ঝরতে থাকা শাল-সেগুনের লাল মাটিতে বিষণ্ণ হিংসার কাব্য রচনা করলেন কঙ্কনা

0
968
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

মৃতদেহ বহনের প্রস্তুতি থেকে একটি মৃত্যুর জন্ম অবধি সাতদিনের যাত্রাপথ। আর সেই পথচলার শান্ত বিবৃতিতে মিশে থাকে বাঙালির বড়ো চেনা অধুনা ঝাড়খণ্ডের ম্যালাক্সিগঞ্জ। ‘অধুনা’, কারণ ‘এ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’ যে সময়ের কাহিনি, সেই ১৯৭৮-৭৯ সালে তা ছিল বিহার রাজ্যে। বর্ষশেষ আর শুরু উদ্‌যাপন করতে সেখানে পৌঁছে যায় একটি পরিবার আর বন্ধুরা। শীতের মায়াবী আক্রমণের সুস্বাদ নিতে এমন জায়গা আর কটাই বা!

বাঙালির বড়ো আপন অপর্ণা সেনের কন্যা কঙ্কনা সেনশর্মার প্রথম ছবি বলে কথা। তা সে যতোই মূলত ইংরাজিতে হোক, এই ছবি নিয়ে কিছু আলাপচারি তো না হলেই নয়। সঙ্গে বাংলাও আছে, কিছু হিন্দিও। অপর্ণাকে দেখা না গেলেও, তাঁর কণ্ঠস্বর আছে। আর কাহিনি? কঙ্কনার বাবা মুকুল শর্মার। বাবার কাছে ছোটো থেকে শোনা গল্পটি নিয়ে পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছেন কঙ্কনা।

আর আছে ইয়ং অ্যাডাল্ট শুতু(বিক্রান্ত মাসে)। ১৯ বছর বয়স তাঁর। সদ্য মৃত বাবার সোয়েটার গায়ে বর্ধমানের অর্ন্তমুখী শুতু কী যেন একটা লুকিয়ে রাখে গোটা ছবি জুড়ে। এখনও বড়োদের পৃথিবীতে ঢুকতে পারেনি সে। ব্যক্তিত্ব এমনই, যা দেখে মিমি(চির বিশ্বাসযোগ্য কালকি কোয়েচলিন) বলে ওঠে, ‘তুমি মেয়ে হলেও দারুণ মানাতো’। পুরুষতন্ত্রের খুবচেনা চোখ তাঁর। যে চোখ ছড়িয়ে আছে বাড়ির মালিক-খুদে জমিদার ওপি(ওম পুরী), তাঁর বেড়াতে আসা ছেলে নন্দু(গুলশন দেবাইয়া), নন্দুর স্থানীয় বন্ধু বিক্রমের(রণবীর শোরে) মধ্যে। এমনকি নন্দুর স্ত্রী বনির(তিলোত্তমা সোম) মধ্যেও। আরও আছেন ব্রায়ান। এবং হ্যাঁ। ওম পুরীর স্ত্রীর চরিত্রে তনুজা।

মহুয়ার স্বাদে জারিত ক্ষয়িষ্ণু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কলোনিতে এই অঁসম্বল কাস্টের কাহিনি বুনেছেন কঙ্কনা। স্থির লয়ে বয়ে চলে ছবি কিন্তু টানটান। প্রত্যেকে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেতা, কিন্তু সকলেই বিষণ্ণ প্রকৃতির উচ্ছ্বাস-বন্দি। যে উচ্ছ্বাস শুতুকে সারাক্ষণ ব্যঙ্গ করে, মজার ছলে নিষ্ঠুরতা চারিয়ে দেয় জীবনের এক জটিলতম বয়সের ভার বইতে বইতে বিধ্বস্ত তরুণের মধ্যে। তাঁর অসাধারণ অভিনয়ে নন্দুর মাসতুতো ভাইয়ের চরিত্রের ভঙ্গুরতাকে চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন বিক্রান্ত মাসে। ছোট্টো তানির সঙ্গে বন্ধুত্বের মধ্যে তাঁর শান্তি খুঁজে পাওয়াও একসময় ধাক্কা খায়। পুরুষতন্ত্রের শিকার হতে হতে তার হিংস্র খেলায় ঢুকে পড়ে সে। এবং সে প্রবেশ হয়ে ওঠে অভিমন্যুর মতোই।

১ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের ছবিতে কোন চরিত্র, কার সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে, তা বুঝতে বেশ খানিকটা সময় বয়ে যায়। সদ্য বিবাহিত বিক্রমের প্রতি নিজের পুরোনো আকর্ষণ উদ্‌যাপন করতে আসা মিমির শুতুকে সিডাকশন আমাদের অনেককেই পিছন ফিরে দেখতে বলে। পুরুষতন্ত্রের কাঁচামাল দিয়ে মিমির স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণটি দারুণ দক্ষতায় করেছেন কঙ্কনা। কিন্তু চরিত্র যখন বেশ কয়েকটি, তখন তাঁদের গল্পগুলো জানতেও মন চায় দর্শকদের। আমাদের ছবি দেখার অভিজ্ঞতাটাই তেমন কি না। কিন্তু ছবি শেষে বুকে শুধু বিষণ্ণ ম্যাকলাক্সিগঞ্জকে নিয়েই বেরিয়ে পড়ি আমরা। চরিত্রগুলো হারিয়ে যায়। হিংসার অস্বস্তি দূরে সরে যায় কলকাতার আরও অস্বস্তিকর তাপমাত্রায়। কিন্তু যে কিছুতেই সরতে চায় না, সে শুতু। ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’ সেই বন্ধুকে কেন যেন আজ এতদিন পরেও আমাদের ছাড়তে ইচ্ছা হয় না। বলতে ইচ্ছা হয়, ‘আবার দেখা যদি হল সখা প্রাণের মাঝে আয়’। বাবার সোয়েটার পরে সাতদিন কাটানো শুতুর কাছে তো বাড়ি ফেরার টাকাটাও ছিল না। ‘এ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’ শুধু পুরুষতন্ত্রের হিংসার কথা বলেই দায়িত্ব সারে না। আমাদের ঘরের মেয়ে কঙ্কনা কি শ্রেণিবৈষম্যের গভীরতর সত্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘ডিরেক্টরিয়াল ডেবিউ’ করতে পারেন!!

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here