shaliniশালিনী ঘোষ

২০১৬ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দের সেপিয়া দুনিয়া। সাদামাটা গ্রামের নীল চাষি সারমন (হৃতিক), যে কিনা সাহস আর শক্তির জন্য প্রবল জনপ্রিয়; মনে বিস্তর বাণিজ্য করার আশা, দূরদেশ চেনার আকাঙ্ক্ষা আর আর স্বপ্নে পাওয়া এক শিংওয়ালা প্রাণীর খোঁজে গতে বাধা ক্যাবলা, হাঁ করা বন্ধু নিয়ে পাড়ি দেয় মহেঞ্জোদারোতে। চেনা ছক মেনে হাজির হয় অত্যাচারী শাসক, যে সোনার লোভে নদীতে বাঁধ দেয়, হুটহাট করের বোঝা চাপায় প্রজাদের উপর, পাশাপাশি ঠিক চুমু খেতে খেতেই ন্যায়বোধ উপচে ওঠা প্রাগৈতিহাসিক বোকাবোকা প্রেমের জন্য থেকে যায় নবাগতা নায়িকা। অনুমেয় কূটনীতি থাকে, সাথে জোড়া নরখাদক বনাম সুপারহিরোর লড়াই (যার ক্ষমতা প্রথম দৃশ্যেই আজগুবি দেখতে কুমিরের সাথে লড়াইতে প্রমাণিত)। ততোধিক অনুমেয় রাজ দরবারে কেচ্ছা। থাকে দৃশ্যে দৃশ্যে শাসকের সুশীলা স্ত্রী, দুর্বিনীত শাসক সন্তান, সিন্ধু মা’র রোষে নোয়ার নাও নিয়ে নায়কের অতিমানবিক শক্তির ঝলকানি তথা প্রকৃতির আদিতম বিচার গোছের শেষপাত।

হাতে রইল শুধুমাত্র “ভালই তো” সেট। আর কলকাতার রাস্তায় বিদেশিদের যেমন ম্যাড়ম্যাড়ে রঙের পোশাকে দেখা যায়, ঠিক তেমনধারা সমাজের নিচুভাগের মানুষের কস্টিউমের পাশাপাশি নায়িকার রঙের বৃষ্টির চোখের আরাম। বেশিরভাগ দৃশ্যেই তার আবির্ভাব হতে থাকে কয়েন, ফুল, পাতা আর যাবতীয় হাতের কাজের জিনিস জড়ো করে বানানো ইয়া বড় বড় মুকুট মাথায়। অভিনয়ের দিকটুকুও যদি ছেঁকে নেওয়ার চেষ্টা চালানো যায়, একা নায়ক পরিসর পান নানান কসরত দেখানোর- লড়াকু হৃতিক থেকে নাচিয়ে হৃতিক, মোটামুটি ফর্মুলা মেনে বিভিন্ন শেডের সম্পূর্ণ প্যাকেজে  তিনি আসতেই থাকেন। বাকি চরিত্ররা মাপ মতো, আলাদা করে চোখে পড়ার সুযোগ তাদের নেই। প্রধান নারীচরিত্রও ফলে এ যাত্রা বেনিফিট অফ ডাউট। তারই মাঝে বারবার দেখা দিতে থাকল ইতিহাস বইয়ের ‘সিন্ধুসভ্যতা’ চ্যাপ্টারের শিলমোহর, মূর্তি গোছের নিদর্শনেরা। অতি উৎসাহী পাঠক বাঁধানো সুইমিং পুলের টলটলে নীল জলের ধারে নাচানাচি দেখে মনে করল, ও সময়ে স্নানাগার ছিল বটেক! কিন্তু কোনো কিছুই যথেষ্ট হয়ে যোগ্য সঙ্গত করল না।

মহেঞ্জোদারো হতে পারত- এক, কোনও শিশুসুলভ প্রেমকাহিনি। তবে তা দেখানোর জন্য হাজার হাজার বছর পিছিয়ে কোটি কোটি টাকা নষ্ট অবান্তর। হতেই পারত, দুই, বিশেষ কোনও সময় ধরে বিশেষ নগরের আখ্যান, বেশ এপিক অ্যাডভেঞ্চার গোছের। কিন্তু ঢিমেতালের বস্তাপচা যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা প্লট বাধ সাধছে এখানেও। আবার, সিনেমা দেখতে যাওয়ার জমাটি কারণ হিসেবে প্রতিশোধস্পৃহাও এখানে বেশ নড়বড়ে।

যোধা আকবর বা লগানের সাফল্যের পর, পরিচালকের মাইলফলক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল মহেঞ্জোদারোর। অনেক অনেক দিন পর ভক্তদের উৎসাহের আতিশয্যে হৃতিকও ফিরতেই পারতেন সাড়া জাগিয়েই। ট্রাইবাল, ইলেকট্রনিক, অপেরা, ফোক, পপ মিলিজুলি রহমানীয় সুর ছিল। জাভেদ আখতারের কলম। কিন্তু মোটের ওপর উতরলো না। উলটে ক্লান্তি জাগল। প্রতিমুহূর্তে “কিছু একটা ঘটবে”র আশা “কোডোপাইরিন মার্কা” চূড়ান্ততম বিরক্তিতে পরিণত হল।

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here