নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছরে বিভীষণ-লক্ষ্মণদের মুখোমুখি সত্যান্বেষী অনীক দত্ত

0
3101
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

বোলপুরের লাল মাটিতে ব্লেজার গায়ে সাইকেল চালাচ্ছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। সেই দেখে কল্যাণ রায় বললেন, “অমর্ত্য সেনকে টুকলি করিস না”। ভারী মজা লাগল দর্শকদের। পশ্চিমবঙ্গের বড়ো পরিবারের ব্রিলিয়ান্ট ছেলে অসীমাভ বোস বিদেশের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, এছাড়া কীই বা মিল তাঁর সঙ্গে নোবেলজয়ীর। পরিচালকের সেন্স অফ হিউমারের তারিফ জুটল আরও একবার। বাঙালি দর্শক তো সেই ভূতের ভবিষ্যত থেকেই জানেন এই পরিচালকের রসিকতাবোধের কথা।

কিন্তু এতো গেল বাঙালি দর্শকদের কথা। আর ‘মেঘনাদবধ রহস্যে’র বাঙালি চরিত্ররা? না, তাঁরা কেউ ‘আবছা অক্ষর, পুরোনো ডায়রিতে হন্যে হয়ে’ কারও আদল খুঁজছে না। যে যার ধান্দায়, যাকে বলে। আর সেই চরিত্রগুলোকে নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম রাজনৈতিক থ্রিলারটি বানিয়ে ফেলেছেন পরিচালক। ইদানিং সিনেমায় পুরোনো পরিচালকদের শ্রদ্ধা জানানোর একটা ধারা চলছে। সেই ধারা বজায় রেখে, অনীক সত্যজিত, ঋত্বিক, হিচকক, আন্তোনিওনি সকলকেই স্মরণ করেছেন। লিটল ম্যাগাজিনের নাম দিয়েছেন ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’। সেখানেই না থেমে ওই ছবির মতোই নকশাল-পুলিশের লড়াই দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন  বিদেশ থেকে পড়িয়ে দেশে ফেরা অঙ্কের মাস্টারমশাই কাম শিল্পী গোপনে সরকারের সম্পত্তি শিল্পকর্ম কেনাবেচা করছেন নিজস্ব যোগাযোগ দিয়ে। নোটবন্দিতে বিরক্ত অবাঙালি শিল্পপতির সঙ্গে তাঁর ভারী দহরম মহরম। জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক আর অভিনেত্রী জোট বেঁধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রযোজক খুঁজছেন। যেখানে নিজের স্বামীকেও বাজিয়ে দেখতে ছাড়ছেন না অভিনেত্রী। অথবা ওই বাজিয়ে দেখাটুকু ছাড়া বাড়তি কোনো অধিকার বা সুযোগ তাঁর নেই। আর মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত নবীন প্রজন্ম নিজেদের সংকটে জেরবার হতে হতে বিদেশে ‘পালাতে’ চাইছে। পরিচালক অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন ‘স্কচও এক ধরনের দেশি মদ’। সে যাই হোক, ভবি কি আর অত সহজে ভোলে।

 

ভোলানোর দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন ‘পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল’। সত্যি। তবু সেই সত্যিকে যেভাবে অনীক সামনে এনেছেন, দুই শ্রেণিকে যে ভাবে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকবেই। তবু মনে পড়ে যায় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় মাও সে তুং ‘নীচে থেকে খুলে ধরা’র নীতি চালু করেছিলেন। আর এ কথা মনে পড়লেই অনীকের সামনে টুপিটা নামিয়ে রাখি। তা সে টুপি যতই অদৃশ্য হোক না কেন। টুপি খোলার আরও কয়েকটি কারণ অনীক তৈরি করেছেন এই ছবিতে। কাওকে রেয়াত করেননি তিনি। ‘বৃহৎ বঙ্গে’র মুখোশ টেনে ছেঁড়ার এই প্রয়াস মৌচাকে ঢিল মারার যে কাজটা করেছে, সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে যুগযুগ ধরে আম জনতা সেই আশাটুকুই তো করে এসেছে।

অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই। সব্যসাচী, গার্গী, সায়নী, বিক্রম, অনিন্দ্য, অমিত চরিত্র অনুযায়ী চমৎকার। কী ম্যাজিকে কে জানে, আবিরও বেশ মানানসই অভিনয় করেছেন। দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত নির্মাণ যথাযথ। কিন্তু শেষ গানটিতে গায়ে কাঁটা দেওয়ার উপাদান কোনো কোনো দর্শক খুঁজে পেলেও পেতে পারেন(যদিও এই গানটিতে মৌসুমি ভৌমিকের ‘আমি শুনেছি সেদিন নাকি’-র ছাপ স্পষ্ট)।

যেহেতু ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ একটি থ্রিলার(পরিচালক বারবার বলেছেন, “দর্শক যদি থ্রিলড হন, তাহলে এটি থ্রিলার”)। তাই কাহিনি সম্পর্কে কিছু বলা সম্ভব না। শুধু এটুকু বলা যায়, মাল্টিপ্লেক্স আর উন্নত সিঙ্গল স্ক্রিনগুলি যারা ইতিমধ্যেই হাউজফুল করে ফেলেছেন, এসি-র স্বাচ্ছন্দ্য তাঁদের ঘামতে দেবে না। শুধু জানতে চাইবে ‘তোমরা এখনও কি পলাশ ফুটলে পথে চমকে দাঁড়িয়ে ভাবো দিনবদল?”

আরও পড়ুন: ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ দেখে দর্শক থ্রিলড হলে তবে এটি থ্রিলার হবে: অনীক দত্ত

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here