সুঅঙ্গনা বসু

চিত্রনাট্যকার হিসেবে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় যে বেশ দামি ছিলেন তা আমরা জানি। ‘অগ্নিবাণ’ সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একটি প্লট, যা নিঃসন্দেহে আজও প্রাসঙ্গিক। এবং এই সংক্রান্ত বাকি সব প্রাসঙ্গিক কথাই ‘ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ’ ছবিটিতে রেখেছেন পরিচালক অঞ্জন দত্ত।

পুজোর মুখে ব্যোমকেশ না দেখে বাঙালির উৎসব শুরু হয় না, কলাবৌ স্নানের মতো এ রকমটাই নিয়মে দাঁড়িয়েছে গত কয়েক বছর। এ বছরও ব্যতিক্রম নয়। তবে চেনা গল্পে অচেনা চমক আনবেন এমন কথা দিয়েই গত বছর ব্যোমকেশ শেষ করেছিলেন অঞ্জন। আমাদের মতো যারা তাঁর পরিচালনা এবং গানের তুলনায় অভিনয়ের গুণগ্রাহী বেশি, তাঁদের জন্য ছিল নতুন প্রতিশ্রুতিও। কোকোনদ গুপ্তর চরিত্রে অভিনয় করছেন স্বয়ং পরিচালক। এ ছাড়া ছবির প্রমোশনের শুরুতেই জানালেন, এ বার আর ড্রয়িংরুম ড্রামা নয়। ক্যানভাসে বড়ো হচ্ছে ছবির। সুতরাং প্রত্যাশার ভার ছিল বেশি।

আরও পড়ুন: সাত বাংলা ছবির গর্জন পেরিয়ে পুজোয় বাঙালির দণ্ডকারণ্য যাত্রা নিশ্চিত করল নিউটন

কোকনদ গুপ্ত আসলে কে বলে দিয়ে গোয়েন্দা গল্পের মজা নষ্টের মানে হয় না। শুধু এটুকু বলা যায় ফ্ল্যাশব্যাক এবং বর্তমান – এই দুই-এর মধ্যে কিছু বিসদৃশ অমিল চোখে পড়ল কোকনদের চরিত্রায়ণে। আগে সে তুলনামূলক ভাবে বাঙালি বেশি হলেও, পরের দিকে সে ভালো রকম অ্যাংলিসাইজড। অঞ্জন জ্যাকেটশোভিত কোকনদ রূপে বেশি স্বচ্ছন্দ হলেও একটু ক্লান্ত, পরিচালনার ভারেই হয়তো।

বিশ্বযুদ্ধোত্তর দেশ এবং মূলত উচ্চ মধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল শরদিন্দুর ব্যোমকেশের সত্যান্বেষণের পরিধি। ব্যোমকেশ যে সরকারের হয়ে কাজ করেন মাঝে মধ্যে, তা আমরা জানতাম। সত্তরের পটভূমিতেও ব্যোমকেশ নিয়মিত ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কেন? ছবিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ আছে, সত্তরের কলকাতায় লাল পতাকা আছে, দেওয়ালে পোস্টার আছে বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক, আমেরিকান অস্ত্র ব্যবসায়ী আছে, চিনা পট্টি আছে, তাই আপাত ভাবে ক্যানভাস বড়ো। তবে আগের ছবিগুলির মতোই, তাঁর কিছুটা ব্যোমকেশের বয়ানে, অজিতের ধারাভাষ্যে এবং শেষ দৃশ্যে কোকনদের উপসংহারমূলক ডায়লগের মধ্যেই ধরা আছে সিনেমা। সত্তরের কলকাতায় স্বস্তিকার লাল সিল্কের হাউসকোট, ডক্টর রুদ্র-র কমল মিত্রের স্টাইলে চুল-ড্রেসিংগাউন একটু দৃষ্টিকটু লাগে।

ছবিটি দু’টো গল্প নিয়ে। একটা ব্যোমকেশ বড়ো আর একটা ছোটো। রজিত কপুর বা উত্তমকুমার ছেড়ে দিলাম, যীশু বা আবিরের অভিনয় থেকেও কোনো রেফারেন্স নেননি ছোটো ব্যোমকেশ এবং ছোটো অজিত। এই অভিনয় কিন্তু ব্যোমকেশ-ভক্তদের মনে ব্যথা দিতে পারে।

নরম নীলাভ আলোয়, উত্তর কলকাতার রহস্যময় রাতের গলিতে (সত্তরের কলকাতা) ব্যোমকেশ যখন সাদা পাঞ্জাবি পরে নন্তকে জেরা করছিল, যীশুকে ভারী রোমান্টিক লাগছিল (মনে রাখতে হবে বিশ্ব সাহিত্যের বড়ো গোয়েন্দাদের মধ্যে ব্যোমকেশের মতো সংসারী লোক কম আছে)। ওমা, এ সব কথা ভাবতে যাচ্ছি, কয়েকটা দৃশ্য পরেই দেখি দুপুরে ঠাকুরপোর ভঙ্গিমায় এ হেন সংসারী গোয়েন্দার সঙ্গে ফ্লার্ট করছে স্বস্তিকা। একেই কি বলে অরগ্যানিক গ্রোথ!! এত রকম নতুনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে এইটা তো ছিল না। এই দৃশ্যে যীশু খুব ভালো। এ ছাড়াও পুরো ছবিতে যীশু সেনগুপ্তর অভিনয় ভালো লাগে।

অগ্নিবাণের মতো গল্প সত্ত্বেও চিত্রনাট্য তেমন জমাট বাঁধল না। আর সব প্রতিশ্রুতি রাখলেন না পরিচালক।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন