মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

ছেলেবেলায় হেমেন রায় পড়িনি, কৈশোরেও না। পুজো কিংবা গরমের সময় মাস খানেকের লম্বা ছুটিতে প্রায় প্রতি বিকেলেই পাড়াতুতো কাকা-জ্যাঠার বারান্দায় বসত গল্পের আসর। ‘যকের ধন’, ‘আবার যকের ধন’ খোঁজার মাঝেই সন্ধে নামত তখন। ওখানেই পরিচয় বিমল আর কুমারের সঙ্গে। স্কুলজীবন শেষ করে কোনো এক লাইব্রেরির পুরোনো বই ঘাঁটতে গিয়ে হাতে এসেছিল ছেঁড়াখোঁড়া একখানা কপি। বাবা মায়েদের নস্টালজিয়ায় সেই প্রথম চোখ বোলানো। আমার ধারণা, চলতি শতকে বড়ো হওয়া খুব কম ছেলে মেয়েই কাকাবাবু-ফেলুদার (ব্যোমকেশের সঙ্গে সখ্য আরও অনেক পরে) বাইরে গিয়ে হেমেন রায়ের হাত ধরেছিল। তাই পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের ‘যকের ধন’ দেখার আগে দর্শক তেমন কিছু করবে, এই আশা করা বৃথা। অতএব মূল গল্পের সঙ্গে এ ছবির তুলনা টানব না।

ছবির প্রথমার্ধ বেশ ভালো। উত্তেজনা রয়েছে টানটান। সাসপেন্স ধরে রাখতে সাহায্য করেছে আবহ। সঙ্গে চমৎকার ক্যামেরার কাজ। খেই হারাল বিরতির পর থেকে। অমন সুন্দর করে বোনা রহস্যের জাল ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই জট পাকিয়ে গেল। জড়িয়ে যাওয়া জাল নিয়ে ধ্বস্তাধস্তি চলল বেশ খানিকক্ষণ। বাংলার দুই দামাল তরুণের গুপ্তধন খোঁজার আড়ালে নীতিবাক্য যদি থেকেও থাকে, তা ছবির চরিত্রদের মুখ দিয়েই বলাতে হবে? দর্শকের বুঝে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর আস্থা নেই পরিচালকের।  ‘গুপ্তধন’-এর হদিশ পাওয়ার পরের অংশটুকু দাঁড়াল না এই অহেতুক নীতিকথার ভারে। বৌদ্ধ দর্শনের সারমর্ম কি আর ট্রেজার হান্টের গল্প নিয়ে বানানো ছবির শেষ কয়েক মিনিটে বুঝিয়ে দেওয়া যায়?

ছবির সংলাপও ছবির মতোই। প্রথম দিকে বেশ ছিপছিপে হলেও গল্প যত গড়িয়েছে, জোর করে হাসানোর অহেতুক চেষ্টা ধরা পড়েছে সংলাপে। প্রিয়াঙ্কা সরকারের চরিত্রটাই রাখা হয়েছিল কমিক রিলিফের জন্য, কিন্তু রিলিফের বদলে বিরক্তির উদ্রেক হয়েছে বারবার। বিমল-কুমার (পরমব্রত এবং রাহুল) জুটি মানিয়েছে ভালোই। ভিলেনরূপী ‘ফেলুদা’ও (করালির ভূমিকায় সব্যসাচী) যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। জায়গা বিশেষে হিরণ্ময়ের (কৌশিক সেন) মাত্রাতিরিক্ত ভাঁড়ামি আসলে চিত্রনাট্যেরই দোষ। যে লোকটা উচেন স্ক্রিপ্ট পাঠোদ্ধার করছেন, দেশি-বিদেশি ভাষা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করছেন, তাঁর মুখ দিয়ে লালমোহনবাবু সুলভ হিন্দি (‘আরে বাবা, চুলকা রাহা হ্যায় তো’) বলানোর প্রয়োজন ছিল কি? অবশ্য গোটা ছবির সিকি ভাগই (তার চেয়ে বেশি বই কম নয়) তো দাঁড়িয়েছে রায় পরিবারের ওপর ভরসা করে। বাবার ‘আবোল তাবোল’ আর ছেলের ‘সোনার কেল্লা’র রেফারেন্স এসেছে ঘন ঘন।

ছবিতে ক্যামেরার কাজ ভালোই। যদিও ডুয়ার্সের নিসর্গ পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ কার্পণ্য হয়েছে। আর গান, আবহ যথাযথ। হলের বাইরে গিয়ে গুনগুন করার মতো নয়। ছবির গল্প যে রকম দাবি করেছে, সে রকমই। তবে হ্যাঁ। ছবিতে রূপম ইসলামের গলায় একটি গান আছে। ছবি দেখে ভয় না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ওটা পুষিয়ে দেবে রূপমের গান। শুনে দেখবেন।

সিনেমার গল্পকে যুগোপযোগী করার বাকি প্রয়াস সফল হলেও যখন তখন ডিমনিটাইজেশনের উল্লেখ অহেতুক। আর হাজার বছরের পুরোনো তিব্বতি গুপ্তধন কিনা শেষমেষ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল উত্তরবঙ্গের নেওড়া ভ্যালিতে? সিনেমার প্রয়োজনে মূল গল্প একটু আধটু বদলে ফেলা দোষের নয়। তবে ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে গল্পের গরু গাছে ওঠালে নিতান্তই হাস্যকর হয়ে ওঠে তা। ঠিক যেমন ছবির একেবারে শেষে দেখা যায় বৌদ্ধ গুহার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সেখান থেকে খসে পড়ল আফ্রিকান চিত্রলিপি খোদাই করা পাথর। বোঝা গেল সিরিজের দ্বিতীয় ছবি বাজারে আসতে বিশেষ দেরি নেই। এ বার কোথায় লুকোনো থাকবে গুপ্তধন? সুন্দরবন? না কাজিরাঙা? নামী বা দামি প্রযোজক পেলে অবশ্য চাঁদের পাহাড়ের দেশেই!

2 মন্তব্য

  1. খুব ভালো লিখলে। ছেলেবেলায় হেমেন্দ্রকুমার গুলে খেয়েছিলাম। সিংহ দমন গাটুলা সর্দারের কথা এখনও মনে আছে। আর মনে আছে হেমেন্দ্রকুমারের স্বকৃত আফ্রিকান ভাষায় মাঝিদের সেই গান, ‘হিদেল তেলো হিতেল তেলো দম্বুজম্বু হোয়াং বো।/ গুদেল ভ্যালাক গুদেল ভ্যালাক, দম্বুজম্বু হোয়াং বো। এই সায়ন্তন মল্লিক দেডা?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here