বই চাই গো, বই চাই— কেজি দরে বই বিক্রির ডাক বাইপাসে

0
5804
পায়েল সামন্ত

ইন্টারনেটে সুলভ বিনোদনের যুগে বইয়ের কদর কমেছে। টিভি আর মোবাইল অ্যাপসের দুনিয়া গিলে নিচ্ছে পাঠককুলকে। আর ঠিক তখনই গ্রন্থকীটের দলকে উজ্জীবিত করতে বাইপাসের ধারে বুকটুক-এ জমে উঠেছে কেজি দরে বই বিক্রির পসরা। বইয়ে ছাপা দাম দেখে কমিশন বাদ দিয়ে নয়, জোড়া মলাটে বাঁধা ইংরেজি সাহিত্য থেকে অভিধান বিকোচ্ছে প্রতি কেজি ১৫০-২০০ টাকা দরে।

শহরে পুরোনো বইয়ের আখড়া বলতে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাত নইলে গড়িয়াহাট, গোলপার্ক। ইলিশ কেনার মতো জহুরিসুলভ নজর চালিয়ে চূড়ান্ত দরাদরি না করলে সে বই কিনে আবার সুখ নেই! কালিকাপুরের ‘বুকটুক’ আপনাকে সেই সুখের সন্ধানই দেবে! বই ব্যবসায়ী রমেশ তিওয়ারির বুকটুকের হাত ধরে গত ডিসেম্বর থেকেই শহরে কিলো দরে বই বিক্রির আবির্ভাব ঘটেছে!

বুকটুক-এ গিয়ে দেখবেন, ক্রেতারা একেবারে বইমেলার ঢঙে সব নেড়ে-চেড়ে দেখছেন। কেউ তুলে নিচ্ছেন অস্কার ওয়াইল্ড, কেউ শেক্সপিয়র। কারও হাতে দেখলাম বিল ক্লিন্টন, কোথাও অমর্ত্য সেনের প্রবন্ধ। ছোটদের নজর হার্জের টিনটিনে, একটু বড়দের হ্যারি পটার। বইয়ে ছাপানো মূল্য দেখে মনে মনে কমিশন বাদ দিয়ে দাম হিসেব করার ঝামেলা নেই। দাঁড়িপাল্লা থুড়ি ইলেকট্রনিক মাপন যন্ত্রে চাপাতেই লাল ইংরেজি অক্ষরে সেটি ওজন জানান দিচ্ছে।

বুকটুক-এ বই কিনতে হাজির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র সৌমেন্দু দাস। তিনিই বলছিলেন, ‘সিলেবাস অনুযায়ী সব বই নতুন কিনে পড়তে গেলে ফতুর হয়ে যেতে হত। তাই জেরক্স করতাম, নইলে পুরনো বইয়ের খোঁজ চালাতাম। কম দামে অনলাইনে পুরোনো বই কেনা যেত। এখন বুকটুক-ই ভরসা।’

বুকটুকের তরফে গৌতম ঘোষ জানালেন, ‘ইন্টারনেটমুখী ছেলেপুলেদের বইপত্তর আর টানে না। যদিও বা কাউকে টানে, বইয়ের যা দাম, সে টান আর বেশিকাল অনুভূত হয় না। তাই বুকটুকের লক্ষ্য যতটা সম্ভব কম দামে পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া।’

ইংরাজি সাহিত্যের জেন অস্টেন, টমাস হার্ডি, এডগার অ্যালান পো, চেকভ পাওয়া যাবে মাত্র ৩০০ টাকা প্রতি কেজি। ঝকঝকে সুন্দর করে বাঁধানো বইগুলো। আবার একটু কমের দিকে চাইলে সেটাও মিলবে। কাঠমলাটের পুরনো সংস্করণই প্রতি কেজিতে ১৫০ কিংবা ২০০ টাকাতেও পাবেন বইকি! আবার বইয়ের ‘ব্র্যান্ড নিউ’ গন্ধের জন্য রেস্ত খসানোরও ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে ২০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা। মাথা পিছু মূল্য ধার্য সেগুলোতে। ছোটদের জন্য কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে সচিত্র ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস্’ও।

বইপাড়ার প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকরা অবশ্য বইয়ের ওজন দরে বিক্রির প্রবণতায় ঘাবড়াচ্ছেন না। দেজ পাবলিশিং-এর অপু দে-র বক্তব্য, ‘ওদের বইয়ের মান, কোন প্রকাশকের বই, এ সব বিচার করতে হবে। নতুন বেরোনো বাংলা বই ওজন করে বিক্রি করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে সেটাও যদি হয়, তাতেও বইপাড়ার বই ব্যবসা বিঘ্নিত হবে না।’

কেজি দরে বই নিয়ে মানুষের কেমন উৎসাহ? গৌতমবাবু জানালেন, ‘কলকাতার মানুষ ছাড়াও আসছেন বিদেশিরা। ভিড় করছেন প্রবাসী বাঙালিরাও। লন্ডন থেকে এলিনা বলে একজন ভদ্রমহিলা তো ১০-১২ হাজার টাকার বই কিনলেন। আয়ারল্যান্ড থেকে ১৬ জনের একটা দল এসেছিল। সেখানেও প্রায় হাজার ষোলো টাকার মতো বিক্রি। নাইজেরিয়ানরাও বই কিনেছেন এখান থেকে।’

বিদেশি বা অবাঙালি নয়, ডাল-ভাত খাওয়া গড়পড়তা বাঙালির কি দেখা মেলে এখানে? ইংলিশ মিডিয়ামের দৌলতে বাঙালি আর প্রাক-বিশ্বায়ন যুগের ডাল-ভাত খাওয়ার স্তরে নেই, এটা নিয়ে কেউ দ্বিমত রাখবেন না নিশ্চয়ই। বাঙালির পাস্তা কিংবা কন্টিনেন্টাল ঘেঁষা পাতের মতো হাতেও উঠে এসেছে ইয়ান ফ্লেমিং, ভিক্টর হুগো কিংবা ড্যান ব্রাউন। আগেও এ সব বইয়ের চাহিদা ছিল, কি্ন্তু ভুবনায়নের পর সেই চাহিদা আরও বেড়েছে। বই অর্ডারের প্রায় শেষ হয়ে আসা পেল্লাই ডায়েরি খুলে গৌতমবাবু দেখালেন, এস মজুমদার ১০০ বইয়ের চাহিদা জানিয়ে গেছেন। সৌরভ জানা ট্রাভেল গাইড পেরু চেয়েছেন। বললেন, ‘এছাড়া নিয়মিত খদ্দের দীপবাবু, অর্ণববাবু আর প্রফেসর মৈত্রর মতো কত জনই তো আছেন। সোনারপুরের শিশু নিকেতন স্কুলের কর্তৃপক্ষ এসে ৯ হাজার টাকার বই কিনে নিয়ে গেছেন।’

বুকটুকের কর্মচারী বারুইপুরের রাজু বৈদ্য সোৎসাহে জানালেন, ‘এই তো দীপবাবুর অর্ডার দেওয়া স্টিফেন মেয়ারের ছয় খণ্ড বই হাজির হয়ে গেছে। অর্ণববাবুর লারসনও।’ হাসিমুখে তিনি যোগ করলেন, ‘সিরিয়ালের অভিনেত্রী থেকে পুলিশের বড়োকর্তা কেউ বাদ নেই বই কেনা থেকে। রোজ ২০ থেকে ২৫ কেজির মতো বই বিক্রি হয়।’

এত কিছু সুলভ কেজি দরে দেখেও মনটা যেন খুঁতখুঁত করছিল— কী দোষ করলেন সুনীল-শক্তি-শিবরাম-শীর্ষেন্দু? তাঁদের ঠাঁই নেই কেন? বুকটুক যে তাঁদের জন্যও কিছু ভেবেছে, সেটা বললেন গৌতমবাবুই। বুকটুকের দোতলা তৈরি শেষ হলে সেখানে বাংলা বইয়ের আস্তানা হবে। আসলে পাঠকই তো বাংলা সাহিত্যের খোঁজ করছেন। তাই বন্ধুরা, ১-২ বছরের মধ্যেই হয়তো দেখবেন বুকটুকে ওজন যন্ত্রে চাপানো হচ্ছে সাড়ে চারশো গ্রামের ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’, তিনশো গ্রামের ‘কাঙাল মালসাট’ আর আড়াইশো গ্রামের ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’। সব মিলিয়ে এক কেজি। এর দাম পড়বে শ দুয়েক টাকা। অদূর ভবিষ্যতে সব মিলিয়ে বুকটুক হয়ে উঠতে পারে বুক মল। সে সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলা বইয়ের ব্যবসা বইপাড়ার বাইরে এই নতুন আঙ্গিক পেতে চলেছে। তাই বাঙালি চিতল-পাবদা-চিংড়ি নিয়ে দরাদরি করলেও, ভবিষ্যতে বই নিয়ে পারবে কি?

বইপাড়ার প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকরা অবশ্য বইয়ের ওজন দরে বিক্রির প্রবণতায় ঘাবড়াচ্ছেন না। দেজ পাবলিশিং-এর অপু দে-র বক্তব্য, ‘ওদের বইয়ের মান, কোন প্রকাশকের বই, এ সব বিচার করতে হবে। নতুন বেরোনো বাংলা বই ওজন করে বিক্রি করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে সেটাও যদি হয়, তাতেও বইপাড়ার বই ব্যবসা বিঘ্নিত হবে না।’

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here