প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

১. সোনালোভী শত্রুরা ঘন জঙ্গলে গাছের আড়াল থেকে গুলি চালাচ্ছে আর নায়ক সহ তিন অভিযাত্রী মাঝনদীতে নৌকোয়। অথচ গাছের আড়ালে থাকা শত্রুরা টপাটপ গুলি খেয়ে ঝপাং ঝপাং নদীতে পড়ে গেল।

২. দড়ি বাঁধা কাঠের পাটাতন দেওয়া সেতু। আদিবাসীরা বানিয়েছে। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য। মাঝে গভীর খাদ। শঙ্কর, মার্কো, অ্যানা-তিনজনেই বুঝতে পারছে সমুহ বিপদ। তবু গাম্বাটের মতো তিনজন তিনটি ঘোড়া নিয়ে একসঙ্গে সেতু পার হতে গেল। আর যায় কোথায়! সেতুফেতু ভেঙে মহা বিপত্তি। তারপর দেবকে যা যা করতে হল, সেগুলো বলিউডের সুপারহিরোরা গত শতকের আশির দশকের পর আর করার ভরসা পাননি। দর্শকদের বোধবুদ্ধি সম্পর্কে ধারণা থেকে।

৩. একটি জাগুয়ার একটি মেয়েকে মেরে ফেলেছে। চলেও গেছে। তারপর খামোকা জানোয়ারের ওপর প্রতিশোধ নিতে দেব ও সেই মেয়েটির প্রেমিক জাগুয়ারের খোঁজে বেরোলো। ধরেও ফেলল। তারপর জাগুয়ারের সঙ্গে দেবের সে কি মারামারি। ভিলেনের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই বা হিরোইনের সঙ্গে জঙ্গলে গড়াগড়ি করে প্রেম করলে যেমনটা করতে হয়, ঠিক তেমন। তবে হ্যাঁ। দেব জাগুয়ারটিকে গলা টিপে খুন করেননি। পকেট থেকে বন্দুক বের করেছিলেন।

৪. একটি অ্যানাকোন্ডা দেবের অভিযানের সঙ্গী মার্কোকে মুণ্ডু কামড়ে মেরে ফেলল(মাথাটা কামড়ে আলাদা করে নেয়নি। দেবকে দেখে ভয় পেয়েই হয়তো)। তাতে দেবের খুব রাগ এবং দুঃখ হল। তো এল ডোরাডোর খোঁজে যাওয়ার কথা ভুলে পাক্কা একটা দিন সেই এলাকায় থেকে নিজেজের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষুরধার উদ্ভাবনী শক্তি, কৌশল এবং শক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করে অ্যানাকোন্ডাটিকে মেরে প্রতিশোধ নিলেন। দুর্গম জায়গায় অভিযানে গিয়ে নায়ক জন্তু-জানোয়ারকে ভিলেন ঠাউরে পরিকল্পিত প্রতিশোধ নিচ্ছেন। এটা নিশ্চয় বাংলা ছবিতে পরিচালক কমলেশ্বরের অবদান হিসেবে থেকে যাবে।

৫. জলে ডুবে যাওয়া ভাঙা জাহাজের খোঁজে দেব দিব্যি প্রশিক্ষণ ছাড়াই ডুবুড়ির পোশাক পরে নেমে গেলেন জলের তলায়।

এই হল মোটামুটি দেব-কমলেশ্বরের আমাজন অভিযান। যেখানে খরস্রোতা নদী কয়েকশো ফুট নীচে হঠাৎ নেমে যাওয়ায় অভিযাত্রীরা জলে নাকানিচোবানি খেয়ে কোনো মতে প্রাণ বাঁচিয়ে ডাঙায় ওঠেন এবং কি আশ্চর্য, নিজেদের ব্যাগ ও বন্দুকগুলোও অক্ষত অবস্থায় পেয়ে যান। শুধু শরীরটুকু সম্বল করে বিধ্বস্ত অবস্থায় এল ডোরাডোয় পৌঁছে অন্ধকার গুহায় ঢুকে হঠাৎই নায়ক-নায়িকার হাতে মশাল চলে আসে।

এমনই দুর্বল ও অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্রনাট্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলার সবচেয়ে বিগ বাজাটের ছবি আমাজন অভিযান। তার মধ্যে রয়েছে পরিচালক কমলেশ্বর মুখার্জির ইতিহাস ও সমাজবোধ। শুরুর দিকের ধারাভাষ্যে তিনি জানিয়েছেন লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস। মার্কেজ না পড়া, সাম্রাজ্যবাদের ন্যক্কারজনক ইতিহাস না জানা যে সব বাঙালি আধা ইংরাজি-আধা বাংলা ভাষায় তৈরি(মিউজিকের প্রবল ব্যবহারে অবশ্য চরিত্রদের কথাবার্তা তেমন শোনা যায়নি) ছবিটি দেখতে যাবেন, তারা সে সব ফ্রিতে পেয়ে যাবেন। একটি দৃশ্যে এক পর্তুগিজ লুঠেরা তার মহিলা ক্রীতদাসকে চাবুকও মেরেছে এই ছবিতে। আর ১৯১৫ সালে নিজের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিয়ে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ানো শঙ্কররূপী দেব সেই অন্যায় চোখের সামনে দেখে রুখে দাঁড়িয়েছে।

সে যাই হোক। শৌমিক হালদারের ক্যামেরায় চোখ রেখে আমাজন দেখতে ভালোই লাগে। যদিও দীর্ঘ নদীযাত্রা দর্শকদের ক্লান্তিকর ঠেকতে বাধ্য। খারাপ লাগে গ্রাফিক্সে তৈরি এল ডোরাডো। দেবজ্যোতি মিশ্র তাঁর বিশ্বসঙ্গীত-সংক্রান্ত অঢেল জ্ঞান উজাড় করে দিয়েছেন এই ছবিতে। প্রাপ্তি সেটাও। ভালো লাগে অ্যানারূপী শ্বেতালানা এবং তাঁর ভাঙা বাংলা। তবে অ্যানাকোন্ডার আক্রমণে বাবার মৃত্যুর পর অত কম সময়ে স্বাভাবিক হয়ে তিনি কীভাবে এল ডোরাডোর দিকে বেরিয়ে পড়লেন পরিচালক জানেন!

রইলেন বাকি দেব। তিনি সুপুরুষ। সাদা জামা পড়ে আমাজন অভিযানে বেরিয়েছিলেন। অজস্র উৎপাত সত্ত্বেও ছবির শেষের মিনিট পনেরো আগে অবধি তাঁর জামা ও চেহারায় কোনো ছাপ পড়েনি। অতএব তাঁকে ভালোই লেগেছে। মাঝেমধ্যে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দু-চারটে দর্শনের(নায়ক আফটার অল) কথা বলা ছাড়া অভিনয়ের খুব একটা দরকারও পড়েনি।

সব মিলিয়ে আমাজন অভিযানের পদে পদে পরিচালক নায়ককে দিয়ে নিজের জন্য বিপদ তৈরি করিয়েছেন। বিপদে ফেলেছেন দর্শকদেরও। অবশ্য বাচ্চাদের অ্যাঙ্গেলটা বলা মুশকিল। দেব যখন জাগুয়ারের সঙ্গে ঘন জঙ্গলে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, তখন হাউজফুল হলের দুই খুদে দর্শক বেশ মজা পাচ্ছিল দেখলাম। কিছুক্ষণ পর অবশ্য তাদের একজনকে মা বাইরে থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন। বোর হচ্ছিল মনে হয়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here