সুঅঙ্গনা বসু

প্রথমেই বলে রাখা যাক ওং এবং ত্রিশূল দুটিকে দুগ্গার সহায়-চিহ্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ছবিতে। যেহেতু ধর্মের প্রতীক হিসেবে দুয়ের বাজার এখন বেশ ভাল তাই এর আলাদা কোন ব্যাখ্যা না খুঁজে তথ্যটুকু জানিয়ে শুরু করলাম।

মে দিনের দুপুরবেলায় রক্সি সিনেমায় গুটিকয়েক দর্শক নিয়ে শুরু হল দুর্গা সহায়। দেশপ্রিয় পার্ক বা সিটি সেন্টারের ধারে কাছের কোন হল হলে দর্শক সংখ্যা বাড়ছে কি না আপাতত জানা নেই। ছবির ট্রেলরটি ছিল আকর্ষণীয়। ভাল হতে পারে/নাও হতে পারে ধরনের রহস্য মোড়া। ছবির নির্মাণশৈলী অরিন্দম শীলের বাকি প্রকল্পগুলির মতই ঝকঝকে। শহরের বনেদি গয়না ব্যবসায়ীর বাড়িতে পুজোর মুখে কাজে ঢুকল গোসাবা থেকে কাজের সন্ধানে আসা আয়া দুগ্গা মণ্ডল। বাড়িতে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের জমানো সোনা-সম্পদ। কেমন হবে দুর্গাপুজোর ব্যকড্রপে দুগ্গা মণ্ডলের কলকাতা প্রবাস। তা নিয়েই এগোচ্ছে গল্প।

ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং তাঁর নির্মিত উত্সব ছবিটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু হয় টাইটেল কার্ড। তাই আলোচনা শুরু করা যাক সেখান থেকেই। দুর্গাপুজো কী বছরের যে কোন সময় একইরকম উৎসবমুখর করে তোলে বাঙালি মন কে ? মে মাসের দুপুরে অকাল ঢাকের বাদ্যিতে একটু অস্বস্তি হল। যেন শীতকালে পটলের ডালনা। সেই আদিতে জয়বাবা ফেলুনাথ থেকে শুরু করে হালের কাহানি – সিনেমায় দুর্গাপুজো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে নানা নতুন ও ভিন্ন অনুষঙ্গে। এ ছবিতে কিন্তু পুজো-ই হয়ে উঠেছে ছবির থিম-প্লট। দুগ্গা কেন কবে কখন কীভাবে কার সহায় উঠলেন পুজোর আতিশয্যে তা খানিকটা হারিয়ে গেছে। দুগ্গাপুজোর ভিডিওগ্রাফির ফাঁকে ফাঁকে গুজে দেওয়া গল্প খেই হারিয়েছে।

সত্যজিত অনুপ্রাণিত ‘যার মনে চুরি সেই তো চোর’ ধরনের সংলাপ আছে বটে, কিন্তু নেই মগলনলালের মেঘরাজের মত কোনো নির্দিষ্ট টার্গেট আর ক্লাইম্যাক্সের অমোঘ চাঁদমারি।

উপাদান ছিল – আয়লা, চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকে ভেসে যাওয়া জীবন, দুগ্গা মণ্ডলের পেট্রল জ্বালা বন্যতা – কিন্তু সলতে পাকানো হল কই? শ্বশুরের চরণকমলাশ্রিতা আদরের ছোটো বৌ-এর মায়াবী ভালোবাসায় প্রদীপ জ্বলার আগেই সলতে ভিজে গেল।

বাঙালি দাদুরা কী আজো কলের গান শোনেন? জানা নেই। মাল্টিপ্লেক্সে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে বাঙালি মধ্যবিত্ত(উচ্চ) কী বিবেকের পালাগান শুনতে চায়? সত্তরের মাঝামাঝি যে বাঙালি ইন্টারভিউ বোর্ডে বলেছিল মানুষের চাঁদে অবতরণ নয়, শতকের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমেরিকার ভিয়েতনাম অভিযান, (ছবি – প্রতিদ্বন্দ্বী) তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন অনেক ক্ষেত্রেই আমেরিকা-ইউরোপ প্রবাসী। তাই দুর্গা সহায়ের ‘না ঘরকা –না ঘাটকা’ ধরনের সমাজ সচেতন বার্তার টার্গেট অডিয়েন্স কারা হবেন তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।

অন্যদিকে, শীলবাবু কী সত্যি বিশ্বাস করেন শতাব্দী সঞ্চিত বৈষম্য আর অবিশ্বাসের ফারাক ছোট বৌয়ের গ্লিসারিন সিঞ্চিত অশ্রুবিন্দু দিয়ে মুছে দেওয়া সম্ভব? উত্তর কলকাতার সঙ্গে ভাই পাতিয়ে গোসাবার সঙ্গে সম্পর্ক এত সহজে চুকিয়ে দিতে পারবে দুগ্গা মণ্ডল? পারলে সে কার সহায় হবে? না কি গয়নার বাক্সের প্রতি লোভ আপোসে মিটিয়ে ফেলা সহজ হবে? সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ‘থ্রিলার’ শেষ হয়ে গেছে।

গোসাবার মেয়ের গলায় ওং সুরে আগমনীর অন্ত্যমিল বেখাপ্পা। তবে আপনি যদি বায়োস্কোপে বাঙালিয়ানা দেখতে ভালোবাসেন, গোঁজামিলটুকু বাদ দিয়ে দেখেই ফেলুন দুর্গা সহায়। অভিনয় সবার যথাযথ। তনুশ্রী, কৌশিক এবং ওপেন টি বায়োস্কোপ খ্যাত ঋতব্রতর কথা বিশেষ ভাবে বলা যায়। নাচ গান দুর্গাপুজোয় জমজমাট ছবিটি মে মাসের গরমে আশ্বিনের বার্তা আনল কী না – সেই সিদ্ধান্ত আপনার।

আর একটা কথা ছবিতে নিম্নবর্গের ছেলেরা প্রায় সবাই খারাপ, উচ্চবর্গের ছেলেরা প্রায় সবাই ভাল।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here