প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

ভিকি চলে গেল অস্ট্রেলিয়া। সে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করবে। তাঁর চুলের ছাঁট পালটানো হয়ে গিয়েছে। দাড়িও বেশ ভদ্রলোকসম। পোশাকআশাক হয়ে গিয়েছে ফর্ম্যাল। মাঝেমধ্যে সময় পেলে ডিজে-র কাজ সে করবে বটে। কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য এখন উপার্জন করা, আর পাঁচজনের মতো সফল মানুষ হওয়া। কিন্তু সে সব কি হওয়া হল তাঁর?  ‘আজকে যে শিস দিয়ে গান গায়/ কোন গান শুনবে হে কাল সে?’- সে প্রশ্নের উত্তর কনিকা ধিঁলো চিত্রনাট্যে দেননি। মুক্কাবাজের পর আরও একটা প্রেমের গল্প নিয়ে হাজির হওয়া পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপও দেখাননি।

অতএব যা হওয়ার তাই হয়েছে। মনমর্জিয়াঁ সিনেমাটি হয়ে উঠেছে রুমি(তাপসী পান্নু) ও রবির(অভিষেক বচ্চন)। ভিকির(ভিকি কৌশল)চরিত্রটিকে যথেষ্ট যত্ন নিয়ে তৈরি না করলেও পরিচালক-চিত্রনাট্যকার তাঁর ‘সাচ্চি মহব্বত’কে সর্বশক্তি দিয়ে স্পষ্ট করেছেন। তাঁর উদ্দাম যৌন-প্রেম, ভালোবাসার মানুষটি চলে যাওয়ায় ভালনারেবিলিটি বোঝাতে কোনো কসুর করেননি ভিকিও। গোটা ছবিতে, তিনিই তো একমাত্র মানুষ, যার ভালোবাসাকে কোনো কিছুই পরাজিত করতে পারে না। পুরনো দিনের ট্রাজিক বলিউড হিরোদের মতো তিনি দায়িত্ববান হওয়ার অছিলায় প্রেমিকার কাছ থেকে সরে আসেন ঠিকই কিন্তু আবার ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনের’ মতোই তাঁর কাছে ফিরে যান। ভোর রাতে ছাদ থেকে ছাদে লাফিয়ে প্রেমিকার সঙ্গে ফাঁকা ঘরে শুয়ে পড়তে পড়তে তিনি জীবনের হিসেবনিকেষ বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রেমানুভূতির প্রতি দর্শকদের সহানুভূতিশীল হতে দিলেন কই পরিচালক!

অন্যদিকে তাপসী ও অভিষেক নানা আবেগের সংকটে জেরবার হয়েও হিসেবি সমাজের মূল সূত্র থেকে বিচ্যূত হলেন না শেষ পর্যন্ত। দুদিন আগে পর্যন্ত ভিকির প্রেমে পাগল তাপসী, ভিকির মেকওভার দেখে বুঝলেন- এ ছেলে শুধু প্রেম করার উপযুক্ত বিয়ের নয়। তা সে প্রথম প্রেম যতই মহার্ঘ হোক। আর অভিষেক তো তাপসী-ভিকির সম্পর্কের কথা জেনেই এগিয়েছিলেন। তিনি ব্যাঙ্কার, সেটা ছিল তাঁর হিসেবি জুয়া- পরিচালক এ কথা আমাদের জানিয়েছেন নিজের স্টাইলেই। সব মিলিয়ে তাই অনুরাগ আমাদের সেই পুরনো মদই খাওয়ালেন। যদিও পাত্রটি একেবারেই নতুন। এমনকি, তা আদৌ বোতল কিনা, সেটাও বোঝা যায় না।

মনমর্জিয়াঁর সব চরিত্র পঞ্জাবি। ঘটনাস্থল অমৃতসর। অধিকাংশ সংলাপ পঞ্জাবিতে। তাই উত্তর ভারতীয় দর্শক ছাড়া ছবির হিউমারের মজা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে কথা না বুঝলেও মিউজিকের প্রশংসা করতেই হয়। চরিত্রগুলির আবেগের সংকট ও বিপর্যয়ের সূত্র চমৎকার ভাবে ধরে রেখেছে ছবির সঙ্গীত। তাপসী পান্নু অভিনয়ের প্রচুর সুযোগ পেয়েছেন এবং সদ্ব্যবহার করেছেন। অনেকদিন পর পর্দায় ছোটো বচ্চনকে দেখে ভালই লাগে। আর ভিকি কৌশলের অভিনয় দক্ষতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

ছবির শেষটায়, ডিভোর্সের পর অভিষেক-তাপসীর দীর্ঘ পথ চলা ও কথোপকথনের দৃশ্য আছে। সঙ্গীতময় আড়াই ঘণ্টার সিনেমায় সে সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে শুধুই অ্যামবিয়েন্স। সহজে ভুলে যাওয়ার নয় সে দৃশ্য। যে তাপসী একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কোনোদিন কিছুই ছিল না, কিছুই কিছুই নেই আমাদের আজ/ আমরা কি বাজাবো না জলপাইকাঠের এসরাজ?’ সেই তাপসী বলতে থাকেন কীভাবে বাল্যে বাবা-মাকে হারানোয় পরিবার থেকে অতি আদর পেয়েছেন তিনি। কীভাবে তাকে কাজে লাগাতে অভ্যস্ত হয়েছেন। আর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায় রুমি। পরিচালকের শিল্পনৈপুণ্য আমাদের আবার মুগ্ধ করে। সেই কবে থেকেই তো হিসেবি জুয়ার(নাকি পুঁজির ক্ষমতার)জয় ঘোষণার শিল্পকর্ম মুগ্ধ করে রেখেছে আমাদের।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন