সুঅঙ্গনা বসু

রবীন্দ্রনাথ এক কাবুলিওয়ালার গল্প লিখেছিলেন। ঝুলিতে যে ‘হাঁথি’ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ছবি বিশ্বাস যখন মিনিকে ‘খোঁকি’ বলে আদর করে, সীমানা পেরিয়ে পিতৃস্নেহ ছুঁয়ে যায়। আমরা জানতাম কাবুলিওয়ালারা শুধু মহাজনী হৃদয় নিয়ে শহরের পথে ঘোরে না। তাঁদের দেশ গাঁয়ে রয়ে গেছে ছোট ছোট খোকাখুকি। আমাদের সঙ্গে তাঁদের বিশেষ পার্থক্য নেই। চিরন্তন মানবিকতার সেই কাহিনি ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে দেব মেধেকারের নতুন ছবি বায়োস্কোপওয়ালা। বাচ্চারা হামি, ইয়েতি, অ্যামাজন ইত্যাদির সংগে যদি আফগানিস্তানের গল্প শোনে তাতে ক্ষতি কী?

আফগানিস্তান যে নৃশংস তালিবানদের দেশ নয়, এটা আমরা যাঁরা ছোটোবেলায় কাবুলিওয়ালা পড়ে ফেলেছি তাঁদের নতুন করে বোঝাতে হয়নি। ‘আপন হতে বা্হির হয়ে বাইরে দাঁড়া’-র সফল পাঠ দেওয়াতেই সৃজনের সাফল্য। নতুন ‘কাবুলিওয়ালার’ গল্পের রহমতও এমনটাই ভাবে। তাই এই নতুন নির্মাণে সে সুদের কারবারি নয়, মেওয়া নিয়ে ঘোরে না। সে একটি নতুন অক্যুপেশন পেয়েছে। নতুন রহমত তালিবান বিধ্বস্ত কাবুল দেখেছে। সে ভাগ্যের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চায়নি। তালিবানি ফতোয়া এড়িয়ে সে বাড়িতে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করে। কারণ সীমানা পেরনো বিশ্বদর্শনে ভরসা রাখে নতুন রহমত। তালিবানরা সিনেমাঘর পুড়িয়ে দিলে বায়োস্কোপ কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে পরে গ্রামের পথে পথে। এরপর একদিন দেশ ছাড়ে। ফেলে রাখে আসে বাড়িঘর, খোকাখুকুদের। আগের বারের মত এবারেও তাঁর সফরের সঙ্গী হন কলকাতার মিনি ও তাঁর বাবা। বায়োস্কোপওয়ালা ছবিতে মিনি এবং তাঁর বাবাও আর শুধু দর্শক নন, রহমতের মত তাঁরাও গল্পের নির্মাণে খড়কুটো যোগান দেন। বদলে যাওয়া সময়ের উপযোগী হয়ে ওঠেন।

চেনা গল্পের ভালবাসার সুতোগুলো নতুন গল্পে ছেঁড়েনি বরং মজবুত হয়েছে। মিনির বাবা এবং রহমত দুজনের জীবনের সঙ্গেই জুড়ে গেছেন কিছু নতুন মহিলা চরিত্র।  নিজের মেয়েদের ভালবাসার পাশাপাশি তাঁরা বাকি মহিলা চরিত্রদের প্রতি সংবেদনশীল।

পুরনো গল্প নতুন করে বলতে গেলে, দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখার জন্য  যে নতুন  টেনশন তৈরি করতে হয়, তা সফলভাবেই করা হয়েছে ছবিতে। এছাড়া রয়েছে কিছু নতুন কারুকাজ যেমন মিনির বিয়ের দিন নয় বরং রহমত ফিরে এসেছিল তাঁর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাড়ি দেওয়ার দিনে। মিনির আছে ফরাসি বয়ফ্রেন্ড।

নতুন গল্পটি কাবুলিওয়ালাকে নিয়ে নয়, তাঁর চারপাশের আক্রান্ত সময় এবং চরিত্রগুলিকে নিয়ে। ফলে বায়োস্কোপওয়ালার চরিত্রে ড্যানি, ছবি বিশ্বাস হয়ে উঠতে পারেননি বলাই বাহুল্য। তবে ছোটো ছোটো দৃশ্যে তিনি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছেন। রবি বাসুর চরিত্রে আদিল হুসেন, মিনির চরিত্রে গীতাঞ্জলি থাপা, ছোটো একটি চরিত্রে আফগান মহিলা হিসেবে টিসকা চোপরাকে বেশ ভাল লাগে।

পাকিস্তান সীমান্ত পেরোতে অল্প কিছু ঘুষ দিতে হয়েছে, কিন্তু এরপর যত এগিয়েছি দাম দিতে হয়েছে আরো বেশি – ভাগ্য বদলাতে কলকাতা পাড়ি দেওয়া আফগান চরিত্রের মুখে রাখা হয়েছে এই ডায়লগ। ১৯৯২-এর দাঙ্গা বিধ্বস্ত কলকাতায় হিন্দু দাঙ্গাবাজরা রহমতের পিছু নিল, কারণ সে মিনিকে কার্ফু্-র সময় উদ্ধার করে বাড়ি ফিরছিল। মিনি কেন কার্ফুর মধ্যে স্কুল থেকে একা বেড়িয়ে পড়ল কে জানে? রহমত ভাল মুসলমান বোঝাতে এই দৃশ্যটি অতি সরলীকরণ বলেই মনে হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের দৃশ্যগুলিতেও পোড় খাওয়া দর্শক নতুন কিছু খুঁজে পাবেন না। তাতে কী? মানবতার মূল কথাগুলি তো সিনেমায় অনেক বার বলা হয়ে গেছে।  যারা বাহুবলীর স্পেকট্যাকল বা জুড়য়া টু-র অতিনাটকীয়তার মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলতে চান, এই সিনেমা দেখে তাঁদের কেউ কেউ হয়তো মিনি বাসুর মত রাবেয়াকে খুঁজতে পথে নামবেন কোনোদিন। সিনেমার কাছে এর থেকে বেশি কী পাওনা? শেষ দৃশ্যে বায়োস্কোপ যন্ত্রে চোখ রেখে যে পাঁচ বছরের রাবেয়াকে আমরা নাচতে দেখি তাঁকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। শেষ দৃশ্যে মনে হতেই পারে, বছর দশেক আগে যেদিন নকশাল বন্দিদের জেল ভাঙার সুযোগে রহমত পালিয়ে এসেছিল মিনির বাবার কাছে, সেদিন আমরা সবাই মিলে যদি তাঁকে সীমানা পার করে দিতে পারতাম তাহলে বিনা দোষে যাবজ্জীবন নির্বাসনে থাকতে হত না রহমতকে। আমাদের এটুকু সিনেমাদর্শনই তো দিতে চেয়েছিল দেশান্তরী বায়োস্কোপওয়ালা। সেদিক থেকে কাবুলিওয়ালার গল্প নতুন করে বলার এই প্রয়াসকে সাধুবাদ দিতেই হবে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here