প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

গোটা দশেক চরিত্র। সকলেই বাংলা সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে। পরিচালক-নায়ক-নায়িকা-ক্যামেরাম্যান-প্রোডাকশন ম্যানেজার-সিনেমায় চান্স পেতে মরিয়া তরুণী-কামব্যাক করতে মরিয়া অভিনেত্রী-মহিলা কস্টিউম ডিজাইনার-অবাঙালি প্রযোজক, কে নেই। আর আছে পরিচালকের স্ত্রী, ক্যামেরাম্যানের সঙ্গিনী। সব মিলিয়ে একটি বাংলা ছবির হয়ে ওঠা এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবন-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ ও করে খাওয়ার মুচমুচে কাহিনি নিয়ে জমাটি সার্কাস তৈরি করলেন মৈনাক ভৌমিক।

ছবি বানানোয় মুনশিয়ানা আগেও দেখিয়েছেন মৈনাক। কিন্তু তাঁর আগের অধিকাংশ ছবিগুলোয় বেশির ভাগ চরিত্র বহুতলের বড্ড ওপরের ফ্ল্যাটে থাকত। তাঁরা প্রচুর পরিমাণ ইংরাজি কথা যে ভঙ্গিতে বলত, তা দেখে মনে হত, নিজের চেনাশোনা কিছু মানুষের জন্যই ছবি বানান এই পরিচালক। ‘চলচ্চিত্র সার্কাস’-এ কিন্তু সেই চক্কর থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি। বাংলা সিনেমা নির্মাণ নিয়ে তৈরি এই ছবি অবশ্যই বাংলা ছবির সাধারণ দর্শকদের জন্যই। মাল্টিপ্লেক্সের দর্শকদের হাসির আওয়াজ সে কথার প্রমাণ দিচ্ছিল বারবার।

সার্কাজমে ভরা কমেডি হিসেবে এই ছবি হয়তো অনেক ধরনের দর্শকেরই ভালো লাগবে। তবে কি না, বাংলা ছবির দর্শকদের কমেডি দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের বলে দেবে, এই ছবির কৌতুকগুলো কোনো কোনো জায়গায় একটু উচ্চকিত (বিশেষত প্রোডাকশন ম্যানেজারের চরিত্রটি)। সংলাপের মজা আরও একটু ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ছবির প্রয়োজনে বেশি কিছু বাস্তব চরিত্র ও সিনেমার প্রসঙ্গ সংলাপে এসেছে। কিন্তু যে ভাবে এসেছে, তা কোনো কোনো জায়গায় প্রক্ষিপ্ত লাগে। বরং চাঁদের পাহাড় ছবিটির রেফারেন্স দেওয়ার জায়গাগুলি অনেক বেশি শৈল্পিক। দুর্বলতাও আছে, ল্যাপটপে সিনেমা চালিয়ে কোন পরিচালক সেই ছবির বাংলা রিমেকের শুটিং করেন, তা আমাদের মতো সাধারণ দর্শকরা জানতে পারবেন না, শুধু কৌতূহলী হয়ে উঠবেন।

পরিচালক চরিত্রকে দিয়ে বলিয়েছেন, বাংলা ছবি হল বাংলা মদের মতো। তো গুণমানের এই তত্ত্বকে প্রমাণ করার জন্যই কি না কে জানে, ছবির প্রথম অধ্যায়ের টেমপ্লেটে শূন্য বানানটি ‘শূণ্য’ লেখা হয়েছে। ও হ্যাঁ, ছবির ফর্মেও কিছু অভিনবত্ব এনেছেন মৈনাক। যা সার্কাসকে আরও জমিয়ে দিয়েছে।

ঋত্বিক-নীল-পাওলি-তনুশ্রী-কনীনিকা-রুদ্রনীল-পায়েল-গার্গী-বিশ্বনাথ-অরিন্দম-সুদীপ্তা, সকলেই চমৎকার অভিনয় করেছেন। ভূতের ভবিষ্যৎ ছবিতে অবাঙালি ব্যবসায়ীর চরিত্রে মীর অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিতে বিশ্বনাথকে দেখে তারই এক্সটেনশন মনে হল। সিনেমা তৈরির দৃশ্যে নায়কের ভূমিকায় রুদ্রনীলের অভিনয়ের দৃশ্যটি মনে রেখে দেওয়ার মতো। মনে থাকবে, হিরো বেশ কয়েক বার বলে ফেলার পর সেই সংলাপ যখন পরিচালক এক আধা বাস্তবে হিরোইনকে বলেন, সেই দৃশ্যটিও। সত্যি বলতে কি, বাংলা মদের নেশা যতক্ষণ থাকে, তার চেয়ে কিছুটা বেশি সময়ই চলচ্চিত্র সার্কাস মনে থাকবে দর্শকদের।

বাংলা ছবির খোল-নলচে বা ভোল বদলে দেওয়ার মতো বিশাল কোনো মহৎ সৃষ্টি ‘চলচ্চিত্র সার্কাস’ নয়। কিন্তু খোল-নলচেটা খুল্লমখুল্লা করে দেওয়াটাও এই বাজারে নেহাৎ কম কথা নয়।

তবে সব চরিত্র থাকলেও একটা চরিত্র বাদ থেকে গেল মৈনাকের ছবিতে। গণমাধ্যম বা চলচ্চিত্র সমালোচক। এর পরে বাংলা ছবি নিয়ে কোনো পরিচালক যদি সিনেমা বানান, আর তাতে যদি চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সোশাল মিডিয়ার প্রসঙ্গ না থাকে, তা হলে কিন্তু সেই ছবিকে ছেড়ে কথা বলবেন না রিভিউয়াররা।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন