‘অসমাপ্ত’ জীবনের গল্প

0
387

pritha-editedপৃথা তা
জীবন মানেই চির অসমাপ্ত এক গল্প। ‘শীর্ষেন্দু’র কোন নতুন নভেলে’- এক অসমাপ্ত গল্পের ছত্রে ছত্রে নিখুঁত বর্ণনা করেছিলেন তিনি। আর সেই ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’-এর মত আধা-বাস্তব উপন্যাসকে পুঁজি করেই এবার পর্দায় গল্প বলতে মাতলেন পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়।
বাংলা ছবিতে বরাবর ‘অন্য’ধারার গল্পকে অন্য আঙ্গিকে বলেন সুমনবাবু। অতীতে নবারুণ ভট্টাচার্যের মত লেখকের লেখা নিয়ে কাজ করতে সাহস দেখিয়ে তিনি তাঁর এই ধরনকে প্রমাণও করেছেন। এই ছবি নিয়েও দর্শকদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মত। অনেকেরই ‘শেষের কবিতা’-র গল্প বলার ধরন বেশ ভালো লেগেছিল। অসমাপ্ত ছবিতেও তিনি তাঁর দর্শকদের নিরাশ করেননি। সাহিত্য ও সিনেমা কোথাও তাদের মাধ্যমের প্রেক্ষিতে একে অপরকে অতিক্রম করে যায় ঠিকই, কিন্তু কখনই তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায় না।
এখানেও সেই সম্পর্কটা পরিচালক অক্ষুণ্ন রেখেছেন। প্রতিটা চরিত্রকে এখানে যত্ন করে বোনা হয়েছে তাদের আলাদা আলাদা মাত্রা দেওয়া হয়েছে। এখানে প্রতিটা চরিত্রের সাথে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দের মাধ্যমে এই গল্পটি এগিয়েছে। সেটিই ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আর এই ছবিতেও সবুজ পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষা নীলচে ধোঁয়াটে কুয়াশা, আর হেয়ার পিন বাঁক নেওয়া পাহাড় সমেত অনেক জায়গায় প্রকৃতি নিজেই একটি চরিত্র হিসেবে হাজির হয়েছে। ছবিটির এডিটিং বেশ ভালো মানের।  ছবিতে স্থান বিশেষে দেবজ্যোতি মিশ্রের সুর বেশ মন ছুঁয়ে যায়।
লিনিয়ার ন্যারেটিভ কায়দায় বলা এই গল্পে শুরুর আর শেষের দৃশ্য দুটি অভিনব কায়দায় সাজান হয়েছে। ছবিটি একটি ছিন্নমূল ছেলের ভ্রমণের গল্প। এই ছেলেটি (ইন্দ্র ওরফে ঋত্বিক) এক দীর্ঘ ভ্রমণে বেড়োয়, যার মাধ্যমে সে নতুন করে চিনতে শুরু করে অনেক মানুষকে। যারা তার সাথে সংযুক্ত। তাঁর বন্ধু(ব্রাত্য বসু), বন্ধুর স্ত্রী(স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়), তার প্রাক্তন প্রেমিকা(পাওলি দাম), তার ননদ প্রমুখের সঙ্গে। এই সব কটা চরিত্র এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ককে টানছে নানা কারণে বাস্তব-অবাস্তবের মাঝেমাঝি রাস্তায় বার বার এসে পড়েছে গল্প। এরই মধ্যে ইন্দ্রর সাথে আলাপ হয়, এক মানুষের, যে কলকাতা ছেড়ে পাহাড়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় খুজছে এক গভীর যন্ত্রণা ভিতরে পুষে রেখে। প্রতিটা আলাপই ইন্দ্রকে নতুন কিছু সম্পর্কের দিক নির্দেশ করে, কিন্তু মানুষে মানুষে যোগাযোগ, সম্পর্কের মূল কথা কোনদিনই কারও কাছ থেকে জানা হয়ে ওঠে না ইন্দ্রর। সেই খোঁজ তাঁকে বার বার ক্ষতবিক্ষত করে, বৈরিতায় ভরিয়ে দেয় জীবন। তবে কি সংযোগহীনতাই এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাবার একমাত্র পথ? এই প্রশ্ন রেখেই ছবির গল্পও এক অসমাপ্ততাকে কেন্দ্র করে শেষ হয়ে যায়।
ছবির শুরু থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত এক বিষণ্ণতা ছড়িয়ে ছিল, যা নানা দৃশ্যে টুকরো টুকরো করে ধরা পড়েছে, বিশেষত প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলিতে। আর তার পাশাপাশিই ছিল এই বৈরিতার এক অদ্ভুত ও তীব্র মাদকতা। যা ছবিতে সফলভাবে দৃশ্যমান।
ঋত্বিক বেশ কিছুদিন যাবত যে প্রত্যাশা তৈরি করেছেন তাতে তার কাছ থেকে এমন অভিনয়ই প্রত্যাশা করা যায়। এই চরিত্রটি রূপ দেওয়া ছিল বেশ কঠিন, এবারেও তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাওলি, ব্রাত্য, সস্তিকা নিজের চরিত্র মাফিক বেশ ঠিকঠাক।
শীর্ষেন্দুবাবুর লেখা বরাবরই পরিচালকদের মন কাড়ে, কিন্তু এবার যেহেতু গল্পের ধরন আলাদা,তাকে বলার কায়দাও আলাদা তাই আশা করা যায়, বাংলার অন্যধারার দর্শকেরা এবার হলমুখী হবেন। আর তারা খুব একটা নিরাশও হবেন বলে মনে হয় না।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here