁর লেখায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইশারা দিয়েছেন। একেবারেই অনালোচিত সত্তরের দশকের রাজনীতির নান্দনিক দিক নিয়ে কিছু ভাবনা উঠে এসেছে সোমশংকরের লেখায় (‘দৃশ্য বদলে যায়’)। রাজনৈতিক লাইন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখার পাশাপাশি পার্থসারথি জানাতে ভোলেননি যে ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের চিন ভ্রমণের কাহিনি পড়ে তিনি প্রথম কমিউনিস্ট চিনের প্রতি আকৃষ্ট হন, কিংবা জয়ন্ত ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, জেলে সেলবন্দি থাকাকালীন তিনি মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিন বার তিনেক পড়েছিলেন। আবার বাঙালি মধ্যবিত্তের মধ্যে নকশালবাড়ি আন্দোলন কত দূর ভীতির সঞ্চার করেছিল সে কথা বলতে গিয়ে অমিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “আমাদের…সমবায় আবাসনের পরিচালকমণ্ডলী একটি সভায় সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে এখানকার তরুণ সদস্যদের জন্য সমবায় আবাসনের হলেই টেবিল টেনিস খেলার পূর্ণ সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হবে – যাতে করে পড়াশুনো ইত্যাদি বিশেষ কোনো কাজ ছাড়া তরুণ আবাসিকেরা অনেকটা সময় এই জাতীয় খেলাধূলোর মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে ক্যাম্পাসের মধ্যেই।” সময়টা ১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাস।

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: খোদ লেনিনকে প্রবল নাড়া দিয়েছিল যে উপন্যাস

এমন নয় যে রাজনীতি নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না, আর সেই সংশয় থেকেই এসেছে আবারও ভিন্ন পথে হাঁটার তাগিদ। এই সংশয়ের সুর আর ভিন্ন পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা নানা আঙ্গিকে ধরা পড়েছে শক্তিপ্রিয় ভট্টাচার্য, পার্থসারথি, সুমিত সরকারের লেখায়। তুলনামূলক ভাবে কম আলোচিত সত্তর দশক-পরবর্তী নকশালপন্থী রাজনীতির আলোচনার জন্য এই লেখাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কোলিয়ারি শ্রমিক থেকে পুরোদস্তুর জনযুদ্ধের কর্মী হয়ে ওঠা লক্ষ্মীর লেখা।

আশির দশক পর্যন্তও নকশালবাড়ির সামাজিক প্রভাব বাতাসে ছিল। কিন্তু তার পর? এই প্রসঙ্গে দয়াবতী রায় লিখেছেন, “তত্ত্বগত ভাবে আজকের পরিস্থিতি কতটা নকশালবাড়ির রাজনীতির সঙ্গে মানান বা বেমানান তা-র তোয়াক্কা না করে ছেলেমেয়েরা আজও সুযোগ পেলে নকশাল হয়ে যায়।” কেন হয়ে যায় তার একটা ব্যাখ্যা তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘এই’, যাকে বলে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘সেই’ নকশালপন্থী রাজনীতির খোঁজ পাওয়ার চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা আর সেই রাজনীতির সঙ্গে নানান টানাপোড়েনের কথা উঠে এসেছে ২০০০ সালের পর রাজনীতি করতে আসা অভিজ্ঞান সরকার আর দেবলীনা ঘোষের লেখায়। বইয়ের শেষ লেখায় দেবলীনা ঘোষ লিখেছেন, “…চারপাশে দেখতে পাচ্ছি নকশালবাড়ি সম্পর্কে বেশিরভাগ আলোচনা আর ভাবনাচিন্তা মূলত দুটি মেরুতেই আটকে থাকছে। একদিকে রয়েছে, যা করেছি ভুল করেছি।… অন্যদিকে আহা কী মহান ছিল সে সব তুফান তোলা দিন!” আলোচ্য সংকলন এই দুই মেরুর ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে চলে যেতে পেরেছে বহু দূর।

এ বইয়ের ছাপা-বাঁধাই নিয়ে প্রকাশক পূর্বালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার মতো কিছু নেই। তবে গোটা বইটাতে বানানের একটা সমতা থাকলে সোনায় সোহাগা হত।

(পাঁচ প্রজন্মের নকশালবাড়ি, সম্পাদনা-নীলাঞ্জন দত্ত, পূর্বালোক পাবলিকেশন, মূল্য-৪২৫ টাকা।)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here