প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

গুপি আর বাঘা গিয়েছিল শুন্ডি রাজ্যে। সেখানে কেউ কথা বলতে পারত না তখন। কিন্তু রাজ্যটা কোথায়, বাঙালি জানতে পারেনি। জানালেন অনুরাগ বসু। জায়গাটা কেনিয়ায়। সেখানে এখন আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারিরা ভয়ংকর রকম সক্রিয়। জায়গায় জায়গায় সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র কী ভাবে ছাড়ানো হবে, তার হিসেব যেমন সেখানে হয়, তেমনি হয়ে যায় টাকাপয়সার লেনদেনও। ফেলুদা আর শার্লক হোমসের ভক্ত ক্ষুরধার কিশোর রণবীর কাপুর (বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত) সেখানে পৌঁছে যান রহস্য সমাধানে। টিনটিনের মতো চুল তাঁর। সঙ্গে বছর পঁচিশের সাংবাদিক ক্যাটরিনা।

অনবদ্য ফর্মে বর্ণময় রূপকথা তৈরি করেছেন অনুরাগ বসু। তার ওপর মিউজিক্যাল। তোতলা রণবীর গানে গানে কথা বলে অধিকাংশ সময়। ছবির গান লেখার পাশাপাশি ছন্দবদ্ধ সংলাপগুলোও অমিতাভ ভট্টাচার্যর লেখা। স্যালুট তাঁকে। ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের ছবি রণবীর যে ভাবে একা টেনেছেন, তার জন্য বোধহয় কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ক্যাটরিনা, কিন্তু ওইটুকুই।

কী না রয়েছে জগ্গা জাসুসে। নেতাজি যে পথে মণিপুর থেকে বর্মা গেছিলেন, সেই পথের হদিস। যে পথ নাকি এখন অস্ত্র চোরাচালানে কেবল ব্যবহৃত হয়। থাইল্যান্ডের সমুদ্রসৈকত, মরক্কোর মরুভূমি এবং কেনিয়া। সঙ্গে জিরাফ, জেবরা, উটপাখি – একুশ শতকের রূপকথা নির্মাণে প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন অনুরাগ আর তাঁর চিত্রগ্রাহক। ক্রিসমাসের দিন পৃথিবীর সাতটি দেশে পোপ কেকবৃষ্টি করবেন আর সেই বর্ষণে কেকের বদলে থাকবে অস্ত্র – রূপকটিও চমৎকার। তবে কিনা এক ভারতীয় কিশোরকে সাত সমুদ্র পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারিদের কাবু করতে যে পরিমাণ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, তা দর্শকদের হজম হওয়া মুশকিল।

ছবির প্রথমার্ধে স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যুরহস্য জগ্গা যে নিপুণতায় সমাধান করে, পরের ‘কমিক্স’গুলোয় ব্যাপারটা আর অতটা মেধানির্ভর থাকা সম্ভব ছিল না। ফলে অ্যাকশনে ভরপুর দ্বিতীয়ার্ধে একটা সময় মনে হচ্ছিল, ‘উফ! কখন শেষ হবে!’ আর দর্শকদের সেই তাড়াটা ছুঁয়ে গেল পরিচালককেও। বিশাল ক্যানভাসে বাঁধা কাহিনির শেষটা কেমন যেন তাড়াহুড়ো হল। কী থেকে কী হয়ে গেল, দর্শকদের পক্ষে খেই রাখাটাই হয়ে গেল মুশকিল।

আমাদের প্রিয় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দিয়েছেন অনুরাগ। বাঙালি দর্শকদের কাছে শাশ্বতর প্রতিটি অভিব্যক্তি মুখস্থ হয়ে গেলেও সর্বভারতীয় দর্শকদের নতুন অবতারে বব বিশ্বাসকে ভালো লাগারই কথা। রজতাভ দত্তও ভালো করেছেন, তবে তাঁর চরিত্রের মজাটা পুরো ফোটেনি। চিত্রনাট্য তাঁর ব্যাপারে আরেকটু যত্নশীল হতে পারত। একই কথা বলা যায় সৌরভ শুক্লার ক্ষেত্রেও।

সব মিলিয়ে ছোটোরা মনে হয় ছবিটা উপভোগই করবে। সঙ্গে উপভোগ করতে হবে তাদের বাবা-মাকেও।

সিনেমার মূল কাহিনিটা যে অনুরাগের বড়ো অন্তরের, তা বোঝা যায়। তবে শত্রুকে স্থির করতে গিয়ে লড়াই-আন্দোলনে যে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাও জড়িয়ে থাকে, সেটা উল্লেখ থাকেনি জগ্গা জাসুসে। তবু ভালো, এতেও তো ১৬১ মিনিট।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here