সুঅঙ্গনা বসু

নম্বর দিতে হলে ‘আহা রে মন’ কে ১০ এ ১০ দিতাম। অবশ্যই নিজের সিনেমা দর্শন সংক্রান্ত সবরকম সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে বললাম। বাংলা ছবি এবং সিনেমাপ্রেমী একজন মানুষ হিসেবে এই ছবির সিনেমা ভাষা এবং ছবির মাধ্যমে গল্প কথনের ধরন মন ছুঁয়ে গেছে।

বহুদিন আগের কথা, তখন বেশ ছোটো, ‘চরিত্রহীন’ বাংলা দূরদর্শনের পর্দায় প্রথম দেখেছিলাম, পরে উপন্যাসটি পড়ি। শরৎচন্দ্রের বর্ণনার সতীশের সঙ্গে অঞ্জন দত্তের চেহারার বিশেষ মিল ছিল না। কিন্তু তিনি এত ইনটেন্স অভিনয় করেছিলেন যে আর কোনদিন সতীশ বলে অন্য কাউকে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। অবশ্যই তাঁর চেহারা রোম্যান্টিক হিরোর মত ছিল না, তবু আমার পছন্দের সেরা রোম্যান্টিক অভিনয়গুলির একটি অঞ্জন অভিনীত সতীশ। অনেক পরে পিকুর ইরফান খানকে দেখে সে কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। এ ছবিতে একদম নতুন লেগেছে তাঁকে। প্রতিম-অঞ্জন জুটি জিন্দাবাদ। প্রথম দর্শনে চারুলতাকে দেখে নিজের গলায় ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গেয়ে ওঠা থেকে হোটেলের ঘরে খাট আলাদা করতে শশব্যস্ত আপাত নার্ভাস প্রৌঢ় বরুণ। নিখুঁত এবং হৃদয়হরণ।

ছবিতে আছেন আদিল হুসেন, হ্যাঁ তিনিও হৃদয়হরণ। আসামি টানে মিষ্টি বাংলা উচ্চারণে টানটান অভিনয় করেছেন। তাঁর রোলটি লেখা হয়েছে অনবদ্য। বিমূর্ত পূর্ণেন্দু পাহাড়িকে জীবনের ল্যান্ডস্কেপে তুলির টানের মত মনে হয়। এবং পাওলি। পাওলি-আদিল প্রথম দৃশ্যে যে নাটকীয়তা তৈরি হয় সেই স্বত:স্ফূর্ততা বহুদিন মনে থাকবে। বিমানবন্দরের অফিসারটিকে যখন আমরা খিটখিটে স্টিরিওটাইপ কী না ভাবতে শুরু করেছি, তখনই তিনি খোলস ছাড়েন। যত্নে, মায়ায়, মমতায়, দায়িত্বে, পেশাদারিত্বে পূর্ণ এবং আজীবন ‘নি:সঙ্গ’ পূর্ণেন্দু পাহাড়িকে না ভালবেসে উপায় নেই। আদিল-প্রতিম জুটি জিন্দাবাদ।

আছেন আরও একজন হৃদয়হরণ। সদ্য যুবতী তিতলি বাংলা ছবির আসল ‘হৃদয়হরণ’কে চেনে না। উত্তমকুমারের নাম না জানা এক লিউকোমিয়া আক্রান্ত বাঙালিনী। রাগ করলেন নাকি? তিতলি আসলে দেবের ফ্যান। ভুল। দেবকে সে ভালবাসে। সত্যি বলব, তিতলি-র এই ভালবাসা এত ছোঁয়াচে, যে দেবের গলা নকল করে বিশ্বনাথ যখন ফোন করে তিতলিকে, তখন খুব মিষ্টি লাগছিল। তাঁর বাংলায় ভুল আছে কী না, তিতলির নায়ক তোতলা কী না, এসব মনে আসেনি। মনে হবে, তিতলি তাঁর নায়কের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলুক। এ ছবিতে দেবের গলাও হৃদয়হরণ।

মন ছাড়াও আরো বেশ কিছু কথা আছে ছবিতে, যা আমাদের মন ভাল রাখার জন্য প্রাসঙ্গিক। যেমন চারুলতা, নি:সঙ্গতা, বৃদ্ধাবাস ধরা হল এক ফ্রেমে। ভূপতির মত কাজপাগল পূর্ণেন্দুও, কিন্তু প্রেমিকাকে চিঠি লিখতে ভোলেননা তিনি। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া চারুর জীবনে কী অবশেষে প্রেম এল বৃদ্ধাবাসে? এই রহস্য বজায় থাকে।

পার্নো মিত্র এবং ঋত্বিক কী বান্টি অর বাবলি হয়ে উঠতে চলেছেন? না কি অস্থানে অতর্কিতে জমে ওঠা প্রেম ওরা বিলিয়ে দিতে পারবে ‘ভাল কাজে’। প্রতিম বোধহয় তাই চান, ওদের এই টানটান ‘কমপ্যাটিবিলিটি’ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যবহার হোক। তেমন ভেঙে কিছু বলেননি। কারণ ছবিটি কয়েকটি ঘটনার সিনেম্যাটিক সংশ্লেষ মাত্র। তবু তাঁরাই এ ছবির নায়ক নায়িকা। কারণ বেশ চনমনে, নির্ভর করতে পারার মত সমীকরণ রয়েছে এই জুটির। বারুদ আছে।

পার্নোর বাবা ‘ডন বা মন্ত্রী নন’ তিনি ডাক্তার। এভাবেই বলা হয়েছে ছবিতে। তিতলিকে বাঁচাতে গেলে খরচা হবে ২৫ লাখ। মা বাবা অসহায়। পার্নোর বাবা ডাক্তার, খুবই সংবেদনশীল। মেয়ের সঙ্গে এবং তিতলির সঙ্গে ব্যবহারে বিশেষ ফারাক নেই। চাইলেই তিনি মেয়ের আবদার মেটাতে বিনা প্রশ্নে নগদ তিন লাখ টাকা দিতে পারেন। তবু তিতলির চিকিৎসার সুরাহা হয় না।

এ ছবিতে পুলিসের ছদ্মবেশ নেওয়া চোরকে দিয়ে ডিমনিটাইজেশনের প্রশংসাও করিয়েছেন প্রতিম। চিত্রনাট্যের ভাঁজ মনোগ্রাহী।

আদিল পাওলিকে পছন্দ করে ফেলেন। পাওলি এবং আদিল নানাভাবে প্রান্তিক। তাঁরা কাছাকাছি আসেন। এবং সহমর্মিতায় স্পর্শ করে যান পরস্পরকে। আমাদেরও। বাকিটা সিনেমা।

অঞ্জন দত্ত খালি গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন। যেটি চোখ বুজে শুনতে খুব ভাল লেগেছে। বাকিটা ছবিতে বলা আছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here