(প্রায় চল্লিশ বছর ধরে প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাসে বেঁচে আছেন বাংলা সিনেমার সঙ্গে। শুরু থেকেই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে সফল নায়ক। সাধারণ মানুষের প্রিয় হিরো, পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে অন্য ধারার চলচ্চিত্রেও তিনি সফল অভিনেতা। তাঁর চিত্র-পরিচালনায় তৈরি হওয়া সিনেমাও পেয়েছে বাণিজ্যিক সাফল্য। যদিও কৈশোর থেকে তাঁর বেড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে যে সিনেমার স্বপ্ন তিনি মনে মনে লালন করেছেন, নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন, তা থেকে গিয়েছে প্রায় অধরাই। দূরদর্শনের সংবাদ পাঠক হিসেবে শুরু করে দু’শোর বেশি সিনেমার তারকা হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে চিরঞ্জিত চক্রবর্তী চষে ফেলেছেন বাংলা সিনেমার অন্তরমহল, অলিগলি থেকে বহির্জগত। ‘খবর অনলাইন’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে উঠে এল বাংলা সিনেমার আজ-কাল-পরশুর ফ্রেম-টু-ফ্রেম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম পর্ব।)

বছরের শুরুতেই ‘কিরীটী রায়’ মুক্তি পেয়েছে। এই মুহূর্তে ব্যস্ত ‘চ্যাম্প’ আর ‘বস-২’-এর শুটিং-এ। তারই মধ্যে অবসরে চিরঞ্জিত জানালেন, “সত্তর দশকের শুরুর দিকে, সিনেমা নিয়ে তখন পড়াশোনা করছি। বিদেশের ছবি দেখা, ফিল্ম সোসাইটি, বুনুয়েল, আইজেনস্টাইন, মণি কাউল, সত্যজিৎ, ঋত্বিক দেখতে দেখতে, তৈরি হতে হতে সিনেমা তৈরির কথা ভাবছিলাম। মানিকদার কাছে যেতাম। মানিকদা ছবির স্ক্রিপ্ট দিতেন। বাড়ি নিয়ে আসতাম। স্টাডি করতে দিতেন। হয়ত শৈল চক্রবর্তীর ছেলে বলেই দিতেন। সেই সময় কলকাতা দূরদর্শনে খবর পড়তাম। রঞ্জন মজুমদার বলে একজন নিউকামার পরিচালক একটা ছবি করেছিলেন, নাম ‘সোনায় সোহাগা’। দু’টি পরিবারের সংঘর্ষের গল্প। টিভিতে আমাকে দেখে পছন্দ হল। তরুণ কুমার, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন। ধপধপিতে শুটিং হত। টানা আউটডোর। মেঝেতে খড় বিছিয়ে কম্বল পেতে কুড়ি জনের বিছানা হত, সেখানেই থাকা। ‘৭৫’-এ শুটিং আরম্ভ, রিলিজ হতে হতে ‘৭৯’। সাদা কালো সিনেমার সেটা শেষ যুগ। ‘কুরোসাওয়া-ফেলিনি’র চর্চা করতে করতে “ম্যায় চলা ‘সোনায় সোহাগা’র হিরো বননে”।

  • সেই সময়ে সংবাদ পাঠক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন দীপক নামে, সেখান থেকে চিরঞ্জিত কী ভাবে হলেন?

চির: কমার্শিয়াল সেটআপে যা চালু আছে সেটাকেই লোক চাইবে। যেমন বিশ্বজিৎ, সত্যজিৎ, রঞ্জিত – আমিও তাই বলা যায় পিতৃপ্রদত্ত নামটা তুলে রেখে হয়ে গেলাম চিরঞ্জিত। ন’টা ছবি এক সঙ্গে সাইন করলাম। দ্বিতীয় ছবি ‘সন্ধান’-এ নাম হল। বুঝলাম হিরো হিসেবে আমি অ্যাকসেপ্টেড। আমার বয়স, চেহারা, হাইটের একজনকে দরকার ছিল, যে ‘প্রফুল্ল’-য় ছোটো ভাই হতে পারে, ‘ছোটু’ ছবিতে চকচকে সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট পরা হিরো হতে পারে।

  • চিরঞ্জিত যত বেশি সফল হতে শুরু করল দীপক কি ততটাই ঢাকা পড়ে গেল?

চির: আমি তো বার বার ভেবেছি এ বার দীপক ফিরে আসবে। কিন্তু কমার্শিয়াল সেটআপে প্রথম থেকে কাজ করায়, বড়ো পরিচালকদের ছবি বা ভালো ছবির অফার আসত না। এমন একটা ইমেজ, যে লোকে ভাবত ওই ‘লেভেল’-এর অ্যাক্টরই না। কমার্শিয়ালি খুব সফল, নাচে, দৌড়োয়, চেঁচায়, প্রেম ভালো করে, কিন্তু অভিনয় হয় না। আক্রোশ, অর্ধসত্য, অঙ্কুশ, পার দেখেছি মেট্রোতে গিয়ে। ‘শোলে’ও দীপকই দেখেছে কিন্তু ‘ইউটিলাইজেশন’ করেছে চিরঞ্জিত। বার বার ভাবছি তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, গৌতম, অপর্ণা সেনদের সঙ্গে ফ্রেশ ভাবে শুরু করব। কিন্তু ওই ‘নিয়তি’! দীপক চিরঞ্জিতের গ্লাভস পরে, তার পর চরিত্রটা হয়। অন্তর্বাস চিরঞ্জিত, বহির্বাস চরিত্রটা।


quate_f-2এখন দেবকে যে বড়ো অফারটা দিয়ে ডাকে সেই অফারটা আমাকে দেওয়া হয়নি। ‘বাড়িওয়ালি’ হওয়ার আগে বুম্বাও (প্রসেনজিত) পায়নি। ‘উৎসব’-টুৎসবে মেন রোলে অন্য কেউ, বুম্বা ছোট্টো চরিত্রে। ইন্টেলেকচুয়াল মহল মনে করে ‘আমরা সর্ট অফ অপদার্থ অ্যাক্টর’। ‘বাড়িওয়ালি’-তে পার্ট করল দীপক কিন্তু ডাবিং করল অন্য লোক। আঘাতটা সব সময় থেকেই গেছে। দীপক অতৃপ্তই থেকেছে সব সময়।


  • বিখ্যাত পরিচালকরা আপনাকে চেয়েও পাননি শোনা যায়?

চির: না। তপন সিনহা কখনও ডাকেননি। মৃণালদাও না। মানিকদার সুকুমার রায়ের তথ্যচিত্র ‘শক্তিশেল’-এ করেছি। আমি যখন এসেছি ঋত্বিককে পাইনি। তরুণ মজুমদার বলেছিলেন, ‘পরশমণি’ ছবিতে তাপস পাল হিরো, তাঁর নপুংসক দাদার পার্ট, পছন্দ হয়নি। রিফিউজ করি। অপর্ণা সেন বলেছিল, কিন্তু খুব খারাপ ট্রিটমেন্ট পেলাম। ‘সতী’ ছবিতে একটা ছোট্ট রোল, শাবানা আজমিকে রেপ করবে যে চরিত্রটা। বড়ো ছবি, শাবানা আজমি পার্ট করবে, একটা পার্ট দিলেই বর্তে যাবে। কমার্শিয়াল সেটআপের হিরো তো – যে কোনো পার্ট একে দিয়ে করানো যাবে। পয়সাকড়িও কম। একচল্লিশ দিন ডেট নিয়ে পাঁচ হাজার টাকা দেবে। তখন আমি পার ডে চার হাজার নিতাম। ওই টাকায় পারলাম না। এই ভাবে বার বার ফিরে ফিরে এসেছি।

chranjit-laxman

  • তার মানে নায়ক চিরঞ্জিতই ডাক পেয়েছিল। তাঁকে, তাঁর ইমেজকে ব্যবহার করা যায় যদি এই ভেবে। অভিনেতা দীপক ডাক পায়নি?

চির: এই সব ছবিতে হিরোটাকে লোকে খাতির করে, কিন্তু কাস্টিংটা সে ভাবে করছিল না। এখন দেবকে যে বড়ো অফারটা দিয়ে ডাকে সেই অফারটা আমাকে দেওয়া হয়নি। ‘বাড়িওয়ালি’ হওয়ার আগে বুম্বাও (প্রসেনজিত) পায়নি। ‘উৎসব’-টুৎসবে মেন রোলে অন্য কেউ, বুম্বা ছোট্টো চরিত্রে। ইন্টেলেকচুয়াল মহল মনে করে ‘আমরা সর্ট অফ অপদার্থ অ্যাক্টর’। ‘বাড়িওয়ালি’-তে পার্ট করল দীপক কিন্তু ডাবিং করল অন্য লোক। আঘাতটা সব সময় থেকেই গেছে। দীপক অতৃপ্তই থেকেছে সব সময়। আলটিমেটলি সুযোগটা দিল ‘চতুষ্কোণ’। লোকে বলল, চিরঞ্জিতকে চিনতেই পারছি না। কিন্তু আমি জানি বহু চরিত্র করেছি যেগুলো ভালো, সিকোয়েন্স ভালো। গুলবাহার সিং-এর ‘অবৈধ’-র জন্য বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ড বা প্রথম দিকে উমানাথ ভট্টাচার্যের ‘সন্ধান’। আরও ছবি আছে, যেমন ‘অশ্লীলতার দায়’, ‘সেদিন চৈত্র মাস’। ‘সমর্পিতা’-য় প্রফেসরের চরিত্রটাও ভালো। তবে চিরঞ্জিত হাততালি পেত ‘প্রতীক’, ‘পাপী’, ‘রক্তলেখা’ এই সব ছবিতেই। সিনেমার ইন্টেলেকচুয়ালরা আমাকে সিনেমার ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ব্যাড’ বানিয়ে, ‘ভিলেন’ বানিয়ে রেখেছিল। আটকে দিয়েছিল। তবে আমার অভিজ্ঞতা আমায় ‘মাস’কে চিনতে শিখিয়েছিল। তাদের পছন্দ অপছন্দগুলো বুঝতে শিখলাম। কমার্শিয়াল ছবিটাও বানাতে শিখে গেছি তত দিনে।

  • তাই কি চলচ্চিত্র পরিচালনাও শুরু করেছিলেন?

চির: হ্যাঁ, সেই ভাবেই তখন বেশির ভাগ কমার্শিয়াল ছবির প্রযোজকরাই আসতে শুরু করল। সাতটা ছবির চিত্রনাট্য-পরিচালনা করলাম। সাতটাই হিট করল। নাটক করলাম ‘ঘরজামাই’ – সুপার হিট হল। ‘ঘরজামাই’-এর গল্পটা কিন্তু শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু’ থেকে নেওয়া। পরে সিনেমা হল ‘কেঁচো খুড়তে কেউটে’। এ ছাড়াও ‘নাগপাশ’, ‘স্বীকারোক্তি’ করেছি। রমাপ্রসাদ বণিকের নাটক ও নির্দেশনায় ‘সমর্পণ’ করেছি।

kecho-kurte-keute

  • এই জনপ্রিয় সিনেমা আর আর্ট সিনেমার সঙ্গে ফারাকটা কী মনে হয়? এখন ব্যবধানটা যখন কমে যাচ্ছে, তখন কি পরস্পর প্রভাবিত হচ্ছিল?

চির: ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’টা এখন কমে গেছে। শুধু শিল্পের জন্য নয়। বিক্রিটা খুব প্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। প্রোডিউসাররা যা খরচ করছে তা ফেরত চাইছে, বিক্রি চাইছে। তাই স্টাররা এই সব সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ। কঙ্কনা সেনশর্মার সেলেবিলিটি নেই। সেই হিসেবে অফবিট ছবিতেও এখন কখনও শুভশ্রী কখনও দেব পার্ট করছে। স্টারদের ‘মেজর কাস্ট’ করা হচ্ছে। আমাদের সময়ে এটা ছিল না। স্টার দরকার হলে মুম্বই থেকে আনা হত। এখান থেকে নয়। এখন আর আর্ট সিনেমা বা থিয়েটারের বিশুদ্ধতাটা ও ভাবে রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে কমার্শিয়াল সেটআপ টাকা দিত থিয়েটারেও, সিনেমাতেও। সেটা না থাকলে, স্টার তৈরি না হলে স্টারডমের মৃত্যু হবে। সেটা আর্ট, কমার্শিয়াল কোনোটার পক্ষেই ভালো না। বাড়িতে তিন ভাই আছে, ছোটো ভাই বেহালা বাজায়। বড়ো দু’ভাই বাবার ব্যবসা চালায়। ছোটো ভাই যদি ব্যবসাকে অসম্মান করে, দাদাদের শ্রদ্ধা না করে, বিয়ের পরে বউ নিয়ে পরিবারের বাইরে চলে যায় – তা হলে বেঁচে থাকতে গেলে নানা রকম কাজ করতে হবে। বাড়িতে থাকলে ভাইরা সেই দায়িত্ব নিত। বেহালাটা আর মন দিয়ে হবে না কারণ ওটার সেই কমার্শিয়াল ইউটিলিটি নেই। বাণিজ্যিক ছবি আর অন্য রকম ছবির সম্পর্কটাও সেই রকম।

আরও পড়ুন: এখন যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা নাকি দারুণ অভিনয় করেন: চিরঞ্জিত

(আগামী সংখ্যায় শেষ)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here