সুঅঙ্গনা বসু

দুই যুগের দুই নায়ক এক সঙ্গে। ছবির প্রচারে এটাই ছিল ইউএসপি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কোলে ছোট্ট প্রসেনজিতের ছবি, বাবার সঙ্গে নায়কের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন ইত্যাদি প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে প্রচারে। এসবে নিশ্চয়ই লাভ হয়েছে, কারণ ছবির মুক্তির দ্বিতীয় দিনে, এবং বছরের শেষ শনিবারের বিকেলে সল্টলেকের মাল্টিপ্লেক্স প্রায় হাউসফুল। (কে না জানে সল্টলেকে প্রবাসী ছেলে মেয়েদের একলা বাবা মায়েরা সব থাকেন।) ছবি তাঁদের কেমন লাগল, জানার সুযোগ হয়নি, তবে আমার পাশে বসা দুটি অল্প বয়সি ছেলে ক্রমাগত হাসছিল, যাতে আমি যারপরনাই বিরক্ত হতে থাকলাম। এছাড়া, এক পুরুষ ও মহিলা যাদের দম্পতি ভেবেছিলাম, তাঁদের মধ্যে পুরুষটি বোর হয়েছেন। মহিলা কিন্তু খুব কনসার্নড ছিলেন, বললেন তোর আমার দুজনের একটা একটা ছেলে মেয়ে, বুড়ো বয়সে আমাদেরও এমন হতে পারে। ওরা তাহলে দম্পতি নন, বন্ধু। বেশ।

সৌমিত্র বুড়ো হয়েছেন, ৮৪ বছর বয়স। মাঝে মধ্যে ভুলে যাচ্ছেন। মন খারাপ। বার্ধক্য, অবসাদ, একাকিত্ব ইত্যাদি। ছেলেকে শর্ট নোটিশে এবং অল্প দিনের ছুটি নিয়ে ফিরতে হয়েছে শিকাগো থেকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব এবং ইন্টেলেকচুয়াল নায়কত্ব নিয়ে আরবান বাঙালি আজো গদগদ, প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে দ্বিধা বোধহয় পুরোটা কাটানো যায়নি। কিন্তু ময়ুরাক্ষীর প্রথম দৃশ্য থেকেই তাঁকে বেশ সাবলীল লাগে। মাঝেমধ্যে ধারাবাহিকতার কিঞ্চিত অভাব থাকলেও মোটের ওপর তিনি চরিত্র থেকে বেরোননি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আমরা এতদিন ধরে দেখছি যে, তাঁর সমস্ত পেশির সঙ্কোচন আমাদের হয়ত মুখস্থ হয়ে গেছে। তবু বেশ কয়েকটি দৃশ্যে তিনি নতুন এক্সপ্রেশন উপহার দিয়েছেন, যা মন ছুঁয়ে যায়। রেগে গিয়ে যখন বললেন – মনে করতে না পারলে কী করব? পরক্ষণেই অসহায় ভাবে বলেন – মনে পড়লে তো বলতামই। পরবর্তী স্তব্ধতার মূহুর্তে সিনেম্যাটিক মোমেন্ট তৈরি হয়। এযাবতকালে উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালির পারিবারিক সমস্যা নিয়ে তৈরি সিনেমাগুলির মধ্যে ময়ুরাক্ষী অবশ্যই তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ণ। কো-ইনসিডেন্টালি, যে দৈনন্দিন ঘটনাক্রমের বর্ণনার মধ্যে দিয়ে গল্প এগোয় সে ব্যাপারে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকার কারণে বলতে পারি ডিটেলিং-এর কাজ ভাল। বাবা ছেলের সম্পর্কের ডিটেলিং ভাল। ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধূলায়’ গানটি আশ্চর্যজনকভাবে বেজে উঠল, আর ফের আমার ব্যক্তিগত মূহূর্ত ছুঁয়ে গেল। বাবার রেকর্ড প্লেয়ারে সেই না বোঝার বয়স থেকে শোনা গান। এই গান শুনলে বাবার মুখ ভেসে উঠবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিল্প তো ব্যক্তিগত মূহুর্তের ‘ভাল’ ডিটেলিং-এর গল্পগুচ্ছ হতে পারে না। তাই গল্পের অন্য মোড় আছে। যেমন ময়ুরাক্ষী।

আরও পড়ুন: ২০১৮-য় যে বাংলা ছবিগুলো না দেখলেই নয়!

সত্যি বলতে কী গত কয়েক বছর ধরে বাংলায় ক্রমাগত গোয়েন্দা ছবি দেখার প্রভাব কী না বলতে পারব না – গল্পের বাঁকে বাঁকে নানা চরিত্রকে ময়ুরাক্ষী বলে সন্দেহ করার একটা ফাঁদে পড়ে যাচ্ছিলাম। কাউকে সন্দেহের ঊর্ধ্বে না রাখার গোয়েন্দাসুলভ মানসিকতা থেকে একবার সৌমিত্রবাবুর কেয়ারগিভার সুদীপ্তাই ছদ্মবেশী ময়ুরাক্ষী কী না তাও মনে এসেছে। মনের ভুল, না কী পরিচালক রহস্য বাদ দিয়ে বাংলা ছবি হিট করাতে পারবেন না ভেবে সত্যি-ই এভাবে চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন বুঝতে পারলাম না।

নাটোরের বনলতা সেন-এর ‘পাখির নীড়ের’ মত চোখ নিয়ে ফেমিনিস্টরা বহুদিন আপত্তি জানিয়েছেন। বনলতা সেন-এর ক্লান্তি নিয়েও চর্চা হয়েছে। সুতরাং ছাত্রী ময়ুরাক্ষীর সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিলেই, ছেলে-বাবা দুজন ‘আশ্রয়’ পেতেন, না সে সমাধান শুধু মরীচিকা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বাবার একাকিত্ব সত্বেও ছেলে বিদেশ থেকে ফিরতে পারছে না কারণ, তাঁর আয়ে চারটি এস্টাবলিশমেন্ট চলে। প্রথম পক্ষের ছেলের পড়াশুনো, কলকাতায় বাবা (সৌমিত্র), দ্বিতীয় পক্ষের অ্যালিমনি, এবং শিকাগোয় তাঁর নিজের (প্রসেনজিত) বাসস্থান। বাবা ছেলে দুজনের বিশ্বাস, ময়ুরাক্ষী থাকলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। যে ময়ুরাক্ষীকে বিয়ে করতে এক সময় রাজি হয়নি প্রসেনজিত।

ভাল লেগেছে ইন্দ্রাণী হালদার আর প্রসেনজিতের ছোটবেলার বন্ধুত্বের রসায়ন। ভাল লেগেছে সুদীপ্তাকে (সব সময় নিখুঁত)। নিখুঁত কেয়ারগিভার সুদীপ্তা পাখির নীড়ের মতো আগলে রাখে বৃদ্ধের আশ্রয়স্থল।

জেরিয়াট্রিক সমস্যা নিয়ে সারা পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি চমকদার ছবি গত কয়েক বছরে তৈরি হয়েছে। জানা গেল, উচ্চ মধ্যবিত্ত বৃদ্ধ বাঙালির একাকিত্বের গল্পে মূল সমস্যা এবং সমাধান একটি মনের মত বৌমা পাওয়া এবং না পাওয়া। এছাড়া, দর্শন, কবিতা, ইতিহাস, কয়েকটি ফ্রিঞ্জ সাবঅলটার্ন চরিত্র যা ছাড়া মধ্যবিত্ত বাঙালি অসম্পূর্ণ – চিত্রনাট্যের ফাঁকে ফাঁকে গুজে দেওয়া আছে তাও। বিষয় ভাবনা প্রাসঙ্গিক। চরিত্রায়ণ সুন্দর। এ নিয়ে একটি নন লিনিয়ার, ইনক্লিউসিভ বাঙলা ছবির দেখার আশা থাকল – আগামীকালে। কারণ – ‘আফটার অল টুমরো ইস অ্যানাদার ডে’ (প্রসেনজিতের মুখে গন উইথ দ্য উইন্ড –এর এই ডায়লগ দিয়েই ছবির সমাপ্তি ঘটেছে)।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here