প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

বারবার ভুল হয়ে যাচ্ছিল। পর্দার নীচের দিকে তাকিয়ে সাবটাইটেল খুঁজছিলাম। কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দিন সমাগত। তার প্রস্তুতিটা মনে মনে কিছুটা আগেই নেওয়া হয়ে গেছিল হয়তো। আর শুরু থেকেই সেই প্রস্তুতির পরীক্ষা নিতে শুরু করে দিয়েছিলেন পরিচালক মোস্তাফা সারওয়ার ফারুকি, অভিনেতা ইরফান খান, নুসরত ইমরোজ তিষা ও রোকেয়া প্রাচী। তারপর টের পাওয়া গেল, এ তো বাংলা ছবি, সাবটাইটেলের তো প্রয়োজন নেই।

সাম্প্রতিক অতীতে পৃথিবীর সিনেমা মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে এশিয়া, আরও নির্দিষ্ট করে বললে দক্ষিণ এশিয়া। গৌরবময় অতীত সত্ত্বেও সেই আনন্দযজ্ঞে নিমন্ত্রণ ছিল না বাংলা সিনেমার। আদায় করে নিলেন ফারুকি। চট্টগ্রামের পাহাড়, সবুজ কৃষিক্ষেত্র, ক্যামেরার ঘোর বাস্তব চলাচল এবং ইরফান-তিষা-পার্নোর অভিব্যক্তিতে ক্ল্যাসিকে পরিণত হল সম্পর্কে ‘ডুব’ দেওয়ার মায়ামেদুর কাহিনি।

শোনা গেছিল বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদের জীবন নিয়েই এই ছবি বানিয়েছেন ফারুকি। তা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। ছবিটি দেখার সময় মাথায় ছিল হুমায়ুনের জীবন। কিন্তু না থাকলেও কিছু যেত আসত না। প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে থেকে ভরা সংসার, তারপর পরিণত বয়সে সেই সংসার ছেড়ে মেয়ের বন্ধুর সঙ্গে প্রেম এবং তাঁকে বিয়ে। এমন জটিল কাহিনিকে যে এত কম সংলাপে পর্দায় বিস্তৃত করা যায়, তা ‘ডুব’ ছবিটা না দেখলে বিশ্বাস করাই মুশকিল। এত ভাল চিত্রনাট্য যে ন্যূনতম সংলাপেও দেড় ঘণ্টা পেরোনো ছবিটি টানটান। তাতে অবশ্যই বিপুল ভূমিকা রয়েছে ইরফান-তিষা-পার্নোর। ইরফান খান যে এই উপমহাদেশের হাতে গোনা আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতাদের একজন, তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু বলার আছে তিষার অভিনয় নিয়ে। ইরফানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। পিছিয়ে নেই পার্নো, রোকেয়া প্রাচীও। দুর্বলতা, ইরফানের গলায় বাংলা সংলাপ। ইরফান যদি বাংলাটা ভালো বলতে পারতেন, তাহলে, কে জানে, চিত্র পরিচালক জাভেদ হাসানের প্রথম স্ত্রী মায়া অতটা নীরবে সম্পর্কের ভাঙন মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারতেন কি না!! যেমন আমরা জানতাম না, বাংলাদেশের জনপ্রিয় চিত্র পরিচালকদের রাস্তায় দেখলে ভক্তরা অটোগ্রাফ নেয়। হুমায়ুন আহমেদের জনপ্রিয়তাকে চিত্র পরিচালকের চরিত্রে প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে হয়তো কিছুটা বেশিই লিবার্টি নিতে হয়েছে প্রায় নিখুঁত ফারুকিকে। জানি না, এই বায়োপিক থেকে, এপার বাংলার যে সব পরিচালক, বায়োপিকের আধারে সম্পর্কে কাহিনী বলতে চান, তাঁরা কিছু শিখবেন কি না।

থাক সে সব। বড্ড যত্ন করে প্রতিটি চরিত্রকে তৈরি করেছেন পরিচালক। নতুন সম্পর্ক নিয়ে ইরফানের মনের অস্বচ্ছতা চিত্রনাট্যে অসম্ভব রকমের স্পষ্ট। প্রেম-যৌনতা নিয়ে তৈরি ছবিতে প্রধান চরিত্রদের কোনো ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নেই। অথচ গোটা ছবিটি দুরন্ত রকমের সাবলীল। সব পিছুটান ছিঁড়ে যাওয়ার পর পর্দায় প্রথম কাছাকাছি আসে জাভেদ ও নিতু। সিনেমার জন্ম হয় যেন। মৃতের মৃত্যু নিয়ে উপলব্ধিগুলো জীবিতদের কাছে বড়ো বেদনায় ফিরে আসে। ফিরে আসে ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’। দর্শকদেরও ইচ্ছে হয়, জাভেদের কবর ছুঁয়ে তাঁর ভালোবাসার রামধনু রংগুলি আঁজলা ভরে নিয়ে আসতে। তাতে যদি মন কিছুটা ভারী হয়ে যায় তো হোক না!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here